Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পেশা বদলে বদলে যায়...

মিলেনিয়াম পর্বের শুরুর কথা। শহরতলি লাগোয়া এক মফস্‌সলে একটি স্কুলছুট ছেলে খুললেন ক্যাসেট-সিডির দোকান। ব্যবসা বেশ হিট।

পেশা বদলে বদলে যায়...
  • ৬ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: মিলেনিয়াম পর্বের শুরুর কথা। শহরতলি লাগোয়া এক মফস্‌সলে একটি স্কুলছুট ছেলে খুললেন ক্যাসেট-সিডির দোকান। ব্যবসা বেশ হিট। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই উড়ু উড়ু মনের সেই যুবক বদলে ফেললেন ব্যবসা। এবার ফাস্ট ফুডের দোকান। বছর চারেকের মধ্যেই ফের ব্যবসা বদল। এবারে গাড়ি সারানোর গ্যারেজ। এই ব্যবসাও জমে উঠছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু বছর চারেকের মধ্যেই কোভিডের হানা। সঙ্গে লকডাউন। অফিস-দোকান সব বন্ধ। মানুষজন গৃহবন্দি। ফলে অবসরযাপন থেকে বিনোদন, সবকিছুর একটাই সমাধান—মোবাইল ফোন। আনলিমিটেড ডেটার সুবাদে দিন-রাত চোখ আটকে ছ’ইঞ্চির স্ক্রিনে। সিনেমা, সিরিয়াল আর কত দেখা যায়! তাই রুপোলি পর্দার তারকাদের পাশাপাশি শর্ট ভিডিও, রিল বানাতে শুরু করল আম জনতাও। এর মধ্যেই একদিন অচেনা একটা নম্বর থেকে ফোন। ‘চিনতে পারছিস ভাই?’ সেই গ্যারেজ মালিক! বললেন, ‘ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি।’ অ্যাকসেপ্ট করার কিছুক্ষণ পরেই এল তাঁর পেজ ‘লাইক অ্যান্ড সাবস্ক্রাইব’ করার অনুরোধ। সেই পেজে ঢুকে দেখি, চেনাজানা অনেকে যেমন রয়েছেন, অপরিচিতদের ভিড়ও কম নয়। বিভিন্ন পোস্টে তাঁদের হাজার হাজার লাইক, কমেন্ট। রীতিমতো ডিজিটাল সেলেব গোত্রের ব্যাপার।

Advertisement

একজনের কথা লিখলাম। গল্পটা আসলে বহুজনের। করোনার অন্ধকার দিনগুলিতে অনেকের জীবনে এক আশ্চর্য আলোর রেখা হয়ে এসেছিল ভার্চুয়াল এই দুনিয়া। একদিকে কাজ হারানো মানুষরা খুঁজছিলেন রোজগারের পথ। অন্যদিকে, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর সুবাদে অনেকে অবসর সময় কাটানো বা বাড়তি আয়ের খোঁজে শুরু করেন কন্টেন্ট তৈরি। চাহিদা আর জোগান মিলে একেবারে খাপে খাপ। ফলস্বরূপ, ভারত সহ গোটা বিশ্বেই দেখা দিয়েছিল এক অভূতপূর্ব ‘ডিজিটাল ক্রিয়েটর ঝড়’। এই পর্বে শীর্ষে ছিলেন কৌতুক শিল্পী সহ বিভিন্ন ধরনের এন্টারটেইনাররা। লকডাউনের বিষাদ দূর করতে হালকা মেজাজের মজার ভিডিও তৈরি করে সাড়া ফেলে দেন অনেকে। হয়ে ওঠেন সেলেব্রিটি। নামী-অনামী কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের কবিতা-গল্প পাঠ, গান গাওয়া বা আঁকার ভিডিও পোস্টও আসতে থাকল দেদার। ঘোরা বন্ধ থাকলেও ভ্রমণপ্রিয়রা অনেকেই ঘুরতে যাওয়ার পুরনো সব ছবি-ভিডিও শেয়ার করতেন। দুধের স্বাদ ‘ডিজিটাল ঘোলে’ যতটা মেটে আর কী! চালু হল অনলাইন টিউটোরিয়াল ক্লাস। রান্নাই বা বাদ যায় কেন! বাংলার হারিয়ে যাওয়া বহু রেসিপি থেকে নানান কন্টিনেন্টাল কুইজিন বা ‘ডালগোনা কফি’র মতো বহু অচেনা আইটেম রাতারাতি ভাইরাল। 
