শহুরে মুখরতা থেকে বেশ কিছুটা দূরে গ্রাম্য প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে মনমাতানো নদী, পাখপাখালির কলকাকলি, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ, পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন আর সর্বোপরি বাংলা কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বসতবাড়ি। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, বলছি দেউলটির কথা।
অনেকে মনে করেন দেউলের অবস্থানের জন্যই এই স্থানের নাম দেউলটি। তবে এই জনশ্রুতির সত্যতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। দেউলটি থেকে কিছুটা দূরেই পানিত্রাসের সামতাবেড় গ্রাম। ব্রিটিশ শাসনকালে এই সামতা ছিল রায়দের শাসনাধীন। তাঁদের প্রকৃত পদবি ছিল বন্দ্যোপাধ্যায় আর রায় ছিল তাঁদের উপাধি। এঁরাই ছিলেন তখন সামতা গ্রামের জমিদার।
সামতাবেড়েতে পৌঁছে প্রথমেই এগিয়ে চললাম রূপনারায়ণের রূপ দর্শনে। নদীর ছলাৎ ছলাৎ জলতরঙ্গ আর নদীর বুকে ভেসে চলা নৌকা মুহূর্তেই মনকে নিয়ে গেল মন কেমন করা এক রূপকথার জগতে। নদীর পাড় ধরে হেঁটে যেতে যেতে পেলাম নদীর পাশে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। সেই মাঠে চাষিরা সোনার ফসল ফলানোর কাজে ব্যস্ত। নদীর পাড়ে কেউ কেউ বনভোজন করছেন, আবার কেউ কেউ বসে একান্তে গল্প করে চলেছেন তটিনীর সঙ্গে। বর্ষায় রূপনারায়ণ যেমন মাঝেমাঝে ফুঁসে উঠে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, তেমনই শীতকালে তার শান্ত, সমাহিত রূপের প্রতিচ্ছবি। এদিকে-ওদিকে ফড়িং, প্রজাপতি
আর নাম না জানা রংবেরঙের পাখিদের উড়ান।
রূপনারায়ণের সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করে এবার এগিয়ে চললাম সামতাবেড়ের মূল আকর্ষণ প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বসতবাড়ি দেখতে। চুন, সুরকি, কড়ি-বরগা দিয়ে বর্মা রীতিতে নির্মিত এই বাড়ি। ১৯২৬ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত জীবনের শেষ বারো বছর এখানে তিনি কাটিয়েছিলেন।
পরম আগ্রহে বাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। বাড়ির কেয়ারটেকার দুলালবাবু এ ব্যাপারে আমাকে সর্বতোভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাড়িটি ঘুরে দেখতে দেখতে মন নিজের অজান্তেই কেমন যেন তন্ময় হয়ে উঠেছিল। নীচতলায় লেখকের লেখার ঘরে তাঁর ব্যবহৃত চেয়ার, ছড়ি, পাদুকা ইত্যাদি সযত্নে সংরক্ষিত। পাশের বৈঠকখানা ঘরে লেখকের ব্যবহৃত আলমারি, সোফা, গড়গড়া, বেলজিয়াম কাচের আয়না আরও কত কী! দুলালবাবুর মুখ থেকে শুনলাম এক রোমহর্ষক কাহিনি। রূপনারায়ণের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই বাড়িতে একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। সভা শেষ করে বাড়ির পিছনে অবস্থিত গুপ্ত দরজা দিয়ে চলে যেতেন তাঁরা। শোনা যায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কারাগারে যাওয়ার আগে শরৎচন্দ্রকে শ্বেতপাথরে তৈরি রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ দান করে যান। সেই বিগ্রহ এখনও এখানে নিত্য পূজিত। বৈঠকখানা ঘরের পাশেই শরৎচন্দ্রের চিকিৎসা কক্ষ। একসময় দরিদ্র গ্রামবাসীদের তিনি বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন। সেইসময় তাঁর ব্যবহৃত ওষুধের কিছু শিশিও চোখে পড়ল।
বাড়ির দোতলার ঘরগুলোতে শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত আসবাবপত্র সুরক্ষিত রয়েছে। দোতলার বারান্দার ধারে তাঁর লেখার রাইটিং ডেস্কটিও বেশ অভিনব।
শরৎচন্দ্র পশু-পাখি ভালোবাসতেন। লেখকের খরগোশ ও ময়ূর পোষার খাঁচা এই ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। বাড়ির উঠোনে কথাশিল্পীর স্বহস্তে প্রোথিত বাঁশগাছ স্বমহিমায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আজও। শরৎচন্দ্রের মেজো ভাই প্রভাসচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রামকৃষ্ণ মিশনে যোগদান করে সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হন। এই সন্ন্যাস জীবনে তাঁর নাম হয় স্বামী বেদানন্দ। তাঁর সমাধি এই বাড়ির চৌহদ্দিতেই। শরৎচন্দ্রের দ্বিতীয় স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবীর সমাধি বেদীটিও তাঁর বাড়ির বাগানে। বাড়ির উঠোনে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবক্ষ মূর্তি। কথাশিল্পীর জন্মদিন উপলক্ষে প্রতি বছরই শরৎ স্মৃতি গ্রন্থাগার ও শরৎ মেলা কমিটির যৌথ উদ্যোগে লেখকের পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত এই হেরিটেজ ভবন ও সংলগ্ন এলাকায় তাঁর জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান পালিত হয় মহা সমারোহে।
শরৎ কুঠি দর্শনের পর এগিয়ে চললাম আমাদের আজকের শেষ গন্তব্যে। শ্রীরাধা আর মদনগোপালের সুপ্রাচীন আটচালা মন্দির। ১৬৫১ সালে মঙ্গলহাটের জমিদার মুকুন্দপ্রসাদ রায়চৌধুরী এই দেউল নির্মাণ করেন। মন্দিরগাত্রে বিস্ময়কর টেরাকোটার কাজ প্রাচীনত্বের ছাপ বহন করে চলেছে।
ফেরার সময় দেখলাম রূপনারায়ণের বুকে মুখ লুকাচ্ছে দিবাকর। নদীর দিগন্ত বিস্তৃত চরাচর জুড়ে কে যেন ছড়িয়ে দিয়েছে রক্তরাঙা সিঁদুরে আলপনা। মনোলোভা এই দৃশ্যের সাক্ষী হতে পেরে মনের গহনকোণে এক অজানা শিহরন অনুভব করলাম। একরাশ সফর স্মৃতিকে সঙ্গী করে পা বাড়ালাম বাড়ির উদ্দেশে।
কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে ট্রেনে দেউলটি স্টেশন। সেখান থেকে টোটোযোগে সামতাবেড়। স্টেশনের কাছে বেশ কয়েকটি হোটেল আছে। তাছাড়াও সামতাবেড়ে পর্যটকদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে রিসর্ট। সেখানে থাকলে গ্রাম্য প্রকৃতি সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারবেন।



