সুপারহিট জয়ললিতা-এমজিআরের সিক্যুয়েল কি তৃষা-বিজয় জুটি? তামিল সিনেমা এবং রাজনীতির দুই অধ্যায় নিয়ে লিখলেন সমৃদ্ধ দত্ত
সুপারহিট জয়ললিতা-এমজিআরের সিক্যুয়েল কি তৃষা-বিজয় জুটি? তামিল সিনেমা এবং রাজনীতির দুই অধ্যায় নিয়ে লিখলেন সমৃদ্ধ দত্ত
জয়ললিতা-এমজিআর
আম্মু একা থাকতে ভালোবাসে না। কিন্তু তার জীবন একাকিত্বের চিত্রনাট্য। দু’বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর আম্মুর মা বেদা দুই সন্তানকে নিয়ে পিতৃগৃহে চলে এসেছিলেন। কাজও জুটিয়ে নেন আয়কর দপ্তরে। বিধবা বেদা একটি মেলায় গিয়েছেন পরিবারের সঙ্গে। এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে তাঁকে বললেন, আমি কন্নড় সিনেমা করি। আমার ছবিতে কাজ করবেন? আপনার স্টার হওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব আছে। এই পরিবারটি তামিলনাড়ুর শ্রীরঙ্গমের হলেও বেদার পিতা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকালে চাকরি করার সুবাদে বেঙ্গালুরুতে থিতু হয়েছে। তাই পরিবার থাকে ওই শহরেই। কিন্তু কট্টর ব্রাহ্মণ পিতা রঙ্গস্বামী আয়েঙ্গার মেয়ের মুখে সিনেমার কথা শুনেই যেন জ্বলে উঠলেন। বললেন, এসব এখানে চলবে না। বেদা শুষ্ক মুখে ঘুরে বেড়ায়।
বেদারা তিন বোন। এক বোন অম্বুজা আগেই বিদ্রোহী। সে এয়ারহোস্টেস হয়েছে। যা যথারীতি ছিল পিতার চক্ষুশুল। সেই বাধা অগ্রাহ্য করেই অম্বুজা চেন্নাই চলে আসে। শুধু যে এয়ারহোস্টেস তাই নয়, সিনেমায় অভিনয়ও করে। একসময় চাকরিটা ছেড়ে দিতে হয়। অম্বুজা সিনেমার জন্য নাম নিয়েছে বিদ্যাবতী। সে বলল, দিদি, ওখানে থাকলে সারাজীবন তোকে ওই কড়া শাসনে আয়কর বিভাগের কেরানি হয়েই থাকতে হবে। আমার কাছে চলে আয়।
বেদা তাই করেছিলেন। আর বিধাতার চিত্রনাট্যও ছিল নাটকীয়তায় ভরা। তামিল সিনেমার মতোই। তাই বিদ্যাবতীর সঙ্গে সিনেমা নিয়ে কথা বলতে আসা এক প্রযোজক বলেন, আরে, তোমার দিদি তো চমৎকার দেখতে। নায়িকা হওয়ার সব লুকস আছে। উনি রাজি হবেন? বেদা কয়েক মুহূর্ত ভেবে বললেন, আমি রাজি! সিনেমা জগতে পা রাখলেন বেদা। নতুন নাম হল তাঁর, সন্ধ্যা!
