


সায়ন্তন মজুমদার
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’। কিন্তু আজ আমরা চলে যাব ১৯২৬ সালে। ঠিক একশো বছর আগে যে ঘটনাগুলি রবির জীবনপ্রবাহে তরঙ্গ তুলেছিল, তারই কয়েকটি ঘটনা বর্তমানের পাতায়।
জন্মদিনে এপিটাফ
শতবর্ষ পূর্বে উনিশশো ছাব্বিশের সেই জন্মদিনে কবি যেন ১৯৪১ সালের ২২ শ্রাবণের পটচিত্র এঁকেছিলেন—‘বাঁশি যখন থামবে ঘরে,/ নিববে দীপের শিখা,/ এই জনমের লীলার ’পরে/ পড়বে যবনিকা,...’ অনাগত সেই দিনে সভাঘরের ভিড়, শোকের সমারোহ, দল-বেদলের কোলাহল কোনো কিছুই কবির প্রার্থিত নয়। কবি চেয়েছেন, ঋতুচক্রের প্রাঙ্গণে, স্নিগ্ধশ্যামল আলপনার আসনে, সেঁওতি-যূথিকা-জবার আহূত স্মৃতিসভার আয়োজন। সেখানে কবির মৌনতা সত্ত্বেও চারিদিক পূর্ণ হয়ে উঠবে পাখির কলরবে। ফাগুন হাওয়া, শ্রাবণ ধারা, সন্ধ্যামেঘের অরুণ-আলোকে জেগে উঠবে কবির বার্তা। তাঁর স্মরণসভার আসন তাতেই সোনায় মুড়িয়ে যাবে। কবি চেয়েছেন তাঁর স্মৃতি গাঁথা থাকুক স্বরচিত গানে, ঝাউপাতার মর্মরে, শিউলিতলার শিশিরে। কাজের বেলা ও কাজের অবহেলার ক্ষেত্রে বসে, নিভৃতে প্রদীপ জ্বালিয়ে তিনি শুধু নানা রঙের স্বপন দিয়ে রূপের ডালি ভরবেন। মরণোত্তর ইচ্ছাসূচক এই ‘দিনাবসান’ কবিতাটিকে রবি-এপিটাফ বলে ধরা যেতে পারে।
চন্দ্রমিলন
‘একটি তথ্য জানতে চাই। শ্রীযুক্ত নগেন আইচ মশায়ের কাছে শুনলাম গুরুদেবের জন্মোৎসব ক্ষুদ্রাকারে হলেও প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৩১২ সনে, বিদ্যালয় শিলাইদহ থেকে শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরের বছর ২৫শে বৈশাখে। ‘দেহলি’ ও ‘নতুন বাড়ি’র মধ্যেকার প্রাঙ্গণে সে উৎসব হয়েছিল। তাতে সুবোধবাবু, সন্তোষবাবু (মজুমদার) ও আপনি উপস্থিত ছিলেন—এ নগেনবাবুর স্পষ্ট মনে পড়ে। ‘রবীন্দ্র জীবনী’ বা আর কোথাও এ ঘটনার উল্লেখ নেই। অনেকে কেন, সকলেই ১৩১৭ সন থেকে প্রথম ‘রবীন্দ্র জন্মোৎসবে’র কথা জানেন ও কাগজপত্রেও ইদানীং বলছেন। ‘রবীন্দ্র জীবনী’তে দেখছি আপনি ও সন্তোষবাবু ওই ১৩১২ সনের পরের বছর অর্থাৎ ১৩১৩ সনের ২০শে চৈত্র আমেরিকায় পড়বার জন্য রওনা হচ্ছেন। ১৩১২ সনে প্রথম জন্মোৎসব হয়েছিল কি না, এইটুকুই আমার জ্ঞাতব্য।’
১৯৫২ সালের ২ মে-র এই পত্রলেখক হলেন ‘প্রণামান্তে প্রণত’ সুধীরচন্দ্র কর। পত্রপ্রাপক ‘পূজনীয় শ্রীযুক্ত রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ অর্থাৎ বিশ্বকবির জ্যেষ্ঠ পুত্র, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় রূপে বিশ্বভারতীর আত্মপ্রকাশের পরে প্রথম সারথি বা উপাচার্য। এই চিঠির উপরেই রথীবাবু যা উত্তর দিয়েছিলেন তাতে কিছুটা আশ্চর্য হতে হয়— ‘আমি ঐতিহাসিক নই। আমার তারিখ প্রভৃতি কিছুই মনে থাকে না। আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত বলতে পারব না।’
