


তপন বন্দ্যোপাধ্যায়: বেশ উচ্চবিত্ত ঘরের পেশেন্ট মিসেস বিনীতা দত্ত। প্রৌঢ়ার বয়স পঁয়ষট্টি-ছেষট্টির মতো। দু’হাতে সোনার বালা থাকলেও সিঁথিতে সিঁদুর নেই, বেশ অভিজাত চেহারা। ভরতি করেছেন তাঁর ছেলে-বউ, পোশাক-আশাক দেখলেই অনুমান করা যায় তাঁরা খুব বিলাসী জীবনযাপন করেন।
মাকে দেখতে ছেলে প্রতীক দত্ত আসছেন দু’বেলাই, স্বভাবতই ছেলে খুবই উদ্বিগ্ন, বারবার জিজ্ঞাসা করছেন, মা এখন কেমন আছেন।
গত দু’দিন ধরে প্রৌঢ়া ভরতি আছেন হাসপাতালে, অবস্থা খুব সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে মাঝেমধ্যে, গতকাল থেকে আইসিইউ-তে রাখা হয়েছে, বিতান প্রায় সারাক্ষণ লক্ষ রাখছে যাতে পেশেন্টের হঠাৎ কিছু না হয়ে যায়!
ডাঃ বিতান মুখার্জি, এমডি, উত্তীর্ণ হয়ে হাসপাতালের বড়ো দায়িত্বে আসীন। দিনের অনেকটাই ব্যয় করে হাসপাতালের কাজে, চেষ্টা করে প্রতিটি পেশেন্টকে সুস্থ করে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে। গত ছয় মাসের মধ্যে ডাক্তার হিসেবে বেশ সুনাম হয়েছে তার। শুধু পেশেন্টদের শুশ্রূষাই নয়, তাদের বাড়ির লোকজনকেও সময় দেয়, আলোচনা করে পেশেন্টের চিকিৎসার অগ্রগতি নিয়ে।
সেদিন সকালেও ওয়ার্ডে টহল দিচ্ছে, হঠাৎ আইসিইউ থেকে হেড নার্স সুমনা মিত্র হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল, স্যার চব্বিশ নম্বর পেশেন্ট একটু সিরিয়াস হয়ে গেছে।
—তাই নাকি! বিতান ছুটল আইসিইউ-তে।
—স্যার, বিপি বারবার ওঠানামা করছে। সকালে ছিল হাই, কিছুক্ষণ পর দেখলাম লো। এখন আরও কম দেখাচ্ছে।
হঠাৎ বিপি হু হু করে নামতে শুরু করায় কপালে মস্ত ভাঁজ পড়ল বিতানের। পরশু রাত থেকে এই পেশেন্টকে নিয়ে ঝড় চলছে আইসিইউতে। প্রৌঢ় বয়সে যেমন দেখায়, তারচেয়ে কম দেখায় বিনীতা দত্তকে। এখনও কী সুন্দর দেখতে। ঠিক যেন একজন আদর্শ মা। যেমন সুন্দর কথাবার্তা, তেমনই তাঁর প্রাণপ্রাচুর্য।
পরশু বিকেলেও যখন সে ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতে এসেছিল, বেশ চাঙ্গা দেখেছিল চব্বিশ নম্বর পেশেন্টকে। হঠাৎ সেদিন মধ্যরাতে তার কাছে কল-রেজিস্টার পাঠিয়ে নাইট শিফটের নার্স ডেকে পাঠায়। আরএমও হিসেবে তাকেই প্রথমে আসতে হবে পেশেন্ট দেখতে। সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুত হয়ে এসে দেখেছিল বেশ স্প্যাজম হচ্ছে বিনীতা দত্তর। তখন থেকেই শুরু যুদ্ধের।
গত ছ’মাস ধরে এই চাকরিতে বহাল হয়েছে বিতান। আরএমও হিসেবে সারাক্ষণ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় রোগীর দেখভাল করে যেতে হয়। একটু এদিক-ওদিক হলেই পেশেন্টের বাড়ির লোকজন ভাঙচুর শুরু করে দেবে। ছ’মাসের মধ্যে অন্তত দু’বার তাকে ওয়ার্ড থেকে পালিয়ে বাঁচতে হয়েছে। ডাক্তারের কোনো গাফিলতি না থাকলেও ডাক্তারকেই দায়ী করে আক্রমণে উদ্যত হয় সবাই।
বিনীতা দত্তর কেসটা যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছে যাতে পেশেন্টকে সুস্থ করে বাড়িতে পাঠাতে পারে। এই নিয়ে পর পর দু’রাত কাটল যমবাবুর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে। প্রবাদে বলে ‘যমে-মানুষে টানাটানি’। বিতানের তো মনে হয় ‘যমে-ডাক্তারে টানাটানি’।
আজও ঘণ্টাখানেক লেগে গেল প্রেশার বাগে আনতে।
সুমনা মিত্র বলল, স্যার খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আপনি ঠিক সময়ে না এলে কী হত কে জানে!