ফেসবুক-ইনস্টা রিলস, ইউটিউব শর্টসের জনপ্রিয়তা বাড়তেই চালু হল অ্যাড রেভেনিউ শেয়ার প্রোগ্রাম। ভাইরাল ভিডিও বানিয়ে টাকা কামানোর গল্প হয়ে উঠল নতুন ‘অনুপ্রেরণা’। ফলে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগকে পুঁজি করে অনেকেই পা বাড়ালেন ‘আয়ের সহজ রাস্তা’য়। শুরু হল ‘গোল্ড রাশ’ যুগ। টাকা ভালোই আসছে দেখে অনেকেই ভাবলেন, এটাকেই স্থায়ী পেশা হিসেবে করলে ক্ষতি কী! এখান থেকেই দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেলেন ডিজিটাল ক্রিয়েটররা। একদল হয়ে উঠলেন ‘হাইব্রিড ক্রিয়েটর’। নিজেদের মূল পেশা (চাকরি বা ব্যবসা) ও ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি—দুটোই সমানতালে চালিয়ে যেতে লাগলেন। তবে নিজের প্রধান পেশা থেকে নিয়মিত আয় নিশ্চিত থাকায় ডিজিটাল আয়ের উপর এঁদের নির্ভরশীলতা কম ছিল। দ্বিতীয় অংশ—‘ফুলটাইম ক্রিয়েটর’। এঁদের কেউ চাকরি খুইয়ে, কেউ আবার সহজে আয়ের স্বপ্নে সব ছেড়ে এই পথ বেছে নিয়েছিলেন। যেমন সেই গ্যারেজ মালিক। একবার ইকো পার্কে তাঁর দলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। পরে ফুড কোর্টে ঠান্ডা পানীয়ে চুমুক দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই রিলস বানাই রে। আজ কো-ল্যাব করতে এসেছি।’ ‘আর গ্যারেজ?’ জিজ্ঞাসা না করে পারিনি। ‘বন্ধ রে। খোলার সময়ই পাই না। আর এখান থেকে ভালোই আয় হচ্ছে...’ সব শুনে আর ব্যস্ততা দেখে কথা বাড়াইনি।
শুধু কন্টেন্ট ক্রিয়েশন আয়ের একমাত্র রাস্তা হলে তা যে কতটা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হতে পারে, বিষয়টি বোঝা গেল কিছুদিন পর। মেটা (ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের মূল কোম্পানি) তাদের ভিডিও পিছু আয় কমিয়ে দেওয়ায়। রিপোর্ট অনুযায়ী, এর ফলে একধাক্কায় আয় কমে যায় ৫০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত। জনপ্রিয় এক ক্রিয়েটর জানান, আগে ১০ হাজার রিচ ও ৫ হাজার এনগেজমেন্টের জন্য অন্তত ৬০০ টাকা মিলত। কিন্তু এখন তা কমে ১৭০ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। 