১৯২৬ সালে কুমিল্লার অভয় আশ্রমে রবির সঙ্গে এই চন্দ্রের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তাঁর লেখা ‘শহীদ’ নাটকের অভিনয় দেখেছেন গুরুদেব। চন্দ্রকণ্ঠে নিজের লেখা ‘এই লভিনু সঙ্গ তব’ গানও শুনেছিলেন কবিগুরু। পরের বছর সুধীরবাবু শান্তিনিকেতনে আসেন।
‘পশ্চিমবঙ্গের কবি দেখিলাম মোর/ বাঙালের মতো নাই জেদের অপ্রতিহত জোর।’ বাঙাল সুধীরচন্দ্র সম্পর্কে একথা লিখেছিলেন গুরুদেব। তিনি ছিলেন কবির অনুলেখক। গুরুদেবের স্বসম্পাদিত ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’-এ তাঁর কবিতা ছিল। ইচ্ছাকৃতভাবে গান বা কবিতা খুঁজতে বলে চন্দ্রের সঙ্গে রবি দুষ্টুমিও করতেন।
দ্বিজপ্রয়াণ
১৯২৬ সনটি রবীন্দ্রনাথের শুরু হয়েছিল মৃত্যু দর্শনের মাধ্যমে। ১৮ জানুয়ারি ঘুমের মধ্যেই শেষ রাত্রে চিরনিদ্রার দেশে পাড়ি দেন তাঁর বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। শান্তিনিকেতনে তাঁর বাসভবন দ্বিজবিরাম কুটিরেই চিরবিরাম লাভ করেন তিনি। আশ্রমের প্রাচীনতম স্থান ছাতিমতলায় তাঁর নশ্বর দেহ শায়িত ছিল। লখনউয়ের নিখিল ভারতীয় সংগীত সম্মেলন ছেড়ে রবীন্দ্রনাথ চলে আসেন বিদায়ী দাদার কাছে। হয়তো কবির মনে পড়েছিল তাঁকে নিয়ে দাদার লেখা কবিতা— ‘নরশোভা ধরে যথা সোম আর রবি/ সেই দেব-নিকেতন আলো করে কবি।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘রাজা ও রানী’ নাটক উৎসর্গ করেছিলেন।
ছোটোবেলায় একটি কুকুরকে মেরেছিলেন দ্বিজেন্দ্রপুত্র দীপেন্দ্রনাথ। ঠাকুরবাড়ির জ্যেষ্ঠ পৌত্ররূপে তাঁর সম্মান ছিল রবীন্দ্রনাথেরও ঊর্ধ্বে। তবুও সেদিন প্রতিবাদ করেছিলেন রবিন্দ্রনাথ। উলটে দ্বিজেন্দ্রনাথের কাছে সাজা পেতে হয়েছিল কবিকে। দাদার প্রতি তা নিয়ে একটা অভিমানও ছিল। যাই হোক, দাদা-বিরহে কাতর কবিগুরুর অভিব্যক্তি ছিল, ‘বড়দাদাও গেলেন—এখন আমিই শীতের গাছে শেষ পাতাটার মতো উত্তরে হাওয়ায় কাঁপছি—ঝরে পড়লেই হয়—বোঁটাও আলগা হয়েছে।’
বিবাহযোগ
জন্ম-মৃত্যু ছেড়ে এবার বিবাহের কথায় আসি। দ্বিজেন্দ্রনাথের মৃত্যুর দু’মাসের মধ্যে তাঁর পৌত্র অজীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিবাহ হয় শান্তিনিকেতনের আশ্রমবালিকা অমিতা চক্রবর্তীর। আশ্রমের মধ্যে প্রথম বিধবা বিবাহকারী তথা মহর্ষি জীবনীর রচয়িতা অজিতকুমার চক্রবর্তী এবং লাবণ্যলেখা চক্রবর্তীর জ্যেষ্ঠা কন্যা ছিলেন তিনি।