বেশ টাকা-পয়সা আসছে। কন্যা আম্মুর খুব পড়াশোনার দিকে ঝোঁক। তাকে ভরতি করা হল বিশপ কটন স্কুলে। বেঙ্গালুরুতে। কিন্তু সন্ধ্যা থাকবে চেন্নাইয়ে। আর ছেলেমেয়ে বেঙ্গালুরুতে! কেন? কারণ, দুই বোনেরই চেন্নাইয়ে সকাল থেকে সিনেমার শ্যুটিং। ছেলেমেয়েকে কীভাবে সময় দেবেন তাঁরা? তাই আম্মু আর তার ভাই পাপ্পুকে পাঠিয়ে দেওয়া হল রঙ্গস্বামীর কাছে। অর্থাৎ দাদুর পরিবারে।
সন্ধ্যা সুযোগ পেলেই আসেন। কিন্তু সেই আসা সামান্য সময়ের জন্য। মাসি পদ্মা এতদিন দিদির দুই ছেলেমেয়েকে দেখভাল করেছেন। কিন্তু তাঁরও বিয়ে হয়ে গেল। আম্মু আর পাপ্পু আরও একা। বৃদ্ধ দাদু-দিদার পক্ষে তো সম্ভব হচ্ছে না। সন্ধ্যা বাধ্য হলেন পুত্র-কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে। আম্মু ভরতি হল বিখ্যাত চার্চ পার্ক কনভেন্ট স্কুলে।
দিন যায়। আম্মু বুঝতে পারে সে যতটা প্রত্যাশা করেছিল, ততটা আনন্দ যেন তার জন্য বরাদ্দ করেনি নিয়তি। কারণ মা সেই সকালে চলে যায়। আসে অনেক রাতে। আম্মু আর পাপ্পু ঘুমিয়ে পড়ে। আম্মু মায়ের আদরের প্রতীক্ষায় থাকে। স্কুলের প্রবন্ধ রচনায় সে লেখে, ‘মাই মাদার! হোয়াট শি মিনস টু মি’! শিক্ষিকা বলেন, এত ভালো লিখেছ। আমার চোখে জল আসছে। তিনি ক্লাসকে বলেন, শোনো তোমরা, জয়ললিতা কী লিখেছে। হ্যাঁ। আম্মুর নাম জয়রাম জয়ললিতা!
আম্মুর জন্মদিন। কিন্তু সন্ধ্যার সেদিনও কাজ। চেন্নাইয়ের বাইরে শ্যুটিং। আম্মু স্কুল থেকে ফিরে অপেক্ষা করে মায়ের জন্য। মা আসে না। আম্মু মনের কথা একটি কাগজে লেখে, ‘মা, আমি তোমার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আছি। আমাকে তুমি উইশ করবে না!’ তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। সন্ধ্যা অনেক রাতে ফেরেন। হন্তদন্ত হয়ে। আম্মুর আজ জন্মদিন। কিন্তু আম্মু নিদ্রামগ্ন। বালিশের পাশে কাগজ। সেখানে ওই লেখা দেখে সন্ধ্যার চোখ থেকে নামে এক সমুদ্র অশ্রু। তিনি দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আম্মুকে বলেন, আমি আর কোনোদিন দেরি করব না। আম্মুর বুক ভরে যায় আনন্দে।
কিন্তু সন্ধ্যা কথা রাখতে পারেন না। আবার দেরি। আবার আম্মু একা। সে সারাদিন বই পড়ে। কল্পনা করে। এক বন্ধু বাড়িতে আসে। গল্প করতে। কিন্তু সেই বন্ধু কি আম্মুর জন্য আসে? না। আম্মু বুঝতে পারল, তাদের ছাদ থেকে কয়েকটি বাড়ি পরেই যে ছাদ, সেখানে এক কিশোর আসে। সেই ছেলেটিও ওই সময়েই ছাদে আসে। দু’জনের মধ্যে হাতের ইশারা হয়। আম্মু মুগ্ধ চোখে শিহরিত হয়। এই তাহলে প্রেম!
কিন্তু সেই বন্ধুর আসা বন্ধ হয়ে গেল। কারণ মেয়েটির মা-বাবাকে তাঁদের প্রতিবেশীরা বলেছেন, তোমাদের মেয়ে ওই সিনেমা নায়িকার মেয়ের কাছে যায় রোজ। সেখানে তাকে পাশের বাড়ির ছেলের সঙ্গে প্রেম করতে শেখায় ওই সিনেমার নায়িকার মেয়েটি। তোমার মেয়ে খারাপ হয়ে যাবে ওই আম্মুর সঙ্গে মিশলে। ওকে আর পাঠিও না। ফলে সেই বন্ধুর আসাও বন্ধ হয়ে গেল। আম্মু মন থেকে ঘৃণা করতে শুরু করল একটি জগতকে। সিনেমা। সে বুঝল, সিনেমায় অভিনয় করলে সমাজে সম্মান পাওয়া যায় না।
সন্ধ্যার একটি সিনেমা খুব হিট হয়েছে। কারনান। সেই সিনেমা ১০০ দিন ধরে চলছে হলগুলিতে। বড়োসড়ো সাকসেস পার্টি হবে প্রযোজকের বাড়িতে। আম্মুর ভালো লাগে না। কিন্তু মা বলল, চল, সবার সঙ্গে মিশতে হবে তো! নিয়তি মুচকি হাসেন। তিনি তাঁর চিত্রনাট্যের পরবর্তী অধ্যায় লিখতে শুরু করলেন। পার্টি শেষে সন্ধ্যা যখন ক্লাস টেন পরীক্ষা দেওয়া মেয়েকে নিয়ে ফিরছেন, তখন প্রযোজক বি আর পান্থুলু এগিয়ে এসে বললেন, সন্ধ্যা একটা কথা ছিল। আমার পরবর্তী। সিনেমা কন্নড়ে করব। সেখানে নায়িকার রোলে এক কিশোরীকে চাই। তোমার মেয়ে কি করবে?