বিতান হেসে বলল, আমি কী আর করেছি। যা করবেন উপরওয়ালা।
—তবু স্যার, আপনি যা করছেন এই পেশেন্টের জন্য! ওঁর ছেলে প্রতীক দত্ত সারাক্ষণ টেনশনে ভোগেন। আমার মোবাইল নম্বর নিয়ে গেছেন, এক-দেড় ঘণ্টা পর পর ফোন করে খবর নিচ্ছেন, মা কেমন আছেন।
—হ্যাঁ, ভিজিটিং আওয়ারের পর প্রতীকবাবু রোজ অপেক্ষা করেন আমার জন্য। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জিজ্ঞাসা করেন মায়ের ক্রাইসিস ঠিক কতটা! কিন্তু আপনি তো পেশেন্টের বাড়ির লোককে মোবাইল নম্বর দেন না। প্রতীকবাবুকে দিলেন।
—শুনেছি ব্যাংকের খুব বড়ো অফিসার। কখন কী দরকার লাগে তাই একটু হাতে রাখা ভালো।
—প্রতীকবাবুর স্ত্রী, কী যেন নাম—
—ঋতুশ্রী দত্ত, তিনিও একজন নামী ড্যান্সার।
—ও, তাই অমন চমৎকার ফিগার।
সেদিন ভিজিটিং আওয়ারের পর বিতান তার অধীনে ভরতি হওয়া সব পেশেন্টের বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলছে, সেসময় দেখল একেবারে শেষে অপেক্ষা করছেন ঋতুশ্রী দত্ত।
বিতান বলল, বলুন মিসেস দত্ত—
ঋতুশ্রী দত্তর ফিগারই সুন্দর তা নয়, তাঁর মুখশ্রীও অতুলনীয়। একটু গম্ভীর দেখাচ্ছিল তাঁকে, বললেন, চব্বিশ নম্বর পেশেন্টকে কেমন দেখছেন ডাক্তারবাবু?