আচার্যের ভূমিকায় ছিলেন গুরুদেব। এই বিবাহকে কেন্দ্র করেই তিনি লেখেন ‘এসো এসো আমার ঘরে’ গান। ছোটোবেলায় নামকরণের পাশাপাশি বড়োবেলায় অমিতার আরও একটি নামকরণ করেছিলেন তিনি— ‘মহিষী’। কারণ তিনি ‘রাজা ও রানী’ নাটকে রাজারূপী গুরুদেবের সঙ্গে রানির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
ঢাকাইয়া নাও
প্রথম জীবনে পূর্ববঙ্গে জমিদারি পরিদর্শনে পদ্মাবোটে কবির জলজীবন যাপনের সূত্রে আমরা পেয়েছিলাম বহু সাহিত্যসৃষ্টি। শেষ জীবনেও সেই বছর ঢাকায় গিয়ে আবার নৌকাবিলাসী হতে পেরেছিলেন তিনি। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে নবাবের তুরাগ নামক নৌকাবাসে কবি বেশ কিছুদিন ছিলেন। একজনের সংগ্রহের ‘বলাকা’ বইতে একটি কবিতা লিখে দেন কবি—‘ভারী কাজের বোঝাই তরী কালের পারাবারে/ পাড়ি দিতে গিয়ে কখন ডোবে আপন ভারে।/তার চেয়ে মোর এই ক’খানা হালকা কথার গান/হয়তো ভেসে রইবে স্রোতে তাই করিলাম দান।’ জাগতিক তরী অপেক্ষা কবির ‘সোনার তরী’র মতো সৃষ্টি যে অধিক মূল্যবান তার চিরন্তন প্রমাণ রয়ে গেল এই সৃষ্টিতে।
মণিপুরী নূপুর
পূর্ববঙ্গের সঙ্গে গুরুদেবের ত্রিপুরা ভ্রমণ ও সেখানে রাসনৃত্য দেখার পরোক্ষ ফলরূপে মণিপুরী নৃত্যশিক্ষাগুরু নবকুমার সিং, তাঁর ভাই নরেন্দ্র সিং সহ আশ্রমে আসেন। ছাত্রীদের প্রকৃত নৃত্যশিক্ষা শুরু হয়। মণিপুরী নাচ কেমন শিখেছেন ছাত্রীরা, তা পরখ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘নূপুর বেজে যায় রিনিরিনি’ গান। সেই দলে ছিলেন অমর্ত্য সেনের মা অমিতা সেন।
পূজারিনীর পূজা
রবীন্দ্রনাথ তাঁর নানা সৃষ্টির রূপান্তর করেছিলেন। ‘পূজারিনী’ কবিতা এভাবেই ‘নটীর পূজা’ নাটকের রূপ পেয়েছিল। এছাড়াও ‘প্রজাপতি নির্বন্ধ’ থেকে ‘চিরকুমার সভা’ এবং ‘কর্মফল’ থেকে ‘শোধ-বোধ’ নাট্য রূপান্তর করেছিলেন। জন্মদিনে উত্তরায়ণ চত্বরের কোণার্কে ‘নটীর পূজা’ অভিনীত হয়। এই উপলক্ষ্যে কাথিয়াবাড়-পোরবন্দরের মহারাজা বিশ্বভারতীকে বহু অর্থ প্রদান করেছিলেন।
সোমের কলমে রবির জীবনী
তখনও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রজীবনী প্রকাশিত হয়নি। রবি জীবনীকার প্রশান্তকুমার পালও জন্মগ্রহণ করেননি। কবির কথামতো জীবনচরিতে তাঁকে না পাওয়া গেলেও বঙ্গভাষায় তাঁর প্রথম জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল সেই বছরে। লেখক যামিনীকান্ত সোম অর্থাৎ দুই চাঁদের সমাহার। শিশু-কিশোরদের উপযোগী সেই বইটির নাম ছিল ‘ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ’। হিন্দি এবং উর্দু ভাষাতেও তা অনূদিত হয়। বইটির পরবর্তী সংস্করণ পাঠ করে লেখককে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে জানিয়েছিলেন ‘আনন্দিত হয়েছি।’