সন্ধ্যা ভাবলেন এবার একটা কেলেঙ্কারি হবে। কারণ আম্মু সিনেমা পছন্দই করে না। তিনি মেয়ের দিকে তাকালেন। তিনি জানেন, মেয়ে এখনই না বলবে। তার আগেই সন্ধ্যা বললেন, কিন্তু স্যর ওঁর ক্লাস টেনের পরীক্ষা শেষ হল। কলেজে ভরতি হবে। প্রযোজক বলেন, সে তো দু’মাস বাকি! তার আগেই শ্যুটিং শেষ। আম্মু এবার মুখ তুলে বলল, আমি রাজি! সন্ধ্যা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না! এটা কীভাবে সম্ভব? আম্মু সিনেমা করবে!
আম্মু নামের একাকী এক কন্যার অন্য জীবন শুরু হল। জন্ম হল জয়ললিতার। কিছু মাস পর, জয়ললিতাকে ফের একটি সিনেমায় অভিনয়ের অফার দিলেন বিখ্যাত পরিচালক শ্রীধর। তখন আর রাজি নন জয়ললিতা। কিন্তু মা সন্ধ্যা বললেন, শ্রীধরের অফার প্রত্যাখ্যান করার কথা কেউ ভাবতেই পারে না। তোমার জীবন বদলে যাবে। জয়ললিতা রাজি হলেন। আর শ্রীধরের সিনেমায় শ্যুটিং করার সময়েই ঘটল জয়ললিতার জীবনের সর্ববৃহৎ ভূমিকম্প। যা ক্রমেই পরিণত হবে এক ট্র্যাজিক রূপকথায়। আদ্যন্ত ব্লকবাস্টার তামিল সিনেমা! কারণ, সেই প্রথম সিনেমার প্রযোজক আবার এলেন নতুন ছবির অফার নিয়ে। এবার ছবির নাম ‘আইরাত্থিল ওরুভান’। জয়ললিতার বয়স ১৬। আর নায়কের বয়স ৫১। নায়কের নাম? এম জি রামচন্দ্রণ! ভক্তদের প্রিয় এমজিআর। তামিল সিনেমার সুপারস্টার। প্রথম সিনেমায় বাজিমাত এই জুটির।
আর ঠিক তখনই হিন্দি বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের ঝড় আছড়ে পড়েছে তামিলনাড়ুতে। জয়ললিতা অন্য সিনেমাও করছেন। কিন্তু যখনই তাঁকে দেখা যাচ্ছে এমজিআরের বিপরীতে, ঠিক তখনই সেই ছবি সুপারহিট। অতএব তামিল প্রযোজক পরিচালকেরা বেশি করে তাঁদের জুটি করে সিনেমা তৈরি করছেন। একইসঙ্গে এমজিআর রাজনীতির জগতে প্রবেশ করেছেন। কারণ—তাঁর বন্ধু। যিনি আবার তুমুল জনপ্রিয় চিত্রনাট্যকার। সেই বন্ধুর কথাতেই রাজনীতিতে প্রবেশ এমজিআরের। এই দু’জনের জুটিও সুপারহিট। বন্ধুর নাম এম করুণানিধি। করুণানিধির কাহিনি, এমজিআর নায়ক। ছবি ১০০ শতাংশ সুপারহিট। সেই করুণানিধি ডিএমকে দলেরও প্রথম সারির নেতা। আর সেই সূত্রেই রাজনীতির মঞ্চে আগমন এমজিআরের।
১৯৭৩ সালে বন্ধুত্বে চিড় ধরল। ডিএমকে ভেঙে এমজিআর নতুন দল গঠন করলেন। এআইএডিএমকে। সুপারস্টার এমজিআর। ততদিনে তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের মধ্যে মনান্তর তৈরি হয়েছে। কারণ এমজিআর মেয়ের বয়সি এক নায়িকা, জয়ললিতার সঙ্গে যেন একটু বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন। চারদিকে কানাকানি। সম্মান ও পরিবার রক্ষায় এমজিআর ঠিক করলেন, আর জয়ললিতার সঙ্গে কোনো সিনেমা করবেন না। করলেনও না। কিন্তু বিধির বাঁধন কে খণ্ডাতে পেরেছে! অতএব এমজিআর ১৯৭৭ সালে এআইএডিএমকের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই দলের রাশ ধরতে হঠাৎ ডেকে আনলেন জয়ললিতাকে। দলের মধ্যে বিরোধ। স্ত্রী জানকী রামচন্দ্রণ ডিভোর্সের হুমকি দিলেন। কিন্তু এমজিআর ততদিনে জয়ললিতাকে ত্যাগ করার কথা ভাবতে পারছেন না। অতএব ফের জয়ললিতার নতুন জীবন।