বিতান বলল, দেখুন ওঁর শরীরে অনেক অসুখ বাসা বেঁধেছে। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।
—তা তো দেখতে পাচ্ছি। আপনার যা ডিভোশন তা আজকাল অনেক ডাক্তারের মধ্যে দেখতে পাই না।
বিতান বলল, ওঁর তো ক্রনিক সিওপিডি। তার উপর ব্লাড কাউন্ট খুব কম। প্রেশার ফ্ল্যাকচুয়েট করছে। এখনই আমি কিছু বলতে পারছি না। তবে আমার চেষ্টার ত্রুটি নেই।
সেদিন রাতেও বিনীতা দত্ত খুব হাঁপাচ্ছিল। এই যায়, সেই যায়। নার্স সুমনার সেদিন নাইট ডিউটি। রাতে কল রেজিস্টার পেল বিতান। ঘুম ভেঙে ছুটল হাসপাতালের আইসিইউ-তে।
সুমনা বলল, স্যার অবস্থা খুব খারাপ।
বিতান পালস দেখল। চেক করল ব্লাড প্রেশার। ওষুধের চার্ট দেখল। দুটো নতুন ওষুধ লিখে বলল, এই ইঞ্জেকশনটা এখনই চার্জ করুন।
সুমনা অভিজ্ঞ নার্স। সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে দিল। ভোরের দিকে একটু ঘুমোলেন বিনীতা দত্ত।
পেশেন্ট আপাতত থিতু দেখে বিতান বলল, আমি এবার একটু ঘুমোতে যাচ্ছি। আজ আবার আমার নাইট ডিউটি।
সুমনা বলল, আমিও বেরিয়ে যাব। আজ আমার একদিন রেস্ট।
কথোপকথনের মধ্যে সুমনা মোবাইলে ফোন অন করে বলল, বলুন, মিঃ দত্ত?
ওপাশ থেকে কিছু শুনে সুমনা বলল, আপনার মায়ের কন্ডিশন খুব খারাপ ছিল। ডাঃ বিতান মুখার্জি মধ্যরাতে কল পেয়ে এসেছিলেন। আপাতত ঠিক আছেন। তবে এখন আউট অব ডেঞ্জার নন। কিন্তু ডাঃ মুখার্জি খুব কেয়ার নিচ্ছেন—
—থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাডাম।
সেদিন বিকেলে আইসিইউ থেকে ডাক পেয়ে বিতানকে আবার আসতে হল। বিকেলের নার্স অনুপমা বলল স্যার, পেশেন্ট খুব ঘামছিলেন সারাদিন।
বিতান বলল, খুব ক্রিটিক্যাল কেস। এই পেশেন্টকে নিয়ে খুব টেনশনে আছি গত দু-তিনদিন।
—ওঁর ছেলে বারবার ফোন করছেন মায়ের খবর জানতে। জিজ্ঞাসা করছিলেন, মা বাঁচবে তো?
বিতান হাসপাতাল থেকে বেরবার মুখে দেখা ঋতুশ্রী দত্তর সঙ্গে। বললেন, এই তো, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এখন কেমন বুঝছেন পেশেন্টকে?
—আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। এখন মানুষের বাঁচা-মরা সবই তো ঈশ্বরের হাতে।
ঋতুশ্রী দত্ত অবাক হয়ে বললেন, বিজ্ঞানের এত অগ্রগতির দিনে আপনি ডাক্তার হয়ে ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?
বিব্রত হয়ে বিতান বলল, দেখুন, হাসপাতালে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, একেবারে সিওর ডেথ থেকে ফিরে আসে পেশেন্ট। আমাদের অনেক সিনিয়রও বলেন ওরকম এক-একটা অলৌকিক ঘটনা কখনো ঘটে। তখন মনে হয় কেউ একজন অদৃশ্য থেকে প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন পেশেন্টকে।
ঋতুশ্রী দত্ত হাসলেন একটু।
বিতান বলল, আপনারা খুব ওরিড তা অনুমান করতে পারছি। কিন্তু আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই।
ঋতুশ্রী দত্ত কিছুটা গম্ভীর মুখে বিদায় নিলেন।
সেদিন নাইট ডিউটি বিতানের। সে লক্ষ করছে, রাতের দিকেই চব্বিশ নম্বর পেশেন্টের কষ্টটা বাড়ে। সে-রাতেও খুব ওঠানামা করছে রক্তচাপ। হাঁপাচ্ছেন খুব। বিতান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পেশেন্ট কখনো সাড়া দিচ্ছে, কখনো দিচ্ছে না। রাতের বেশিটাই বিতান কাটাল চব্বিশ নম্বর পেশেন্টের বেডের পাশে। একটা স্যালাইন শেষ হচ্ছে, নার্স নতুন স্যালাইন স্টার্ট করছে, তারমধ্যে পুশ করছে নতুন ইঞ্জেকশন।
ডিউটির শেষে বিতান হাসপাতাল ছেড়ে বেরচ্ছে, তার এক সহকর্মী ডাক্তার ঋতপ্রভ মুচকি হেসে বলল, কী ব্যাপার, বিতান? মনে হচ্ছে খুব চাপ নিচ্ছ চব্বিশ নম্বর পেশেন্টের জন্য!