ফ্যাসিস্টের ফ্যাসাদ
জন্মদিনের কয়েকদিন পরেই শুরু হয় কবির বিদেশ সফর। ইতালি গিয়েছিলেন সরকারি অতিথিরূপে, যে সরকারের ‘ইল দুচে’ বা নায়ক ছিলেন এককালের শিক্ষক-সাংবাদিক বেনিটো মুসোলিনি। এই ভ্রমণের দোভাষী ছিলেন অধ্যাপক ফর্মিকি। মুসোলিনির প্রশংসা করেন কবি। কিন্তু বিশ্বের বহু বিশিষ্ট মানবতাবাদী বিষয়টাকে ভালো চোখে দেখেননি। দার্শনিক বেনেদেত্তো ক্রোচের সঙ্গে তখন প্রথম সাক্ষাৎ হলে তিনিও কবির সামনে সরকারের মুখোশ খুলে দেন। সেই সময় কবির কূটকৌশলী বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য—‘মুসোলিনীর কর্তৃত্ব ব্যঞ্জক ব্যক্তিত্ব আমাকে আকর্ষণ করেছিল। ...কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাঁর কাজ সমর্থনযোগ্য।’
ইতালির শান্তিনিকেতন
সেই দেশে স্কুলটির নাম ছিল Orti di pace অর্থাৎ শান্তিকানন। সেখানকার বাগানবিলাস এবং সাংগীতিক আবহে কবির মনে পূবের শান্তিনিকেতনী হাওয়ার দোলা লেগেছিল। একটি জলপাই চারাগাছ রোপণ করেছিলেন কবি। ফ্লোরেন্সে পেয়েছিলেন সংস্কৃতে রচিত মানপত্র।
নিশীথ সূর্য ও ভারত-ভাস্কর
সেই বছরই প্রথমবার রবীন্দ্রনাথ নরওয়ে গিয়েছিলেন। তার আগেই বিশ্বভারতীতে অতিথি অধ্যাপনার সূত্রে অধ্যাপক স্টেন কোনোর মাধ্যমে নরওয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল। সেখানে নির্বাচিত সম্রাট সপ্তম হাকোনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। বিখ্যাত অভিযাত্রী তথা নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত নানসেনের সঙ্গেও পরিচয় হয়।
হস্তলিখনে ‘লেখন’
জার্মানিতে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের সহায়তায় কেনা হয়েছিল রোটা প্রিন্ট মেশিন। প্রশান্ত-পত্নী রানি লেখপটরূপে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের কাগজগুলির উপর পেন্সিল দিয়ে লাইন টেনে দিতেন। কবি তাতে লিখতেন বহু অণুকবিতা। সম্পূর্ণ নিজের হস্তাক্ষরে রচিত হয়েছিল প্রথম বই ‘লেখন’। প্রচ্ছদপটের স্থানকালে লেখা ছিল বুডাপেস্ট, ২৬ কার্তিক ১৩৩৩।
বিকেলের হারানো কাব্য
জীবদ্দশায় একটি বই প্রকাশ হতে রবীন্দ্রনাথ দেখেননি—‘বৈকালী’। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের হাতে বিদেশযাত্রার আগে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ‘প্রবাসী’-তে কিছুটা ছাপা হয়েছিল। সুন্দর কিছু গান ছিল তাতে—‘সেই ভালো সেই ভালো’, ‘আধেক ঘুমে নয়ন চুমে’।
