


কাকলি ঘোষ
নিঃশব্দে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল সুদাম। অনেকদিন থেকেই তক্কে তক্কে ছিল ও। খবরাখবর নিয়েছে ভেতরে ভেতরে। তাছাড়া ওই কাজের মেয়ে বাতাসীকে কি এমনি এমনি ফুচকা খাইয়েছে গত তিনদিন ধরে? বাতাসী হয়তো ভেবেছে, সুদাম ওকে দেখে মজেছে। ধুস। ওসব মাথাতেও নেই ওর এখন। একটা বড়ো দাঁও না মারতে পারলে আর চলছে না। ছোটোখাটো চুরিটুরিতে আজকাল অরুচি এসে গেছে। যাক। এতদিনে বোধহয় ইচ্ছে পূরণ হবে। আজ ফাইনাল খবর পেয়েছে। লাইন ক্লিয়ার। ফুচকায় বেশি করে ঝাল দিয়ে আয়েশ করে খেতে খেতে সব বলেছে বাতাসী। বুড়ো একা এখন। বাড়ির লোকেরা দু’দিনের জন্য দীঘা বেড়াতে গেছে। বাতাসী সারা দিন থেকে রাতে বুড়োকে খাইয়ে ঘরে চলে যায়। আবার সকাল হতে না হতেই আসে। শুনেই তো লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছে হয়েছে ওর। আজ রাতেই কেল্লা ফতে করবে।
আগেই বাড়ির চারপাশটা ঘুরে ফিরে দেখে নিয়েছে। দোতলা বাড়ি। উপর-নীচ মিলিয়ে গোটা পাঁচেক ঘর। সদর দরজা পেরিয়ে সামনে উঠোন। তারপর পাশাপাশি দুটো ঘর। বাড়িতে কেউ নেই যখন দরজায় হয়তো তালা দেওয়া থাকবে। সে থাকুক। তালা ভাঙা কোনো ব্যাপার নয়। আলমারিতে মোটামুটি নগদ বেশ কিছু থাকার সম্ভাবনা আছে। বুড়ো তো সদ্য পেনশন তুলেছে। অন্তত সেটা তো আছেই। তাছাড়া বউদের ছোটোখাটো গয়না তো থাকবেই। বাইরে গেছে। গয়না তো ঘরেই খুলে রেখে যাবে নিশ্চয়ই। আর সারা মাসের সংসার খরচের টাকা তো আলমারিতেই থাকার কথা। ভাবতে ভাবতেই আনন্দে হাতে হাত ঘষল ও। বেশ কিছু নগদ হাতে আসতে চলেছে এবার।
রাত এখন প্রায় একটা। ঘণ্টাখানেক আগেই তো বীরুবাবুদের বাড়ির ঘড়ির বারোটার ঘণ্টা কানে এসেছে। বুড়ো নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। আর দেরি না করে এবার ঢোকা যাক ভেতরে। পাঁচিল ডিঙিয়ে ঢুকবে? নাকি একবার দরজার খিল খোলা যায় কি না দেখবে? নাহ। দরকার নেই। খিল যদি আলগা থাকে পড়ে গেলে আওয়াজ হবে। পাঁচিল তো মাত্র এইটুকু।
এদিক ওদিক তাকিয়ে ঝুপ করে ভিতরে লাফিয়ে পড়ে ও। বারান্দায় একটা টিমটিমে বাতি জ্বলছে। অনেক গাছপালা। তাই আলো থাকলেও উঠোনটায় ঝুপসি আঁধার। নিঃশব্দে বারান্দায় উঠে যায় ও। বুড়ো নীচেই থাকে। বাতাসী বলেছে। ছেলেরা দোতালায়। বুড়োর ঘরের পাশেই বাথরুম। আর তার পাশেই সিঁড়ি। ওই তো। আগে ওপরে যাওয়া যাক। পরে বুড়োর ঘরে ঢুকবে।
পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায় ও। অন্ধকারে দেখতে একটুও অসুবিধে হয় না । ওর বন্ধুরা বলে ও নাকি অন্ধকারে পেঁচার মতো দেখতে পায়। কিছুটা সত্যিই বটে। চোখের জ্যোতি যেন দ্বিগুণ হয়ে যায় ওর আলো না থাকলে। এই তো দিব্যি দেখতে পাচ্ছে বেশ শক্তপোক্ত একখানা তালা লাগানো রয়েছে দরজায়। হাতে করে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ও। এক বিচিত্র হাসি ফুটে ওঠে ওর মুখে। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বের করে নেয় সেই মোক্ষম অস্ত্রটি। নাসির ওস্তাদের নিজের হাতে তৈরি—সব তালা খোলে। এ চাবিতে খোলা যায় না এমন তালা নেই। ওস্তাদ ভালোবেসে দিয়েছিল ওকে। মনে মনে ওস্তাদকে স্মরণ করে তালার গায়ে চাবি ঢোকাল ও। কড় কড় কড়াৎ। বুকের ভিতরে রক্ত ছলকে ওঠে ওর। খুলে গেছে দরজা। সামান্য চাপ দিয়ে পাল্লা দুটো ফাঁক করে ভিতরে ঢুকে পড়ে ও। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে চোখ সইয়ে নেয়। তারপর একটু একটু করে ঘরের সবকিছু স্পষ্ট হতে থাকে ওর সামনে। খাট একটা জানলা ঘেঁষে। তার পাশেই ড্রেসিং টেবিল। খাটের পায়ের দিকে আলমারি। ঠিক ওর থেকে তিন-চার হাত দূরে। সামনে এগিয়ে যায় ও। পকেট থেকে বের করে নেয় সরু টর্চটা। জ্বালতেই আলোটা ঠিক গিয়ে পড়ে আলমারির চাবির গর্তে। চাবি হয়তো ঘরেই কোথাও আছে। তবে এই আলমারি খোলার জন্য চাবি লাগে না ওর। একটা কাঁটা বা ক্লিপই যথেষ্ট। মামণিরা কি এক আধটা ফেলে যায়নি ওর জন্য? টর্চের আলোটা ড্রেসিং টেবিলের একটু এদিক ওদিক ঘুরতেই অভীষ্ট জিনিসটা চোখে পড়ে ওর। দু’মুখওয়ালা একটা কাঁটা যেন ওর অপেক্ষাতেই মুখ হাঁ করে পড়ে আছে। ঠিক তিন সেকেন্ডের মাথায় আলমারিটা খুলে ফেলে ও। সামনের তাকগুলোতে শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ হাবিজাবি জিনিস। আসল মালগুলো কোথায় রেখেছে? খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যায় ও। ওঃ! খুব বুদ্ধি করেছে তো! সায়ার মধ্যে পুঁটলি করে রেখেছে গয়নাগুলো। বড়ো কিছু না হলেও খুব কমও নয়। গলার চেন। হাতের ছ’গাছা চুড়ি। পলা বাঁধানো, কানের ছুটকো ছাটকা, আংটি গোটা কতক। বাচ্চার গলার হার। বাহ। সব মিলিয়ে মন্দ নয়। কিন্তু ক্যাশ কই? ওটা বেশি দরকার। আবারও হাতড়াতে থাকে সুদাম। কোথাও না কোথাও তো রেখেছেই। ব্যাগ রয়েছে গাদাগুচ্ছের। এগুলোর ভেতর আছে নাকি? একটার পর একটা হাতড়ায় ও। শেষমেশ বেরিয়েই পড়ে। দু তাড়া নোট। সব পাঁচশো টাকার। সামনের লকারে আরও কিছু খুচরো একশো পঞ্চাশের বান্ডিল। ওঃ! লোভে চকচক করে ওঠে ওর চোখ। এক ঘরেই এত! এখনও আরও একটা ঘর, নীচে বুড়োর ঘর সবই তো বাকি। নাহ। কপাল আজ খুব ভালো। সব গুছিয়ে নিয়ে আলমারি বন্ধ করে দেয় ও। থাক। এবার পাশের ঘরে ঢুকতে হবে। ক’টা বাজল? বেশি নয় নিশ্চয়ই। টুক করে বাইরে বেরিয়ে দরজাটার গায়ে