Bartaman Logo
৩ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

দুই গোলার্ধের শেষ শহর

ছোট্ট বন্ধুরা, আজ তোমরা এক রোমাঞ্চকর অভিযানের জন্য তৈরি হয়ে যাও। আজ আমরা যাব পৃথিবীর একদম শেষ প্রান্তে! তবে সত্যি সত্যি নয়, কল্পনায়। পৃথিবী গোল বলে তোমরা হয়তো বলতে পার, এর আবার শুরু বা শেষ কোথায়? ভৌগোলিকভাবে কথাটা সত্যি হলেও মানুষের বসতির কিন্তু একটা শেষ সীমানা আছে।

দুই গোলার্ধের শেষ শহর
  • ১০ মে, ২০২৬ ০৬:২৬
Prefer us on Google

কে পাবে পৃথিবীর শেষ শহরের তকমা? জোর লড়াই দুই গোলার্ধেই। দুই শহরের কথা জানালেন অনির্বাণ রক্ষিত

Advertisement

ছোট্ট বন্ধুরা, আজ তোমরা এক রোমাঞ্চকর অভিযানের জন্য তৈরি হয়ে যাও। আজ আমরা যাব পৃথিবীর একদম শেষ প্রান্তে! তবে সত্যি সত্যি নয়, কল্পনায়। পৃথিবী গোল বলে তোমরা হয়তো বলতে পার, এর আবার শুরু বা শেষ কোথায়? ভৌগোলিকভাবে কথাটা সত্যি হলেও মানুষের বসতির কিন্তু একটা শেষ সীমানা আছে। মানুষের তৈরি  উত্তর গোলার্ধ ও দক্ষিণ গোলার্ধের শেষ শহর ঠিক কোথায় অবস্থিত? সেখানকার জীবনযাত্রা কেমন? সেই বিষয়গুলি নিয়েই আজ আমরা 
জেনে নেব। 
প্রথমেই আমরা আলোচনা করব দক্ষিণ গোলার্ধের শেষ শহর নিয়ে। মানচিত্রে দক্ষিণ মেরুর দিকে চোখ বোলালে দেখবে ৪৫ ডিগ্রি অক্ষাংশের পর থেকে মানুষের বসতি প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে শুধু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ এবং চিলি, আর্জেন্তিনা ও নিউজিল্যান্ডের একেবারে শেষ মাথাটুকু চোখে পড়ে। তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণের শহর কোনটি? প্রধানত তিনটি শহরের মধ্যে এই নিয়ে দারুণ লড়াই চলে। সেই তিনটি শহর হল— চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামস ও পুন্তা আরেনাস এবং আর্জেন্তিনার উশুইয়া। সবচেয়ে দক্ষিণে অবস্থিত চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামস। এটি এতই দক্ষিণে যে মানচিত্রে দেখলে মনে হবে, এটি বুঝি লাতিন আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গেই লেগে আছে। কিন্তু এটি আসলে একটি দ্বীপ। তবে এখানে সমস্যা হল জনসংখ্যা। মাত্র দু’হাজার মানুষের এই ছোট্ট জায়গাকে অনেকেই শহর হিসেবে মানতে নারাজ। এরপর আসে চিলির পুন্তা আরেনাস। এর জনসংখ্যা পুয়ের্তো উইলিয়ামসের চেয়ে অনেক বেশি। আধুনিক অনেক সুবিধাও আছে। কিন্তু ভৌগোলিকভাবে এটি পুয়ের্তো উইলিয়ামস থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। তাই একেও সবচেয়ে দক্ষিণের শহর বলাটা ঠিক মানানসই 
হয় না।
সবদিক বিচার করে এই খেতাব জিতে নিয়েছে আর্জেন্তিনার উশুইয়া। প্রায় ৮৩ হাজার মানুষের বাস এই শহরে। চমৎকার রাস্তাঘাট, আধুনিক পরিকাঠামো ও পর্যটকদের কোলাহলে এটি একটি সত্যিকারের শহর। একে বলা হয় ফিন দেল মুন্দো বা পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। যাঁরা আন্টার্কটিকা মহাদেশে বেড়াতে যান, তাঁদের জাহাজ মূলত এই উশুইয়া বন্দর থেকেই ছাড়ে। এখানে পেঙ্গুইনের দল ও বরফে ঢাকা পাহাড়ের অদ্ভুত সুন্দর এক মেলবন্ধন দেখা যায়। চিলির ওই দুই শহরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় টিয়েরা দেল ফুয়েগো নামের প্রদেশে এর অবস্থান। বিখ্যাত পর্তুগিজ আবিষ্কারক ম্যাগেলান ‘টিয়েরা দেল ফুয়েগো’ বা আগুনের দেশ নামকরণটি করেন। ১৫২০ সালে স্থানীয় ইয়ামান আদিবাসীদের গ্রাম থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখে প্রথমে নাম দিয়েছিলেন ‘ধোঁয়ার দেশ’, তারপরে সেটা বদলে ‘আগুনের দেশ’ করা হয়। কারণ ধোঁয়া থাকলে আগুন তো থাকবেই! এখানকার আদিবাসীরা কিন্তু বেশিদিন বাঁচেননি। দক্ষিণে ঠিক উশুইয়াইয়ের পায়ের তলায় আরেকটি সরু প্রণালী আছে। যেখান দিয়ে ১৮৩৩ সালের ২৯ জানুয়ারি একটি বিখ্যাত জাহাজ এইচএমএস বিগল ও চার্লস ডারউইন প্রথম আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে পা দেন। তাঁরই জাহাজের নামে এটি ‘বিগল চ্যানেল’ নামে খ্যাত। 