এই জীবন কি সহজ ছিল? একেবারেই নয়। জয়ললিতা বারংবার বলছেন, তাঁকে বিবাহ করার কথা। এমজিআর কিন্তু তাঁর প্রাণপ্রিয় আম্মুকে বিবাহ করেন না। অথচ তিনি ভালোবাসেন। জয়ললিতার জীবনে চরম আঘাত আসে একের পর এক। এমজিআর হাসপাতালে ভরতি। অথচ জয়ললিতার হাসপাতালে যাওয়া বারণ। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে, চিঠি লিখে জয়ললিতা কেঁদে বলেন, আমাকে একটিবার হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ করে দিন।
এমজিআরের মৃত্যু হয়। জানকী রামচন্দ্রণ হলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু মাত্র ২৪ দিনের জন্য। সিংহভাগ বিধায়ক ও অনুগামী ততদিনে জয়ললিতার পক্ষে। তাঁরা চাইছেন, দলের কর্ণধার হবেন জয়ললিতা। ১৯৮৯ সালে নির্বাচনে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দেখা গেল জানকী রামচন্দ্রণের দল বিপর্যস্ত। জয়ললিতার দল বিপুলভাবে জয়ী। বাধ্য হয়ে জানকী রামচন্দ্রণের গোষ্ঠী মিশে গেল জয়ললিতার সঙ্গে। এমজিআর যা চেয়েছিলেন, তাই হল। বহু লড়াইয়ের পর তাঁর নিজের দল শেষ পর্যন্ত তাঁর আম্মু জয়ললিতার অধিকারেই এল। কারণ এই দলের উত্থানে এমজিআর ও জয়ললিতার গ্ল্যামার, ক্যারিশমা, জনপ্রিয়তা, প্রেম এবং ট্র্যাজেডির উপখ্যান জড়িত।
জীবন তাঁদের দু’জনকে মিলিত হতে দেয়নি। মৃত্যুর পর এমজিআর স্মৃতিসমাধির পাশে হয় জয়ললিতার স্মৃতিসমাধি। লক্ষ লক্ষ ভক্তদের চোখের জলে চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচে সম্পন্ন হল এমজিআর ও জয়ললিতার ক্লাইম্যাক্স দৃশ্য!
তৃষা-বিজয়
• ১০ বছরের এক কিশোর সিনেমায় সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু পছন্দমতো ভূমিকা পায়নি। সে চাইছিল এমন কোনো চরিত্র তাকে দেওয়া হোক, যার প্রতিটি সংলাপে সিনেমা হলে করতালির ঝড় বয়ে যাবে। পরিচালক হেসে বলেছিলেন, কার মতো? সে বলেছিল, এমজিআর স্যরের মতো! আচ্ছা স্যর, আমাদের সিনেমায় একটি দৃশ্যেও কি এমজিআর স্যারকে আনা যায় না? একই স্ক্রিনে আমরা দু’জনে থাকব। পরিচালক বিস্মিত হয়ে ভাবছেন, এই ছেলে বলে কী! একটা ছোট্ট রোলে নেওয়া হয়েছে। আর এখনই ও চায় কিংবদন্তী এমজিআরের সঙ্গে অভিনয় করতে! আর ওকে এমন সংলাপ দিতে হবে, যাতে এমজিআরের স্টাইলে বলে মানুষকে পাগল করে দেয়! ১০ বছরের সেই কিশোরের নাম জোসেফ বিজয়। তার পরের সিনেমার নাম, নান সিগাপ্পু মানিত্থান। যাঁর সঙ্গে কিশোর অভিনয় করবে, তাঁর নাম রজনীকান্ত। এই হল সেই রজনীকান্ত যাঁর কণ্ঠের ডাবিং ঠিক কিছু বছর পর এই কিশোরই করবে। যদিও ততদিনে সে নিজেই কয়েকটি সিনেমায় নায়ক হয়ে যাবে।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার সাফল্যের স্বাদ পেলেন বিজয়। সিনেমার নাম, পুবি উনিক্কামা। আর পরের বছরই হঠাৎ তিনি দেখলেন, শ্যুটিং ফ্লোরে সকাল থেকে এক তরুণী অপেক্ষা করছেন। কী ব্যাপার! কে এই মেয়েটি? অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর বললেন, তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। সেই লন্ডন থেকে এসেছে। মেয়েটি শিল্পপতি। না না, বাবা শিল্পপতি নয়। মেয়েটি নিজেই শিল্পপতি।
বিজয় কাছে এলেন। নাম জানতে চাইলেন।
মেয়েটি বললেন, সঙ্গীতা স্বর্ণলিঙ্গম।
লন্ডন থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে?