তালাটা ঝুলিয়ে দেয় ও। এবার পাশের ঘরটাতে কী পাওয়া যায় দেখা যাক। দু’পা এগতেই চমকে ওঠে ও। কী হল? নীচে একটা বিরাট শব্দ হল যেন! এই মরেছে। বুড়োটা জেগে গেল? নাকি অন্য কেউ ঢুকেছে? কীসের আওয়াজ ওটা? নিঃশব্দে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকায় ও। কই কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না। তাহলে আওয়াজটা এল কোথা থেকে? আরও কিছুক্ষণ কান পেতে রাখে ও। একটা কি রকম হালকা গোঁ গোঁ শব্দ উঠছে যেন! মাথার মধ্যে কী এক সতর্কতার ঘণ্টা বেজে ওঠে ওর। পালাতে হবে। যা পেয়েছে কম তো নয়। বেশি লোভ করতে গেলে যদি বিপদে পড়ে? দরকার কী? তার চেয়ে মানে মানে কেটে পড়াই ভালো বাবা।
পা টিপে টিপে নীচে নেমে আসে ও। গোঁ গোঁ শব্দটা আরও জোর হয়ে গেল যেন! হঠাৎই সিঁড়ির পাশে বাথরুমের দিকে চোখ পড়ে ওর। আওয়াজটা ওখান থেকেই আসছে। কে? একটা ভয়ের হিমশীতল স্রোত নেমে আসে ওর ঘাড় বেয়ে। শেষ সিঁড়িটা টপকে যেতে গিয়েই বাথরুমের খোলা দরজার গোড়ায় চোখ পড়ে যায় ওর। কে একটা পড়ে আছে না ওখানে? বুড়োটা নাকি? নিঃশব্দে কিছুক্ষণ অন্ধকারে মিশে থাকে ও। তারপর উঁকি মেরে দেখে। আর পরক্ষণেই চমকে যায়। বুড়োটাই তো। ওইভাবে উপুড় হয়ে পড়ে আছে কেন? বাথরুম যেতে গিয়ে পড়ে গেছে? ওই জন্যই আওয়াজ হচ্ছিল। জ্ঞানট্যান আছে তো? কী জানি বাবা। আওয়াজটাও তো এখন বন্ধ হয়ে গেছে। মরে ফরে গেল নাকি?
যাক গে। ওর কী? ওকে তো পালাতে হবে। নইলে ধরা পড়লে মারের চোটে পাবলিক বৃন্দাবন দেখিয়ে দেবে। বুড়ো মরুক।
এগতে গিয়েও কী জানি কেন পা সরে না ওর। একবার দেখে যাবে নাকি কী হয়েছে? কিন্তু যদি জ্ঞান থাকে? ওকে দেখে যদি চেঁচামেচি জুড়ে দেয়? ওরে বাবা! কিন্তু জ্ঞান থাকলে কি আর পড়ে থাকত? ওরকমভাবে শুয়ে থাকত? চারদিক তাকিয়ে পা টিপে টিপে আর একটু সামনে যায় ও। বারান্দার টিমটিমে বাতিতে নিথর হয়ে পড়ে থাকা শরীরটা আরও স্পষ্ট এখন। মুখ থুবড়ে পড়েছে মনে হয়। আলো জ্বালার সময়টুকুও পায়নি বোধহয়। কিন্তু পড়ল কী করে? চৌকাঠে হোঁচট খেয়েছে নাকি? পকেট থেকে সরু টর্চটা বের করে সামনে ফেলে ও। নাহ! চৌকাঠ তো নেই। তাহলে? ধীরে ধীরে আলোটা বুড়োটার মাথার দিকে তুলে দেখে। ইস্! মুখ দিয়ে গ্যাজলা উঠছে যে লোকটার! হে ভগবান! এসব কী? স্ট্রোকফোক না তো? মরে গেল নাকি বুড়োটা? কী বিপদ! আস্তে আস্তে আরও এগিয়ে নাকের কাছে হাত রাখে ও। নিঃশ্বাস পড়ছে। কিন্তু খুব মৃদু। থেমে থেমে। অনেকটা সময় নিয়ে। কী করবে এখন ও? পালাবে? হ্যাঁ হ্যাঁ। সেই ভালো। যাদের লোক তাদের হুঁশ নেই ওর কীসের দায়? এরকম একটা বুড়ো মানুষকে একা বাড়িতে রেখে সবাই মিলে বেড়াতে যায় কী করে? কাণ্ডজ্ঞান নেই কোনো? মরুক, পচুক যা খুশি হোক বুড়োর। ওর কেটে পড়াই ভালো। আর ও করবেটাই বা কী? হ্যাঁ। একটু মুখেচোখে জল দিয়ে দেখতে পারে। দেখবে? যদি সাড় ফেরে অমনি পিছন দিয়ে টুক করে কেটে পড়বে না হয়। বুড়ো উঠে ওকে ধরতে পারবে না কিছুতেই।