বিতান বলল, নিচ্ছি, কিন্তু পেশেন্ট সারভাইভ করবে কি না বুঝতে পারছি না। ওঁর ছেলে-ছেলের বউ দু’জনেই দু’বেলা-তিনবেলা ফোন করছেন, আসছেন দেখতে।
ঋতপ্রভ ইঙ্গিতপূর্ণ হেসে বলল, হ্যাঁ, ছেলের বউ যা মারকাটারি সুন্দরী। তাঁকে খুশি করার জন্য জান লড়িয়ে দেওয়া যায়।
বিতান গম্ভীর হয়ে বলল, এটা রসিকতার বিষয় নয়।
বলে বেরিয়ে গেল হাসপাতাল থেকে।
কিন্তু ভিতরের টেনশন রয়েই গেল। গত তিনদিন ধরে এত চেষ্টার পরেও এখনও পর্যন্ত কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। তবে কি শেষ পর্যন্ত হার হবে তার?
দুপুরে ভালো করে খেতেও পারল না। তবে কি ঋতপ্রভর ইঙ্গিতই ঠিক! ঋতুশ্রী দত্তকে খুশি করতেই এত সিরিয়াসলি খাটছে! কিন্তু তা ঠিক নয়। প্রতিটি পেশেন্টকেই সাধ্যমতো চেষ্টা করে ভালো করে তুলতে। এই ডিভোশন তো তার প্রফেশনের অঙ্গ। বাধ্যতামূলক কাজ। এখন তো তার কেরিয়ার গড়ারও সময়। যত সিরিয়াস পেশেন্টকে জীবন দিতে পারবে, ততই প্রসারিত হবে সুনাম।
বিকেলের একটু আগে হেড নার্স অনুপমা সেন ফোন করল, স্যার, চব্বিশ নম্বর পেশেন্ট বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। এখন উঠে বসে বলছেন, এক কাপ চা হবে?
বিতান লাফিয়ে বলল, তাই নাকি! মির্যাকল!
—মির্যাকল নয়, স্যার। আপনি যেভাবে তিনদিন ধরে হাসপাতালে পড়ে আছেন। যমবাবুর সঙ্গে পাঞ্জা কষলেন বলা যায়।
হাসপাতালে গিয়ে দেখল, বিনীতা দত্ত বসে আছেন হেলান দিয়ে। চায়ের মধ্যে বিস্কুট ডুবিয়ে খাচ্ছেন আয়েস করে। দৃশ্যটা দেখে এক মুহূর্ত মনে হল এও আর এক মির্যাকল।
ঠিক বাহাত্তর ঘণ্টা লড়াই করার পর অবশেষে পেশেন্টের কন্ডিশন স্টেবল হতে বিতান বাঁচল হাঁপ ছেড়ে। পেশেন্টের সামনে যেতে ডাক্তারকে দেখে হাসলেন বিনীতা দত্ত।
ওয়ার্ডের রাউন্ড শেষ করে বাইরে বেরিয়ে অন্য ওয়ার্ডে ঢোকার মুখে হঠাৎ কানে গেল এক মধ্যবয়সি দম্পতির কথোপকথন। মহিলা বলছেন, আমি জানতাম এত সহজে তোমার মা মরবেন না। এখনও বেশ ক’বছর আমাকে জ্বালাবেন।
বিতান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ওঁরা বিনীতা দত্তের ছেলে আর ছেলের সুন্দরী বউ।