কিন্তু হঠাৎ কেন এমনটা হল? তার পিছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। ২০২২ সালে ফেসবুক ‘রিলস’ ফিচারটি চালু হওয়ার পর, তা টিকটক (ভারতে ব্যান, অন্যত্র চালু), ইউটিউব শর্টসের তুলনায় বেশ পিছিয়ে ছিল। টিকটক সহজ ইউজার ইন্টারফেস ও শক্তিশালী অ্যালগরিদমের মাধ্যমে দ্রুত বাজার ধরে নেয়। ইউটিউবের হাতে থাকা সুবিশাল ইউজার বেসের কারণে শর্টসও হিট করে। দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়ে ফেসবুক। মার্কেট শেয়ার হারাতে শুরু করে মেটা। এই বাজারে ঘুরে দাঁড়াতে তাই রিলসে আয় বাড়িয়ে দেয় ফেসবুক। ফলে ইউজার এনগেজমেন্ট লাফিয়ে বাড়তে থাকে। বাজার ধরার এই স্ট্যাটেজি খুব পরিচিত। কার্যকরীও বটে। প্রাথমিকভাবে ফেসবুকের পক্ষ থেকে ‘রিলস প্লে বোনাস প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে ক্রিয়েটরদের প্রতি মাসে ৩৫,০০০ ডলার পর্যন্ত আয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাজার ধরার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হতেই কৌশল বদলাল মেটা। কমানো হল ভিডিও পিছু আয়ের হার। এর পিছনে বড় কারণ বিশ্বজোড়া আর্থিক মন্দার চাপ। যে কারণে ফেসবুক এখন অ্যাড-রেভেনিউ শেয়ারিং মডেলের উপরে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যার অর্থ, ভিডিওর শুরুতে বা মাঝে দেখানো বিজ্ঞাপন থেকে আসা আয়ের একটা অংশ ক্রিয়েটরদের দেওয়া হবে। সেই জন্য ফেসবুক এখন লং-ফর্ম কনটেন্ট বেশি প্রোমোট করছে। পাশাপাশি তারা চাইছে, ক্রিয়েটররা ‘স্টারস’, ‘সাবস্ক্রিপশন’, ‘ব্র্যান্ড স্পন্সরশিপ’, ‘ইন-স্ট্রিম অ্যাডসের মাধ্যমে টাকা উপার্জন করুন। তাই ডিরেক্ট ইনসেনটিভ কমিয়ে আয়ের এই নতুন পথগুলিকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি, মেটা ক্রমাগত তার অ্যালগরিদমও বদলাচ্ছে। অর্গ্যানিক রিচ কমিয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে পেইড প্রোমোশনের উপর।
ডিজিটাল আয় কমায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন নতুন বা মিড-টিয়ার ক্রিয়েটররা। কারণ এঁদের ভিউয়ারশিপ খুব বেশি নয়। আবার আয়ের জন্য তাঁরা প্রত্যেকেই সম্পূর্ণভাবে মেটার অ্যাড রেভিনিউয়ের উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও যাঁরা শুধুমাত্র এন্টারটেইনমেন্ট বা ভাইরাল ট্রেন্ডস নিয়ে ভিডিও তৈরি করতেন, সেই সমস্ত ক্রিয়েটরও বেশ চাপে। পরিবর্তনের এই পর্বে একবার দেখা হয়েছিল সেই গ্যারেজ মালিকের সঙ্গে। তাঁর দোকানেই। কথায় কথায় দুঃখ করে বলছিলেন, ‘জানিস তো, এখন তো টাকা প্রায় আসেই না। তাই আবার গ্যারেজটা চালু করলাম।’ কিন্তু আর্থিক সঙ্কট, ঋণের ভারে জর্জরিত অনেকে চেয়েও চালু করতে পারেননি পুরনো ব্যবসা। সিভিতে এতদিনের ‘অনুপস্থিতি’র কারণে কারও কারও হাতছাড়া হয়েছে একাধিক চাকরির সুযোগ। তাই বাধ্য হয়ে তাঁরা শুরু করেছেন বিকল্প পেশার খোঁজ।