চন্দ্রপতন
শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়ের সূচনাবর্ষের অন্যতম ছাত্র তথা রথীন্দ্রনাথের সহপাঠী ছিলেন সন্তোষচন্দ্র মজুমদার। গুরুদেব স্বয়ং তাঁকে ব্রহ্মচর্য মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। পিতা শ্রীশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বন্ধু। শান্তিনিকেতনে গোশালার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষকতার পাশাপাশি শ্রীনিকেতনের কৃষি বিভাগ ও শিক্ষাসত্রের পরিচালনার ভার ছিল সন্তোষচন্দ্রের উপর। জমি নিয়ে মজুমদার পরিবার ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে অসন্তোষের বহু কারণ থাকলেও আজও আশ্রমের মাটিতে সুপ্রতিষ্ঠিত তাঁর নামাঙ্কিত সন্তোষালয়। ৩ নভেম্বর ১৯২৬ সালে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু হয় সন্তোষচন্দ্রের। সেই বছর রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের ভাষণ তিনিই অনুলিখন করেছিলেন। সেখানে কবিগুরু বলেছিলেন, ‘এখনো জীবনে অভাবনীয় কি কিছু নেই? তা তো বলতে পারিনে।’ সেই মাসে বিদেশযাত্রা করার সাত দিনের মধ্যেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ সন্তোষকে লিখেছেন,আশ্রমের বিদ্যালয়ে জিওনকাঠি ছুঁয়ে দিতে। এদিকে নিয়তি মরণকাঠি নিয়ে সন্তোষের অভিমুখে ধাবিত হচ্ছিল তা মহাকবির ভাবনাতীত ছিল। একমাস পরে তাঁর মৃত্যু সংবাদ পান রবীন্দ্রনাথ। তখন তিনি ছিলেন সুয়েজে। ৫ ডিসেম্বর তিনি লিখেছেন, ‘আমার এক অংশের মৃত্যু হল।...সন্তোষের কথাটা ভুলতে পারি নে। নিজের জীবনের কথাটা ভাবি—কত সুদীর্ঘ কাল বেঁচে আছি।’
রক্তরঞ্জিত রক্তকরবী
বেঙ্গল লাইব্রেরির ক্যাটালগ অনুযায়ী বছরের শেষে ২৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় কঠিনতম রবীন্দ্রনাটক ‘রক্তকরবী’। নাটকটিতে শিশিরকুমার ভাদুড়ি, উৎপল দত্তের বাস্তব বর্জনের বহু অভিযোগ থাকলেও অনেকেই আমেরিকার ধনতন্ত্রবাদী, বস্তুসর্বস্ব আগ্রাসী শাসন ব্যবস্থাকেই এই নাটকের পটভূমিকা বলে মনে করে থাকেন। একশো বছর পরে আজকের আমেরিকার মনোভাব যক্ষপুরীর মকররাজকেই প্রতিভাত করে। মৃত্যু সেখানে অন্তের কথা বলে না। তাই বিশু পাগল ধুলোয় লেগে থাকা রঞ্জনের রক্তের দাগকে বলেছিল রঞ্জন-নন্দিনীর ‘পরম মিলনের রক্তরাখী’। আমাদের প্রার্থনা, সেই রাখী নাটকের মতো আজও সকল নিপীড়িতদের এক সূত্রে বেঁধে অত্যাচারের ভগ্ন কারাগারের দরজায় নতুন প্রাণের নন্দিনীর জয়ধ্বনি তুলুক।