নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: শনিবার ইন্ডিয়া জোটের প্রতীকী সংসদ সভায় দিল্লির মঙ্গলপুরীর কামতাপ্রসাদ নিজেই জানালেন, তিনি মৃত। নির্বাচন কমিশন এসআইআরের খসড়া তালিকায় জানিয়ে দিয়েছে, কামতাপ্রসাদের মৃত্যু হয়েছে। তাই ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। তিনি যে বেঁচে আছেন সেকথা প্রমাণ করতে কমিশনের ডাকা সহায়তা কেন্দ্রে হাজির হয়েছেন। সব নথিপত্র জমা করার পর তাঁকে বলা হয়েছে, আপনার ছেলে আমাদের বলেছে, আপনার মৃত্যু হয়েছে। ছেলে আকাশ থেকে পড়ে বলেছে, আমি সমস্ত নথিপত্র নিজে জমা দিয়ে গিয়েছিলাম। আমি কেন বলব, আমার জীবন্ত পিতার মৃত্যু হয়েছে?
কমলকুমারের বস্তিতে সাড়ে ৯০০ ভোটার ছিল তালিকায়। দিল্লির এসআইআরে এই বস্তির ঠিকানায় মাত্র একজনের নাম খসড়া ভোটার তালিকায় উঠেছে। ১৯৬১ সাল থেকে চলা একটি গোটা বস্তি ভোটার তালিকা থেকে ভ্যানিশ। একটি দুটি অথবা একশো নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে অন্যত্র। একসঙ্গে একটা গোটা বস্তির সাড়ে ৯০০ মানুষই অবৈধ হয়ে গেল কীভাবে?
অনিতা জয়সওয়াল সামান্য দিনমজুরি করে একা সংসার চালান। স্বামী নেই। কষ্ট করে মেয়েকে স্কুলে পড়িয়েছেন। আর সেই মেয়ে স্কলারশিপ পেয়েছে। তার স্বপ্ন ছিল চাকরি পাওয়ার। নথিপত্র থাকা অনিতার নাম বাদ চলে গিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। অনিতা জয়সওয়াল ক্রোধে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে শনিবার প্রতীকী সংসদে মোদি সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বললেন, ২০০৩ সালে কলকাতা থেকে দিল্লিতে এসেছি। ২০১২ সাল থেকে ভোট দিচ্ছি। এখন আমি কোন দেশের বাসিন্দা, আপনাদের দায়িত্ব সেটা প্রমাণ করার। আমার মেয়ে জানতে চাইছে, সে কোন দেশের মায়ের কন্যা।
পশ্চিমবঙ্গের সাবির আহমেদ বললেন, জ্ঞানেশ কুমার মহিলা ও মুসলিম বিরোধী। সেই কারণেই বাংলায় যত নাম জ্ঞানেশ কুমার বাদ দিয়েছেন, তার ৭০ শতাংশ মুসলিম এবং ৫১ শতাংশ মহিলা। জ্ঞানেশ কুমার জানেন এই দুই পক্ষ বিজেপিকে ভোট দেয় না। তাই নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
মায়া দেবী ময়ূরবিহারের চিল্লা বস্তির বাসিন্দা। শুধু যে তাঁর নামই বাদ দেওয়া হয়েছে তাই নয়। বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিন মেয়েকে তিনি মানুষ করেন। আর কেউ নেই আয় করার। তিনি বললেন, মোদি সরকারকে কে অধিকার দিয়েছে আমার নাম বাদ দেওয়ার? কারও সাহায্য ছাড়া আমি নিজের পরিশ্রমে সারাদিন ধরে আয় করি। আমাকে সেই কাজ থেকে বঞ্চিত করে লাইনে দাঁড় করানোর সরকার কে? ক্রোধে ফুঁসছেন মায়া দেবী।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে জনতার ইমপিচমেন্ট কর্মসূচি আয়োজিত হয়েছিল শনিবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের বাসভবনে। নাম কা ওয়াস্তে প্রতীকী সংসদ নয়। অবিকল সংসদের আদলে তৈরি হয়েছিল সভা। স্পিকার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমার। অবিকল সংসদের দুই কক্ষের মতোই ছিল বসার ব্যবস্থা। এমপিদের ডেস্ক এবং মাইক্রোফোনও ছিল সংসদের ধাঁচে। পার্থক্য একটাই। শুধূই এমপিরা ছিলেন না। ‘জনশুনানি এবং ইমপিচমেন্ট শীর্ষক’ এই সভায় হাজির ছিল নাগরিক মঞ্চ, আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট থেকে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং এসআইআর থেকে নাম বাদ যাওয়া সাধারণ মানুষও। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত এই সভায় সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষই তাঁদের বক্তব্য রাখেন। প্রত্যেকের একই বক্তব্য, জ্ঞানেশ কুমারকে সরতেই হবে। তিনি পুতুল। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের হাতে সুতো।
ইমপিচমেন্ট মোশনের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন মল্লিকার্জুন খাড়্গে। তিনি বলেন, নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ গণতন্ত্র ও সংবিধান ধ্বংস করার মহাযজ্ঞে মেতেছেন। মোদি শাহকে ভারত ধ্বংস করতে আমরা দেব না। ইমপিচমেন্ট মোশনে তৃণমূল কংগ্রেসের সাগরিকা ঘোষ বলেন, প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেনের স্বপ্ন ছিল, ভারতের মানুষকে ভোটার তালিকায় বেশি করে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সেই সুকুমার সেনের নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে জ্ঞানেশ কুমার গণতন্ত্রকে ছুরি মেরে ৯১ লক্ষ নাম বাদ দিয়েছেন। আজ দেশে দুই পক্ষ। একদিক জ্ঞানেশ-মোদি-শাহ জোট। অন্যদিকে, জনতার জোট। ভারতই জিতবে। মোদি শাহ জ্ঞানেশ জোট হারবে!



