Bartaman Logo
২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

জনসংযোগ ও উন্নয়নে ভর করেই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী জনগণের বেচারাম

সিপিএমকে হটিয়ে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার পিছনে যে দু’টি ফ্যাক্টর সবচেয়ে বেশি কাজ করেছিল, তা হল সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলন। জোর করে কৃষকের উর্বর জমি ছিনিয়ে নিয়ে, তাঁকে কারখানার শ্রমিক বানিয়ে শিল্প হতে পারে না।

জনসংযোগ ও উন্নয়নে ভর করেই জয়ের  ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী জনগণের বেচারাম
  • ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০

অর্পণ সেনগুপ্ত, সিঙ্গুর: সিপিএমকে হটিয়ে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার পিছনে যে দু’টি ফ্যাক্টর সবচেয়ে বেশি কাজ করেছিল, তা হল সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলন। জোর করে কৃষকের উর্বর জমি ছিনিয়ে নিয়ে, তাঁকে কারখানার শ্রমিক বানিয়ে শিল্প হতে পারে না। এই মর্মেই সিলমোহর দিয়ে বাম সরকারকে সরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতায় আনেন সাধারণ মানুষ। সেই সিঙ্গুর আন্দোলনে মমতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি বেচারাম মান্নাই এখন এই কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক তথা মন্ত্রী। ফলে তিনি সেখানে কী ফল করেন, তা একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই তৃণমূলের জন্য প্রতীকীও বটে।

Advertisement

বাম আমলে পঞ্চায়েত নির্বাচনে লড়ে জনপ্রতিনিধি হয়েছিলেন বেচারাম মান্না। তবে সাধারণ মানুষের তিনি এখনও বেচা। ছোটোরা সম্বোধনের সময় বড়জোর তাঁর নামের সঙ্গে মান্না যোগ করে। স্ত্রী করবী মান্নার বিধানসভা এলাকা নালিকুলের এক জনসভার সেই অভিজ্ঞতাই ভাগ করছিলেন বেচারাম। তিনি বলেন, ‘আমাকে আমার বিধানসভা এলাকার প্রতিটি বাচ্চাও এক নামে চেনে। একবার গাড়িতে করে যাচ্ছি। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলে চিৎকার করে উঠল, ওই দেখো মা বেচা মান্না। মা ছেলের মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বলছেন, বড়োদের নাম এভাবে নিতে নেই। তবে, আমার কাছে এটা একেবারেই অপমান নয়। এটাই আমার অলংকার।’ ফলে জনসংযোগ নিয়ে কোনো সংশয়ে নেই এই দুঁদে রাজনীতিবিদ। ফোন সব সময় খোলা থাকে। জানান, জনসংযোগ নিয়ে অবশ্য আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন না। প্রচারের জন্য ৫০০ কিলোমিটারের উপর হেঁটে ফেলেছেন তিনি। ৬-৭ দিন আগেই প্রায় ৯৯ শতাংশ এলাকায় প্রচার শেষ করে ফেলেছেন। পাশাপাশি এলাকায় বিপুল পরিকাঠামো উন্নয়ন তো রয়েছেই। এসবে ভর করে জয়ের হ্যাটট্রিকের পরে এবারও জেতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী তিনি।
পুরানো দিল্লি রোড এবং দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের মাঝামাঝি খানিকটা শঙ্কু আকৃতি এলাকা জুড়ে রয়েছে সিঙ্গুর বিধানসভা কেন্দ্র। সিংহের ভেড়ির উলটোদিকে এখনও পড়ে রয়েছে টাটাদের ছেড়ে যাওয়া ন্যানো কারখানার জমি, শেডের ভগ্নাংশ। তবে, ন্যানোর ছেড়ে যাওয়া ভোটে ইস্যু হলে এ রাজ্যে তো বটেই, সিঙ্গুরে কখনও জিততে পারত না তৃণমূল। এ কথা মনে করিয়ে দিলেন সিঙ্গুর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা কৃষ্ণ মণ্ডল। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অভিভাবক, মাস্টারমশাই রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বিজেপির টিকিটে ভোটে দাঁড়ানোর পর তাঁকেও ২০২১ সালে হারিয়েছেন বেচারাম মান্না। সেবারই প্রথম সিঙ্গুর থেকে টিকিট পেয়েছিলেন বেচারাম। ছেড়ে এসেছিলেন নিজের শক্ত ঘাঁটি হরিপাল। পার্সেন্টেজ সামান্য কমলেও, প্রায় ২৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীকে তিনি পরাস্ত করেন। তাই এবারও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
শিল্প নিয়ে অবশ্য আত্মবিশ্বাসী মমতার এই বিশ্বস্ত সৈনিক। তাঁর দাবি, এই সময়ের মধ্যে প্রায় ১৬০০ নতুন শিল্প এসেছে। শুধু সিঙ্গুর এলাকায় নয়, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে এবং দিল্লি রোডের দু’পাশে তাকালেই পরিবর্তন চোখে পড়ে। হুগলি ছাড়িয়ে পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান সর্বত্র একই ছবি। পানাগড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে অনেক বড়ো সংস্থা আসছে। রাজ্যের সার্বিক শিল্পোন্নয়নের অংশীদার সিঙ্গুরও। বেচারাম মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আন্দোলনটা শিল্পের বিরুদ্ধে ছিল না। ছিল অনিচ্ছুক চাষিদের থেকে জোর করে চাষের জমি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে। তাই সিঙ্গুর নিয়ে বিরোধীদের ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে, বিজেপি এবার টিকিট দিয়েছে অর্থোপেডিক সার্জন ডাঃ অরূপকুমার দাসকে। প্রচারে বেরিয়ে ভোটারদের বাড়ি গিয়ে তিনি রোগী দেখার কাজও করেছেন। সার্বিকভাবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষ বলেই তাঁকে চেনেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতো বড়ো নাম কে ছাপিয়ে বেচারাম মান্নাকে তিনি হারাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে রাজনৈতিক মহল। অন্যদিকে, সিপিএমের প্রার্থী সবুজ দাসও মাটির মানুষ। কারও রক্ত লাগলে যেখানেই থাকুন, ছুটে গিয়ে দিয়ে আসেন। প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্বপ্নকে সত্যি করে সিঙ্গুরে শিল্প ফেরাতে চান তিনি। তবে গতবার সৃজন ভট্টাচার্যের মতো তরুণ প্রার্থী পেয়েছিলেন মাত্র ১৪.৩০ শতাংশ ভোট। ২০১৬ থেকে সিপিএমের ভোট কমেছে ২৪.৫৩ শতাংশ। এই সুযোগে ক্রমেই বেড়েছে তৃণমূলের শাখা-প্রশাখা।

সম্পর্কিত সংবাদ