


অনিরুদ্ধ সরকার
১৯৩১ সাল। কবিগুরুর ৭০তম জন্মদিন। ‘রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উৎসব’ হবে কলকাতার টাউন হল প্রাঙ্গণে। প্রধান কর্মকর্তা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, নন্দলাল বসু, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়রা স্থির করলেন, ত্রিপুরার নবীন মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যকে আমন্ত্রণ জানানো হবে এই অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করার জন্য।
সেবছর ২৫ ডিসেম্বর রবীন্দ্র শিল্প প্রদর্শনী ও মেলার উদ্বোধন করলেন ত্রিপুরার মহারাজা। উদ্বোধনী বক্তৃতায় বললেন, ‘কবির সহিত ত্রিপুরা রাজপরিবারের যে চির প্রীতির সম্পর্ক বিদ্যমান আছে তাহাই আজ আমাকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করিতেছে। পূর্ণ গৌরবমণ্ডিত রবির ভাস্বর দীপ্তির ঐশ্বর্যের প্রতি আজ আমার লক্ষ্য নাই। আমি আপনাদের আহ্বানে আমার পিতামহ প্রপিতামহের স্নেহপরায়ণ বন্ধু আমাদের বিশ্বজয়ী অন্তরঙ্গের জয়ন্তী উৎসবে যোগদান করিতে পারিয়া নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করিতেছি।’ মহারাজকে শান্তিনিকেতনেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রবি ঠাকুর।
৭ জানুয়ারি, ১৯৩৯। শান্তিনিকেতনে এলেন মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য। বৃদ্ধ কবিগুরু স্বয়ং ‘উত্তরায়ণে’ উপস্থিত থেকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন তাঁকে। ‘আম্রকুঞ্জে’ সংবর্ধনার পর শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরিয়ে দেখালেন। বিশ্বভারতীর পাঠভবন, কলাভবন, বিদ্যাভবন, শ্রীনিকেতন এবং দেশ-বিদেশ থেকে কবিকে প্রদত্ত শ্রদ্ধার অর্ঘ দেখে মহারাজা বিশেষ আনন্দলাভ করেন। তাঁর সম্মানে বিশ্বভারতীর সিংহাসদনে মঞ্চস্থ করা হয় নৃত্যনাট্য ‘চণ্ডালিকা’। অনুষ্ঠান শেষে মহারাজের সঙ্গে বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনের সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেন কবিগুরু। রবি ঠাকুর বলেন, ‘সংগীত ভবনের জন্য একটি রঙ্গমঞ্চ তৈরির পরিকল্পনা করছি, কিন্তু অর্থের অভাবে তা হচ্ছে না।’ একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ২০ হাজার টাকা দান করেন মহারাজ।
সেই সফর শেষের কয়েকমাসের মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা। দেশজুড়ে একটা অস্থির পরিস্থিতি। ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হওয়ায় হাজার হাজার হিন্দু ভিটেমাটি ছেড়ে চলে এলেন আগরতলায়। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রাজমাতা অরুন্ধতী দেবী দেহরক্ষা করেন। মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য শোকে মুহ্যমান। তা সত্ত্বেও বিপন্নদের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করেননি। এত কিছুর মধ্যেও মহারাজ স্থির করলেন কবিগুরুর ৮০ তম জন্মজয়ন্তী পালন করবেন আগরতলার উজ্জয়ন্ত প্যালেসে। ভাবা যায়!
২৫ বৈশাখ। রবি ঠাকুরের জন্মদিন। পরিষদবর্গকে সঙ্গে নিয়ে মিছিল করে দরবারে এলেন মহারাজা। পণ্ডিতরা বেদমন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন। উচ্চস্বরে স্বস্তিবাচন পাঠ হতে থাকে। মহারাজার অনুমতি নিয়ে রাজকুমার ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মন অভিভাষণ পাঠ করেন, ‘রবীন্দ্রনাথের অশীতিতম জন্মদিনে আমাদের দেশের রাজা রাজকীয়ভাবে জয়ন্তী উৎসব দরবারের অনুষ্ঠান করিয়াছেন। আমি জানি রোগ-শয্যায় শায়িত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যখন এই সংবাদ পাইবেন তখন তিনি কতদূর শান্তিলাভ করিবেন!’ সেদিন কবিগুরুকে ‘ভারত-ভাস্কর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের পিতামহ রাধাকিশোর মাণিক্য ছিলেন রবি ঠাকুরের সমবয়সি, ঘনিষ্ঠ বন্ধুও। রাধাকিশোরের রাজত্বের ছ’মাস কাটতে না কাটতেই ১৮৯৭ সালের প্রবল ভূমিকম্পে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ফলে করুণ আর্থিক অবস্থার মুখোমুখি হয় ত্রিপুরা। এই সুযোগে রাজার পারিষদরা ষড়যন্ত্র শুরু করলে অসহায় রাধাকিশোর বন্ধু রবির দ্বারস্থ হন। বন্ধুর সমস্যা সমাধানের জন্য ত্রিপুরা যান কবিগুরু। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে একটি গোপন নোট পাঠান রাজার কাছে। তাতে সংক্ষেপে রাজকর্মচারীদের দুর্নীতির বিষয়টি লেখা ছিল। সব শুনে রাজা পরামর্শ চাইলেন বন্ধুর। কবিগুরু জানালেন, ‘যাহা মহারাজের স্বকীয় অর্থাৎ সংসার বিভাগ, নিজ তহবিল, পরিচরবর্গ এবং মহারাজের ভ্রমণাদি ব্যাপারগুলি যাহার অন্তর্গত তাহার উপর মন্ত্রী বা আর কাহারো হস্তক্ষেপ করিবার অধিকার দেওয়া চলবে না।’ এই পরামর্শের কথা জানাজানি হতেই রাজপারিষদরা রবীন্দ্রনাথের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। বিক্ষোভ শুরু হয় রাজ্যজুড়ে। রবি ঠাকুর বিষয়টি আগাম আন্দাজ করেছিলেন তাই রাজাকে বলেছিলেন, ‘মন্ত্রীর প্রতি রাজ্যভার অর্পণ করিয়া মহারাজা নিজের রাজক্ষমতার সঙ্কোচ করিতেছেন এ কথা যাহারা নানা কৌশলে ও নানা আভাসে মহারাজার মনে মুদ্রিত করিতেছে তাহারা স্বার্থান্বেষী ও মহারাজার শত্রুদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সাংঘাতিক। মঙ্গলের প্রতি লক্ষ্য করিয়া নিজের নিয়মের দ্বারা নিজকে সংযত করাই রাজোচিত। তাহাই রাজধর্ম।’ রবি ঠাকুরের পরামর্শ মেনে রাজা সেযাত্রা সামলে নিয়েছিলেন। সেই কাহিনি আজও ত্রিপুরায় লোকের মুখে মুখে ফেরে।
রয়েছে আরও একটি কাহিনি। সেটা ১৯০৫ সাল। বঙ্গভঙ্গের সময়কাল। ত্রিপুরার রাজকোষে বিরাট ঘাটতি। পারিষদেরা রাজাকে প্রস্তাব দিল, অবস্থা সামাল দিতে বেঙ্গল গভর্নমেন্টের মাধ্যমে কোনো বেসরকারি ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়া হোক। বেঙ্গল গভর্নমেন্ট রাজাকে ঋণ দিতে এককথায় রাজি, তবে একটাই শর্তে— রাজ্যশাসনের ভার তুলে দিতে হবে এক ইংরেজ রাজকর্মচারীর হাতে। ফের রবি ঠাকুরের শরণাপন্ন হলেন মহারাজ। কবিগুরু তখন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন। রাধাকিশোরের পত্র পেয়েই রবি ঠাকুর বুঝলেন, ত্রিপুরা রাজ্যটিকে ব্রিটিশরা কৌশলে দখল করতে চাইছে। এ এক গভীর ষড়যন্ত্র।
ত্রিপুরার ট্যাক্স আদায়ের দায়িত্ব ছিল ম্যাকমিন সাহেবের উপর। রাধাকিশোরের পারিষদরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে সেই সাহেবকে রাজ্যের মন্ত্রী করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। রাজাও সেকথা ভাবছিলেন কিন্তু রবি ঠাকুরের চিঠি পেয়ে তিনি চমকে উঠলেন। ইংরেজদের সঙ্গে সমঝোতা করতে নিষেধ করেছিলেন কবিগুরু। পরামর্শ দিয়েছিলেন, রাজা যেন সহজ শর্তে ‘ব্যাংক অব বেঙ্গল’ থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ নেন। ‘ব্যাংক অব বেঙ্গল’ ছিল এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন ব্যাংক, যা পরে ‘ভারতীয় স্টেট ব্যাংক’ নামে পরিচিত। বন্ধুর পরামর্শে ইংরেজদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন রাজা রাধাকিশোর। রক্ষা পেল ত্রিপুরার সার্বভৌমত্ব।
রবি ঠাকুরের জন্য মহারাজ রাধাকিশোরও ছিলেন দরিয়াদিল। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপনের সময় রাজকোষ থেকে সাধ্যমতো অনুদান দিয়েছেন। পরবর্তীতে প্রতি বছর পাঠাতেন এক হাজার টাকা করে। ব্রাহ্ম বিদ্যালয়ের শুরুতে রাধাকিশোর-পুত্র কুমার ব্রজেন্দ্রকিশোর ও কবি-পুত্র রথীন্দ্রনাথ ছিলেন নির্বাচিত শিক্ষার্থী। দুই পরিবারের মধ্যে হৃদ্যতা এতটাই ছিল যে, কলকাতা থেকে শিলাইদহ যাওয়ার সময় ব্রজেন্দ্রকিশোরকে সঙ্গে নিয়েছিলেন কবিগুরু।
