Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

দেবী কৃপায় সন্তানের জীবন রক্ষা পেতেই নগরী গ্রামের রায় পরিবারের পুজো শুরু

পরিবারের পাঁচ বছরের বালক খেলতে গিয়ে কুয়োয় পড়ে গিয়েছিল।

দেবী কৃপায় সন্তানের জীবন রক্ষা পেতেই নগরী গ্রামের রায় পরিবারের পুজো শুরু
  • ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, সিউড়ি: পরিবারের পাঁচ বছরের বালক খেলতে গিয়ে কুয়োয় পড়ে গিয়েছিল। সন্তানকে বাঁচাতে গৃহকর্তা মা দুর্গার কাছে মানত করেছিলেন। এরপরে দশভুজার কৃপায় ওই সন্তান কুয়ো থেকে উঠে আসে। এই ঘটনার পর থেকেই সিউড়ির নগরী গ্রামের রায় পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু। বীরভূম জেলার সদর সিউড়ি থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে লাল মাটির নগরী গ্রাম। সেখানে রায় পরিবারের এই পুজো প্রায় তিনশো বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। পুজো কিন্তু শুধু ধর্মীয় উৎসবই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অলৌকিক কাহিনি ও পারিবারিক মেলবন্ধন।

Advertisement

রায় পরিবারের সদস্যদের সূত্রে জানা গিয়েছে, আনুমানিক ১৭৯০ সালে রায় পরিবারের তরফে দুর্গাপুজো শুরু হয়। আগে এই পুজো এক ব্রাহ্মণ পরিবার করত। কিন্তু কোনও কারণবশত তাঁরা পুজো চালাতে পারছিলেন না। সেই সময় রায় পরিবার এই পুজোর দায়িত্ব নেয়। তখন পটে পুজো হত। কিন্তু নগরী গ্রামের এই জমিদার পরিবার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মূর্তি পুজোর শুরু। কথিত আছে, রায় পরিবারের সদস্য কেশবচন্দ্র রায়ের পাঁচ বছরের ছেলে কৈলাসনাথ খেলতে গিয়ে একটি কুয়োয় পড়ে গিয়েছিল। সন্তানকে বাঁচাতে কেশবচন্দ্র মা দুর্গার কাছে মানত করেন যে, তিনি কাঠের খড়ম সহ নিজের পা দু’টি কুয়োয় ঝুলিয়ে দেবেন। যদি তাঁর সন্তান বাবার পা ধরে উপরে উঠে আসে, তবে এই বছর থেকেই পুজো শুরু করবেন। প্রচলিত রয়েছে, দেবীর কৃপায় শিশুটি তার বাবার খড়ম ধরে কুয়োর জল থেকে উঠে আসে। 
এই ঘটনার কয়েকদিন বাদেই ছিল দুর্গাপুজো। তাই তড়িঘড়ি পুজোর প্রস্তুতি শুরু করে দেন কেশবচন্দ্র। যা আজও একই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। 
এই পুজোর সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনেরও সম্পর্ক রয়েছে। রায় পরিবারের দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণ করে খয়রাশোল থানার পেরুয়া গ্রামের সূত্রধর পরিবার। পাঁচ পুরুষ ধরে তাঁরা একই কাঠামো ও একই রং ব্যবহার করে প্রতিমা গড়ে আসছেন। ব্রিটিশ শাসনের সময় স্বাদেশির ধারাকে সম্মান জানাতে প্রতিমার ডাকের সাজ (শোলার সাজ) বর্জন করা হয়। তখন থেকেই মাটির সাজ এবং সোনা, রুপার গয়নায় প্রতিমাকে সাজানো হয়। 
মন্দিরের সামনে রয়েছে ঐতিহাসিক ‘আটচালা’। যা এই পুজোর এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রায় দু’শো বছর আগে জমিদার ইন্দ্র নারায়ণ রায়ের আমলে এটি তৈরি হয়। প্রথমে চুন-সুরকি ও শালকাঠের স্তম্ভ দিয়ে প্রতিমা তৈরি হলেও পরে সেই আটচালা ভেঙে যায়। তারপর স্থায়ী নির্মাণ তৈরি  হয়। এই আটচালা ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার আগের দিন রাতে জলসা ও মিষ্টি বিলির সাক্ষী ছিল এবং ১৯৫০ সালের মন্বন্তরে এটি লঙ্গরখানা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল। 
পুজোর চারদিন আটচালাতেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। রায় পরিবারের সদস্য সুভাষ রায়, অলোক রায়রা জানান, এই পরিবারের পুজোর বিশেষত্ব হল নির্দিষ্ট পুকুর থেকে সপ্তমীর দিন পরিবারের চার কিশোর পট্টবস্ত্র পরে চতুর্দোলায় নবপত্রিকা বা কলা বউ নিয়ে আসেন। আগে পুজোয় ছাগ বলি হলেও বর্তমানে তা অমানবিক বিবেচনা করে বন্ধ করা হয়েছে। এখন শুধু চালকুমড়োর বলি হয়। সপ্তমী ও নবমীতে অন্ন ভোগ হয়। দশমীর সকালে রায় পরিবারের  মা দুর্গার ঘট ও কলাবউ বিসর্জন হয়। একাদশীর সকালে প্রতিমা বিসর্জন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই বেদীতেই ঘট স্থাপন করে কালীপুজোর সূচনা হয়। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