সাহস করে বাথরুমের আলোটা হাতড়ে হাতড়ে জ্বেলে ফেলে সুদাম। চোখ বন্ধ লোকটার। মুখ দিয়ে সাদা ফেনা উঠছে। এদিকে ওদিক তাকিয়ে বাথরুমে রাখা মগটায় জল ভরে ছিটিয়ে দেয় বুড়োটার মুখে চোখে। কই? চোখ পিটপিট করছে না তো। আরও জোরে বার দুয়েক জলের ছিটা দেয় ও। নাহ! সাড়া নেই। জ্ঞান নেই তার মানে। কী জ্বালা! ফেলে রেখে চলে যেতে পা সরছে না যে। কেবলই মনে হচ্ছে যদি সত্যি সত্যি মরে যায়? এটা ঠিক যে কেউ জানবে না ও এসেছিল আর লোকটাকে এরকম পড়ে থাকতে দেখেছে। কিন্তু ও নিজে? নিজের কাছে নিজে কী জবাব দেবে? যখন পরে শুনবে লোকটা ওইভাবে পড়ে থেকে মরে গেছে? যখন জানবে সময়ে হাসপাতালে নিয়ে গেলে লোকটা বাঁচত? তখন তাকাতে পারবে তো নিজের দিকে? চোখ মেলাতে পারবে তো নিজের সঙ্গে?
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ও। নিজেকেই নিজের বড়ো অচেনা লাগে হঠাৎ। চোর সুদাম হঠাৎ কী করে এমন ভাবতে পারছে? কী আশ্চর্য! এই মুহূর্তে পালিয়ে না গিয়ে লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে ও! কিন্তু কী করে? বুড়োর ওই লম্বা চওড়া শরীরটা একা তুলে বাইরে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। লোক চাই। কাকে ডাকবে? এত রাতে কে আসবে?
চট করে মনে পড়ে গেল ওর। বিশুর দলবল তো আছে। এখান থেকে মিনিট পনেরো গেলেই বিশুর ঠেক। সারা রাত খোলা থাকে। রাত যত বাড়ে চোলাইয়ের খদ্দের তত বেশি হয়। পিছন ফিরে একবার তাকিয়েই সোজা সদর দরজার খিল খুলে বাইরে বেরিয়ে পড়ে ও। এক্ষুনি ডেকে নিয়ে আসতে হবে ওদের কয়েকজনকে। একটা ভ্যান লাগবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বিশু নিশ্চয়ই জোগাড় করে দিতে পারবে। গলি ধরে প্রাণপণে ছুটতে
থাকে সুদাম।
জানে ও। হাসপাতালে নিয়ে গেলেই সবাই জিজ্ঞাসাবাদ করবে ওকে।
—আপনি কে? কী করে জানতে পারলেন? ভেতরে ঢুকলেন কী করে?
ইত্যাদি ইত্যাদি আরও হাজার প্রশ্ন। কিন্তু ভয় পাবে না ও। অন্তত এই সময় ওসব তুচ্ছ কথা একেবারে ভাববে না । যে করেই হোক লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। বাঁচাতে হবে। অভাব ওর স্বভাব চুরি করে ওকে চোর বানিয়েছে। তা বলে আজ এই মুহূর্তে, এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে নিজের বিবেককে চুরি হয়ে যেতে দেবে না ও। কিছুতেই না।