সঙ্গীতা বললেন, আমি আপনার সবথেকে বড়ো ভক্ত। আপনার সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছা ছিল। আমি লন্ডনে থাকলেও আমার বাড়ি শ্রীলঙ্কা। আমরা শ্রীলঙ্কান তামিল!
দু’জনের চোখ মিলিত হল। ১৯৯৯ সালে বিবাহ।
আর ঠিক ওই বছরই বিধাতা ভাবলেন, একটি সুপারহিট প্লটের সিক্যুয়েল লেখা যাক। ১৯৯৯ সালে একদিকে যখন বিজয় ও সঙ্গীতার বিয়ে হচ্ছে, ঠিক তখনই একটি অত্যন্ত সাধারণ সিনেমায় আবির্ভাব ঘটছে এক কন্যার। সিনেমার নাম, জোড়ি। কত বয়স সেই কন্যার? ১৬। জয়ললিতার কত বয়স ছিল প্রথম সিনেমার সময়? ১৬। এই কন্যাটির নাম কী? তৃষা কৃষ্ণাণ। জয়ললিতা কী হতে চেয়েছিলেন? শিক্ষিকা। কিন্তু হয়ে গেলেন নায়িকা। তৃষা কী হতে চেয়েছিলেন? ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট। কিন্তু তাঁকে দেখেই এক বিজ্ঞাপন সংস্থা বলেছিল, আমাদের হয়ে একটি মডেলিং করবে? তৃষা ৫০০ টাকার বিনিময়ে সেই মডেলিং করেছিল। আজ সিনেমায় তৃষার সাইনিং অ্যামাউন্ট ১২ কোটি টাকা!
জয়ললিতার প্রথম সিনেমাগুলি কি সেভাবে জনপ্রিয় হয়? না। এমজিআরের সঙ্গে প্রথম সিনেমা সুপারহিট। আর সেখান থেকেই তাঁর প্রধান যাত্রা শুরু। তৃষা মিস ইন্ডিয়ার বেস্ট স্মাইল অ্যাওয়ার্ড জয়ী হলেও কিন্তু প্রথম সিনেমাগুলি সেভাবে যেন নজর কাড়ছিল না মানুষের। তবে ২০০২ সালে প্রিয়দর্শনের ‘লিসা লিসা’ এবং সূর্যর বিপরীতে ‘মৌনম পেসিয়াধে’ দেখে এক নতুন মুখের আগমনে নড়েচড়ে বসেছিল তামিল জনতা। কিন্তু বিস্ফোরণ ঘটল ২০০৪ সালে। সিনেমার নাম, ঝিল্লি।
এক খুনি মাফিয়ার লালসার হাত থেকে এক তরুণীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এল এক সরল সাদাসিধে যুবক। সেই যুবকের ভূমিকায় বিজয়। তরুণীর ভূমিকায় তৃষা। সিনেমা সুপারহিট। এবং অবিকল যেন সেই পুরানো কাহিনি আবার নবরূপে পল্লবিত হল। তাঁদের দু’জনের সিনেমাই সর্বদা সুপারহিট। কিন্তু শুধুই কি সিনেমার পর্দায় এই দু’জন রোমান্স করেন? তাঁদের মধ্যে যেন বিশেষ এক রসায়নও দেখা যাচ্ছে।
যথারীতি কানাঘুষো শুরু হল। পত্রপত্রিকা, মিডিয়া এবং ইন্ডাস্ট্রির গুঞ্জন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে, বিজয় এবং তৃষা স্থির করলেন, আর একসঙ্গে কোনো সিনেমা করবেন না তাঁরা। কারণ বিজয়ের পরিবারে তার ছায়া পড়ছে। ঠিক যেমন এমজিআর এবং জানকীর মধ্যে দূরত্ব এসেছিল। তেমনই এক অবিশ্বাসের ছায়া প্রলম্বিত হল সঙ্গীতা ও বিজয়ের সম্পর্কেও। তাই সিদ্ধান্ত হল, আর জুটি নয়। তামিল দর্শকের মাথায় যেন বাজ পড়ল। এই জুটিকে আর পর্দায় দেখা যাবে না!
