সংবাদদাতা, ঘাটাল: ৬ জুন এলেই দাসপুর থানার বাসিন্দা সহ সারা মহকুমাবাসী বিনম্র চিত্তে স্মরণ করেন ১৯৩০ সালের কথা। তাই অন্যান্য বছরের মতো এবছরও আজ দাসপুর থানার চেঁচুয়াতে শহিদদের স্মরণ করবেন মহকুমার মানুষজন।
সংবাদদাতা, ঘাটাল: ৬ জুন এলেই দাসপুর থানার বাসিন্দা সহ সারা মহকুমাবাসী বিনম্র চিত্তে স্মরণ করেন ১৯৩০ সালের কথা। তাই অন্যান্য বছরের মতো এবছরও আজ দাসপুর থানার চেঁচুয়াতে শহিদদের স্মরণ করবেন মহকুমার মানুষজন।
কেন এই শহিদ বেদি? এই শহিদ বেদির অন্তরালে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মৃত্যু মিছিলের বেদনাদায়ক ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। দাসপুরের সেই ইতিহাস থেকে জানা যায়, বিলিতি কাপড় ব্যবহার ও বিক্রি বন্ধের বিরোধিতা করতে গিয়ে ১৪ জন শহিদ হন। জখম হন ১৪৫ জন।
১৯৩০ সালের ৩ জুন, শনিবার ছিল চেঁচুয়ায় হাটের দিন। স্বদেশিরা বিলিতি কাপড় ব্যবহার ও বিক্রির বিরুদ্ধে প্রচার করছিলেন। সেই দুপুরে দাসপুর থানার বড়বাবু ভোলানাথ ঘোষ ও তার সহকারী অনিরুদ্ধ সামন্ত চারজন সিপাই নিয়ে হাটে পৌঁছে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। এর পরই মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ইচ্ছাকৃত ভাবে ভোলা দারোগার নাম ধরে ডাকেন ও একই বেঞ্চিতে তার পাশে বসলে অপমানিত দারোগাবাবু মৃগেন্দ্রকে প্রহার করেন। সাহসী মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যও ছেড়ে দেবার পাত্র ছিলেন না। দারোগাবাবুর হাতের বেতটি কেড়ে নিয়ে তা দিয়ে মারেন দারোগাকে। তা দেখে উত্তেজিত জনতা ভোলা দারোগাকে পিটিয়ে হত্যা করে, রাতে অর্ধদগ্ধ অবস্থায় ডোমনার পুকুর পাড়ে মাটি চাপা দিয়ে কলাগাছ লাগিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে লুকিয়ে থাকা অনিরুদ্ধ সামন্তকে চেঁচুয়ার নিবারণ মাজির কাপড়ের দোকান থেকে বের করে স্বদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হলে ওই দিন রাতে চকবোয়ালিয়ার চিত্ত মল্লিকের পুকুরের পাড়ে তাকে টুকরো টুকরো করে কেটে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বাকি চার সেপাই নন্দনপুরের জমিদার দেবেন্দ্র ঘোষের সাহায্যে মলিঘাটি হয়ে মেদিনীপুরে পৌঁছয়।
৩ জুনের ঘটনা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে গ্ৰামান্তরে। ৪ জুন দুপুরের পর বসল পুলিস ক্যাম্প, সঙ্গে চেঁচুয়া সহ আশেপাশের গ্ৰামে চলল অকথ্য অত্যাচার ও লুটপাট। মঙ্গলবার ৬ জুন জলপথে আরও পুলিস ও সেপাই আসার খবর মেয়েদের শঙ্খধ্বনির মধ্য দিয়ে আশেপাশের গ্ৰামে ছড়িয়ে পড়লে নারী পুরুষ নির্বিশেষে কাতারে কাতারে স্বাধীনতাকামী মানুষ হাটের উত্তরে পলাশপাই খালের পাড়ে জমা হতে থাকেন। পুলিসি অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। পুলিসের আদেশ অমান্য করে জনতা পলাশপাই খাল অতিক্রমে প্রস্তুত হলে পুলিসের গুলিতে চন্দ্রকান্ত মান্না (তেমোহানি), অশ্বিনী দোলই (চকবোয়ালিয়া), ভৃগুরাম পাল (মোহনচক), শশীভূষণ মাইতি (শয়লা), কালীপদ শাসমল (জালালপুর), দেবেন্দ্রনাথ নাড়া (জোৎভগবান), সতীশচন্দ্র মিথ্যা (রাধাকান্তপুর), রামচন্দ্র পাড়ই (জোৎশ্যাম), নিতাই পড়িয়া (পাঁচবেড়িয়া), অবিনাশ দিণ্ডা (বাঁশখাল), সত্য বেরা (বাঁশখাল), শশী দিণ্ডা (গোবিন্দনগর), পূর্ণচন্দ্র সিংহ (খাড়রাধান্তপুর) এবং মোহন মাইতি (খাড়রাধান্তপুর) এই ১৪ জন নিহত ও ১৪৫জন আহত হন।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় অনুযায়ী যাবজ্জীবন দীপান্তরের সাজা হয় কানন গোস্বামী, সুরেন দাস, যোগেন হাজরা, মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সহ ১৩ জনের এবং দু’ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয় পুষ্প চট্টোপাধ্যায় সহ পাঁচ জনের। পরবর্তী সময়ে ১৯৩১ সালের ৫ মার্চ গান্ধী-আরউইন চুক্তি অনুসারে এঁরা সকলেই মুক্তি পান। সেই থেকেই প্রত্যেক বছর ৬ জুন ওই জায়গায় শহিদ দিবস পালিত হয়ে আসছে।