সেই সুবাদেই ‘নিউ ট্রেন্ডিং অপশন’ হয়ে উঠেছে ডাইভার্সিফিকেশন। অর্থাৎ পুরোপুরি পেশা বদল নয়। বরং নিজের ‘ক্রিয়েটর’ পরিচয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় উপার্জিত অডিয়েন্স এবং দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন আয়ের রাস্তা তৈরি করা। সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো জনপ্রিয় ট্রাভেল ভ্লগারদের অনেকেই বর্তমানে হয়ে উঠেছেন কনডাক্টেড ট্যুর অপারেটর। আগে নিজেরা যে সমস্ত জায়গায় ভ্লগিংয়ের জন্য যেতেন, এখন সেই সমস্ত জায়গায় তাঁরাই গ্রুপ ট্যুর করাচ্ছেন। এই ট্যুর টিমের একটা বড় অংশ আবার তাঁরই সোশ্যাল মিডিয়ার ফলোয়াররা। সঙ্গে চলছে ভ্লগিংও। এক ঢিলে দুই পাখি। কেউ কেউ আবার ভ্লগিংয়ের সঙ্গে হয়ে গিয়েছেন ট্রাভেল কনসাল্টট্যান্ট। অতি উৎসাহী কিছুজন নানান অফবিট জায়গায় চালু করেছেন হোম-স্টে। রান্নার চ্যানেলের ক্রিয়েটরদের অনেকে বাড়িতেই শুরু করেছেন নিজেদের কুকিং ক্লাস। কেউ কেউ আবার খুলে ফেলেছেন ছোট রেস্তরাঁ। গ্যারাজ বদলে গিয়েছে কফি শপে। ফলোয়ার্সদের থেকে অর্ডার পেয়ে কেউ কেউ শুরু করেছেন বেকারির ব্যবসা। কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অনেকে আবার চালু করেছেন ভিডিও এডিটিং, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, ফটোগ্রাফি, ভাষা শিক্ষা, আর্ট, মিউজিকের অনলাইন-অফলাইন কোর্স ও ওয়ার্কশপ। বড় ঝুঁকি না নিতে চাওয়া অনেকে শুরু করেছেন জনপ্রিয় কোট বা ক্যারেক্টার সংবলিত টি-শার্ট, মগ, স্টিকার, ব্যাগ, শাড়ির ব্যবসা। অনলাইন মার্কেটপ্লেস সেলার হিসেবে শিল্পী বা কারিগররা হস্তশিল্প, পটচিত্র, শাড়ি ইত্যাদি সরাসরি অনলাইনে বিক্রি করছেন। জনপ্রিয় হচ্ছে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংও। এক্ষেত্রে সরাসরি স্থানীয় কোনও ব্র্যান্ডের সঙ্গে স্পন্সরশিপ চুক্তি করে ভিডিও তৈরি করেন অনেকে। তাঁদের দেওয়া রিভিউ-রেকমেন্ডেশনের সূত্র ধরে যে সমস্ত প্রোডাক্ট বিক্রি হয়, তার থেকে কমিশন পান ডিজিটাল ক্রিয়েটররা।
মোদ্দা কথা হল, আতঙ্ক বলুন বা তাড়না, সেই তাগিদ থেকেই মিলেছে আয়ের একের পর এক বিকল্প রাস্তা। কিন্তু এই গোটা পর্বে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে সহজে ‘আয়’ করার মিথ। ডিজিটাল ক্রিয়েটর হওয়া যে আদতে কতটা কঠিন এবং এই মাধ্যমেও সাফল্যের জন্য ধারাবাহিক পরিশ্রম, কৌশল এবং বাণিজ্যিক বুদ্ধির প্রয়োজন, তা স্পষ্ট হয়েছে পরিবর্তনের এই পর্বে। সামনে এসেছে ডিজিটাল দুনিয়ার একটি নির্মম সত্য—শুধুমাত্র ক্রিয়েটর হয়ে এই পেশায় টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব। কারণ ডিজিটাল এই ইকোসিস্টেমে আয়ের উৎস (অ্যাড রেভেনিউ), দর্শকদের কাছে পৌঁছনো (অ্যালগরিদম)–সবই আসলে প্ল্যাটফর্মের হাতে। তাদের নীতির সামান্য পরিবর্তন হলেই বদলে যেতে পারে পুরো ছবিটা। সঙ্গে আপনার স্বপ্নের কেরিয়ারের গতিপথও। সাধু সাবধান।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