কিন্তু ওই যে! বিধির লিখন! সেরকম জোরালো চিত্রনাট্য আর কে লিখবে এই দুনিয়ার কোনো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে! অতএব ২০১৫ সালে জানুয়ারি মাসে বিবাহ স্থির হয় তৃষার। কিন্তু মে মাসে সেই এনগেজমেন্ট ভেঙে যেতেই ফের প্রবল জল্পনা শুরু। তৃষা বিয়ে করছেন না কেন? এতদিন পর বিয়ে স্থির হল। তাও ভেঙে গেল! কারণ কী?
তৃষা একাকী হয়ে গেলেন। সিনেমা করেন। ঘরে ফেরেন। কারও সঙ্গে কথা বলেন না। তাঁর সিনেমা জনপ্রিয় হয়। কিন্তু তার আগে কি তাঁর সংগ্রাম ছিল না? অসামান্য এক সংগ্রামে জয়ী হয়ে ফিরেছেন তিনি। বিজয়ের সঙ্গে সিনেমা বন্ধ হওয়ার পর একের পর এক সিনেমা তৃষার ফ্লপ করেছে। সর্বত্র ধরে নেওয়া হয় তৃষার কেরিয়ার শেষ। ২০১০ সালে ভিন্নইথান্ডি ভারুবায়া শুধু যে হিট হল, তাই নয়। সেরা অভিনেত্রী হলেন তৃষা। কিন্তু তবু অন্ধকার কাটেনি। ২০১৮ সালে একটি মিরাকল ঘটল। বিজয় সেতুপতির বিপরীতে অবিস্মরণীয় এক তামিল সিনেমায় অভিনয় করলেন তৃষা। সিনেমার নাম নাইনটি সিক্স! আজও সকলের অভিমত ওই ছবি তাঁর সেরা অভিনয়। এখনও পর্যন্ত।
চিত্রনাট্য তখনও ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছায়নি। ২০২৩ সালে সাম্প্রতিককালের অন্যতম সেরা নাটকীয় থ্রিলারের জন্ম হল। লিও। ১৪ বছর পর আবার পুনর্মিলন। এই মেগাহিট ব্লকব্লাস্টার সিনেমার হিরোর নাম বিজয়। নায়িকা তৃষা। আর সেই বছরই বিজয়ের ঘোষণা তিনি রাজনীতিতে আসছেন। আবার গুঞ্জন বিজয় ও তৃষাকে ঘিরে। সঙ্গীতা ডিভোর্সের মামলা করলেন। বিবাহের ২৭ বছর পর। কারণ, কোনো এক নায়িকার সঙ্গে বিজয়ের সম্পর্ক রয়েছে বলে তাঁর সন্দেহ! এমজিআর এবং জয়ললিতার ধাঁচেই যেন আবার তামিল রাজনীতি ও সিনেমা মিলেমিশে যাচ্ছে! অবিকল একই প্লট।
বিজয় রাজনীতিতে এলেন। তাঁর দলের নাম টিভিকে। এলেন। দেখলেন। জয় করলেন। প্রথম নির্বাচনেই জয়ী। এবং তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। এতদিন মুখ খোলেননি তৃষা। বিজয়ের শপথগ্রহণের দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখলেন মনের কথা, ‘ভালোবাসা সর্বদাই সরব!’
তৃষার নিজের চরিত্রের প্রিয় গান কোনটা? ‘মুত্থাই মারাগাই’! সাম্প্রতিক কালের সেরা গান। এ আর রহমানের সুরে মণিরত্নমের ‘ঠগ লাইফ’ সিনেমার। ‘আমি তোমার আত্মা, তোমার জীবন... তোমার চোখে আমি বাস করি!’ তামিল রাজনীতির নতুন প্লট—তৃষা-বিজয়?