ব্রজেন্দ্রকিশোর লিখেছেন, ‘একদিন কয়েকজন কর্মচারি মস্ত বড় এক থালায় অনেকগুলো টাকা এনে আমার সামনে ধরল। তখন সেই সম্মান প্রদর্শনের প্রত্যুত্তরে কী করা উচিত বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কবির দিকে তাকাতেই তিনি বলে উঠলেন, তোমাকে ভাবতে হবে না। পরে আমি সব ব্যবস্থা করবো। এখন এগুলি গ্রহণ করো।’ এরপর কলকাতায় ফিরে কবিগুরু একদিন ব্রজেন্দ্রকে নিয়ে গেলেন কলেজ স্ট্রিটে। সেই টাকা দিয়ে অনেক বই কিনে দিলেন। সেই থেকে যুবরাজের বইয়ের প্রতি বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজপরিবারের যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল রবি ঠাকুরের অনেক আগে, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমলে। ত্রিপুরার রাজা তখন কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য। রাজনৈতিক সংকটে পড়ে দ্বারকানাথের সাহায্য চেয়েছিলেন কৃষ্ণকিশোর। সাহায্য করেছিলেন দ্বারকানাথও।
রবি ঠাকুর কীভাবে জুড়েছিলেন ত্রিপুরা রাজপরিবারের সঙ্গে? সেটা ১৮৮৩ সাল। ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য প্রিয় মহিষী ভানুমতী দেবীর মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত। বৃন্দাবনে গিয়ে তাঁর পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করে সবে আগরতলায় ফিরেছেন। প্রিয়াবিরহে কাতর হয়ে মন দিয়েছেন কবিতা রচনায়। ঠিক এমনই সময় অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর হাতে এসে পড়ে তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতিকাব্য ‘ভগ্নহৃদয়’। মহারাজ বই পড়ে আপ্লুত। লাঘব হয় পত্নী বিরহ-যন্ত্রণা। তরুণ কবির সাথে আলাপ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন মহারাজ। সংবর্ধনাও দিতে চান। সেজন্য ব্যক্তিগত সচিব বৈষ্ণব সাহিত্যে সুপণ্ডিত রাধারমণ ঘোষকে পাঠালেন জোড়াসাঁকো। তরুণ রবি ঠাকুর তো অবাক! সেই ঐতিহাসিক সংবর্ধনার কথা রবি ঠাকুরের ‘জীবন স্মৃতি’ থেকে জেনে নেওয়া যাক। কবিগুরু লিখছেন, ‘এই লেখা বাহির হইবার কিছুকাল পরে কলিকাতায় ত্রিপুরার স্বর্গীয় মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্যের মন্ত্রী আমার সহিত দেখা করিতে আসেন। কাব্যটি মহারাজের ভালো লাগিয়াছে এবং কবির সাহিত্য সাধনার সফলতা সম্বন্ধে তিনি উচ্চ আশা পোষণ করেন, কেবল এই কথাটি জানাইবার জন্যই তিনি তাঁহার অমাত্যকে পাঠাইয়া দিয়েছিলেন।’
এই ঘটনার প্রায় তিন দশক পর কবির নোবেল পুরস্কার লাভ। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু তিনি নিজে লিখে গিয়েছেন ‘জীবনে যে যশ আমি পাচ্ছি, পৃথিবীর মধ্যে, মহারাজ বীরচন্দ্রই তার প্রথম সূচনা করে দিয়েছিলেন, তাঁর অভিনন্দনের দ্বারা। তিনি আমার অপরিণত আরম্ভের মধ্যে ভবিষ্যতের ছবি তাঁর বিচক্ষণ দৃষ্টির দ্বারা দেখতে পেয়েই তখনই আমাকে ‘কবি’ সম্বোধনে সম্মানিত করেছিলেন। যিনি উপরের শিখরে থাকেন, তিনি যেমন যা সহজে চোখে পড়ে না তাকেও দেখতে পান, বীরচন্দ্রও তেমনি সেদিন আমার মধ্যে অস্পষ্টকে দেখেছিলেন।’
ত্রিপুরার প্রেক্ষাপটে লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘রাজর্ষি’র জন্য ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করতে রাজা বীরচন্দ্রের শরণাপন্ন হয়েছিলেন রবি ঠাকুর। ‘রাজর্ষি’ অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ পরে লিখেছিলেন ‘বিসর্জন’ নাটক। স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য বীরচন্দ্র কার্শিয়াং যাত্রা করলে রবি ঠাকুর ছিলেন সফরসঙ্গী। সেখানে দু’জনের কাব্য চর্চা চলত দিনরাত। রবীন্দ্রনাথ শেষবার আগরতলায় এসে ‘পুষ্পবন্ত প্রাসাদে’ ছিলেন। সেটা বীরবিক্রম কিশোরের রাজত্বকাল। কবির শুভ আগমন উপলক্ষ্যে স্মৃতি-ফলক ঘরের দেওয়ালে এঁটে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন মহারাজ। তা থেকে জানা যায় ‘ফাগুনের নবীন আনন্দে’, ‘দোলে প্রেমের দোলনচাঁপা’ এই প্রাসাদে বসেই রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।