উত্তর গোলার্ধের শেষ শহর সম্পর্কে জানার আগে একটা মজার তথ্য তোমাদের জানিয়ে রাখি। পৃথিবীর ভূগোলটা একটু অদ্ভুত। তুমি যদি উশুইয়ার মতো ঠিক একই অক্ষাংশে উত্তর গোলার্ধে যাও, তবে তুমি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পৌঁছবে না, বরং তুমি থাকবে ইংল্যান্ডের কোনো এক সুন্দর শহরে। কারণ, উত্তর গোলার্ধে প্রচুর স্থলভাগ রয়েছে। এছাড়া সমুদ্রের উষ্ণ স্রোতের কারণে উত্তরের আবহাওয়া একই অক্ষাংশের দক্ষিণ গোলার্ধের তুলনায় অনেক বেশি বাসযোগ্য। তাই উত্তরের শেষ প্রান্তে পৌঁছতে হলে আমাদের আরও অনেকটা দূরে 
যেতে হবে।  
উত্তর মেরুর দিকে ৭০ ডিগ্রি অক্ষাংশ পার হলেও বেশ কিছু মানুষের বসতি চোখে পড়বে। কানাডার নুনাভুট অঞ্চলের অ্যালার্ট হল পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের স্থায়ী জনবসতি। কিন্তু এখানে কোনো সাধারণ মানুষ থাকে না। মূলত সামরিক বাহিনীর সদস্য ও গবেষকেরা এখানে কাজ করেন এবং বছর ঘুরে তাঁরা চলেও যান। তাই একে শহর বলা যায় না।
আরও একটু দক্ষিণে নরওয়ের স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে রয়েছে লংইয়ারবাইন। এটি পৃথিবীর অন্যতম উত্তরের শহর। এখানকার নিয়মকানুন খুব অদ্ভুত। এখানে মানুষের চেয়ে মেরু ভল্লুকের সংখ্যা বেশি! তাই শহরের বাইরে বের হলে নিরাপত্তার জন্য বন্দুক সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক। মজার ব্যাপার হল, এখানে কেউ মারা গেলে তাঁকে এই শহরে কবর দেওয়া নিষিদ্ধ। কারণ, তীব্র ঠান্ডায় মরদেহ কখনো পচে না! প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষের এই জায়গাটিতে চমৎকার আধুনিক জীবনযাত্রা থাকলেও শহরের সংজ্ঞায় এটি পুরোপুরি পড়ে না।
তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের শহর কোনটি? এর জন্য আমাদের যেতে হবে আমেরিকার আলাস্কায়। আর শহরটির নাম উটকিয়াগভিক। এর পুরানো নাম ছিল ব্যারো। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের এই শহরটিই আইনগতভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের শহর। সুমেরু বৃত্তের অনেক ওপরে হওয়ায় এখানকার জীবনযাত্রা ভীষণ কঠিন।
উটকিয়াগভিক শহরের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার দিনরাত্রির খেলা। শীতকালে এখানে টানা প্রায় ৬৫ দিন সূর্য ওঠে না! একে বলা হয় পোলার নাইট। তখন পুরো শহর অন্ধকারে ডুবে থাকে। আবার গ্রীষ্মকালে টানা আড়াই মাস সূর্য কখনো অস্ত যায় না, মাঝরাতেও আকাশে জ্বলজ্বল করে সূর্য! মূলত ইনুপিয়াত নামে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে এই চরম পরিবেশে তিমি শিকার করে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে।
পৃথিবীর দুই প্রান্তের গল্প তো শুনলে। অদ্ভুত বিষয় হল, সবচেয়ে দক্ষিণের শহর উশুইয়া ও সবচেয়ে উত্তরের শহর উটকিয়াগভিক—দু’টিই অবস্থিত দুই আমেরিকা মহাদেশে। তাই তোমরা যদি কখনো পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে বা গাড়িতে যেতে চাও, তবে তাত্ত্বিকভাবে তা এই দুই আমেরিকা মহাদেশ দিয়েই সম্ভব! কোনো দিন প্যান আমেরিকান হাইওয়ের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে হয়তো তোমাদের সেই স্বপ্ন সত্যিও হতে পারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