যেকোনো ভালো কাজের জন্য আন্তরিকতা আবশ্যক। একমাত্র আন্তরিক উদ্যোগই সফল হতে পারে। কিন্তু যখন চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে যেনতেনপ্রকারে কার্যোদ্ধার, তখন আন্তরিকতা গুরুত্ব হারায়। ওই পরিস্থিতিতে জয় হাসিল করার জন্য চমকসৃষ্টির অধিক কৌশল অবশিষ্ট থাকে না। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ পর থেকে নরেন্দ্র মোদির মূল হাতিয়ারের নাম চকম। তিনি একের পর এক চমক দিয়েই তিন তিনবার কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করেছেন। পরবর্তীকালে চমকগুলি ‘জুমলা’ নামেই নিন্দিত হয়েছে। একাধিক জুমলার দৃষ্টান্ত ধরা পড়ে গিয়েছে আম পাবলিকের সাদা চোখেই। কিন্তু সেসব হিমশৈলের চূড়ামাত্র। বেশিরভাগের জুমলা ঢাকা পড়ে গিয়েছে পরিসংখ্যানের ধূসর অর্ধসত্যের নীচে। যেমন গত একদশকের কেন্দ্রীয় বাজেটের একটা বড়ো অংশই ‘বাজেট-জুমলা’ আখ্যা পেয়েছে। রবিবার নির্মলা সীতারামনের বাজেট প্রস্তাবকে বিরোধীরা এই ভাষাতেই চিনিয়েছেন। শুধু মুখে বলাই নয়, কিছু নমুনাও তুলে ধরা হয়েছে পরিসংখ্যানসহকারে। মোদি সরকারের দেওয়া তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, জল জীবন মিশন নামক পরিষেবাই হোক কিংবা বেকারত্ব ঘোচাবার পিএম ইন্টার্নশিপ স্কিম—সবটাই লোক দেখানো বা স্রেফ ভাঁওতা। এর উজ্জ্বল উপস্থিতি শুধুই ঘোষণা আর টেবিল চাপড়ানোয়। বাস্তবে হয় সংখ্যাতত্ত্বের মারপ্যাঁচ, না-হলে ব্যর্থতার রেকর্ড।
প্রথমে চোখ রাখা যাক জল জীবন মিশনে। ঘরে ঘরে পরিস্রুত পানীয় জল পৌঁছানোর দাবি এবং তার কৃতিত্ব, দুটোই জাহির করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর অনুগামীরা। এই প্রকল্পে বাংলার অগ্রগতির প্রশংসাও করেছিল কেন্দ্র। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে এ পর্যন্ত ৯৯ লক্ষাধিক বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অথচ, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে জল জীবন মিশন প্রকল্পের টাকা বন্ধ করেছে মোদি সরকার। আর তা শুধু বাংলায় নয়, সব রাজ্যই এই প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কমবেশি বঞ্চিত। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে জল জীবন মিশনে কেন্দ্র বরাদ্দ করেছিল ৬৭ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে রিভাইসড এস্টিমেট অনুসারে, এর মধ্যে খরচ দেখা গিয়েছে মাত্র ১৭ হাজার কোটি। তার পূর্ববর্তী অর্থবর্ষেও কিন্তু এতে ২২,৬১২ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছিল। প্রশ্ন হল, দুবছর যাবৎ কোনো রাজ্য যদি এই প্রকল্পে টাকা না-পেয়ে থাকে, তাহলে এই বিপুল বরাদ্দ অর্থ গেল কোথায়? রবিবার যে বাজেট অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, তাতে রয়েছে ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধির ঢক্কানিনাদ। জুমলা ধরা পড়ে গিয়েছে ঠিক এখানেই। যদি ধরেও নেওয়া যায়, গতবছর জল জীবন মিশনে ১৭ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে, তাহলে বাকি ৫০ হাজার কোটি টাকা (= ৬৭,০০০ কোটি - ১৭,০০০ কোটি) তো তহবিলেই ছিল! সেক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধির কৃতিত্ব দাবিকে আপনি স্রেফ ভাঁওতা বলবেন না কি?
অন্যদিকে, আসুন বহুচর্চিত প্রধানমন্ত্রী ইন্টার্নশিপ স্কিমের দিকে তাকানো যাক। প্রকল্পটি মোদিজি স্বয়ং আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছিলেন ২০২৪-এ। তাঁর দাবি ছিল, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় আপাতত ১.২৭ লক্ষ তরুণ-তরুণী নিয়োগ পাবেন। এককথায়, কর্মসংস্থানের প্রশ্নে মোদি জমানায় এক রেকর্ড হতে যাচ্ছে। অনেকে স্বস্তিই বোধ করেছিলেন এই ভেবে যে, বছরে ২ কোটি চাকরি না হোক, কিছু একটা তো হতে যাচ্ছে। মোদিবাবুর হাতদুটো অন্তত খোলা শুরু হোক। আবার তখনই উঠেছিল অন্য সংগত প্রশ্নও, কিছু বেসরকারি কোম্পানি সরকারের কথায় লোক নেবে কেন? এতে তাদের কোন স্বার্থসিদ্ধি হবে? তবু দেখা গেল, উপরোধে ঢেঁকি গেলার মতো করে হলেও কিছু বেসরকারি সংস্থা সেবার ৮২ হাজার অফার লেটার ইস্যু করেছিল। কিন্তু বেশিরভাগ যুবক-যুবতী এই সুযোগকে ‘দুর্লভ’ গণ্য করেননি, অফার বরং ফিরিয়েছিলেন! হ্যাঁ, উলটপুরাণ হলেও তা সত্যি। অফারে সাড়া দিয়েছিলেন মাত্র ২৮ হাজার জন। দ্বিতীয় দফায় সাড়াদাতার সংখ্যা আরো কম—২৪,৬০০। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ইন্টার্নশিপ শেষ করেছেন মাত্র ২,০৬৬ জন। বস্তুত ব্যর্থতার নয়া রেকর্ডই সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টার্নশিপ স্কিমে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য অর্থবরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১০,৮৩১ কোটি টাকা। বর্ষশেষে সংশোধিত বাজেটে দেখা যাচ্ছে, খরচ হয়েছে মাত্র ৫২৬ কোটি টাকা বা ৫ শতাংশ! এই স্কিমে আগামী অর্থবর্ষের জন্য বরাদ্দ নেমে এসেছে তলানিতে—মাত্র ৪,৭৮৮ কোটি টাকা। একে হতাশা ছাড়া কীই-বা বলতে পারেন আপনি? হতাশা কখন গ্রাস করে? যখন সবদিক থেকেই সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখনই। আন্তরিকতা, দক্ষতা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতার সম্মিলনেই সাফল্য আসে। ‘আচ্ছে দিন’, ‘অমৃত কাল’ প্রভৃতির ফেরিওয়ালার চূড়ান্ত হতাশাতেই প্রকট, তাঁর ঝুলিতে আর যাই থাক, এসব গুণাবলি নিতান্তই বাড়ন্ত—সবটাই জুমলাবাজ, ফন্দিবাজসুলভ।