মৃণালকান্তি দাস: যুগদর্শী রবীন্দ্রনাথ নিজেই দেখিয়ে দিয়েছিলেন, কেন একদিন তিনি ব্রাত্য হবেন আজকের বাংলাদেশে। বঙ্গ-তালিবানদের খাতায় চিহ্নিত হবেন পাক্কা বাংলাদেশ-বিরোধী হিসেবে!
মৃণালকান্তি দাস: যুগদর্শী রবীন্দ্রনাথ নিজেই দেখিয়ে দিয়েছিলেন, কেন একদিন তিনি ব্রাত্য হবেন আজকের বাংলাদেশে। বঙ্গ-তালিবানদের খাতায় চিহ্নিত হবেন পাক্কা বাংলাদেশ-বিরোধী হিসেবে!
সেই কবে, কবিগুরু লিখে গিয়েছিলেন, ‘অন্ধতা নেশনতন্ত্রেরই মূলগত ব্যাধি। মিথ্যা দ্বারাই হউক, ভ্রমের দ্বারাই হউক, নিজেদের কাছে নিজেকে বড় করিয়া প্রমাণ করিতেই হইবে এবং সেই উপলক্ষে অন্য নেশনকে ক্ষুদ্র করিতে হইবে, ইহা নেশনের ধর্ম, ইহা প্যাট্রিয়টিজমের প্রধান অবলম্বন।’ সেটাই এখন প্রমাণিত হচ্ছে বাংলাদেশে। গত আগস্টে তথাকথিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার পর, এক ধরনের ডিজিটাল মিথ্যার অন্ধত্ব বাংলাদেশের স্মার্টফোন-পুষ্ট যুব প্রজন্মকেও নিঃশব্দে গ্রাস করে চলেছে। শুধুমাত্র প্রতিবেশী ভারতকে হেয় করতে যুবসমাজের চেতনা থেকে মুছে দিতে চাইছে খোদ রবীন্দ্রনাথকে এবং তাঁর মূল্যবোধকে। তারই পরিণতিতে তছনছ হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কাছারিবাড়ি। গত ৮ জুন ঘটে যাওয়া হামলা ও ভাঙচুর নিছক কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের সমাজের সামগ্রিক অবক্ষয়ের এক প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ। গত এক বছরে এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশের যুবসমাজের একাংশ নিজেদের পাকিস্থানপন্থী হিসেবে জাহির করতে উদ্যত। এই বিকৃত মস্তিষ্কের আপদরাই আজ ১৯৬২ সালের মতো রবীন্দ্রনাথের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনতে চাইছে। কিন্তু এভাবে কি কবিগুরুকে মুছে ফেলা যায়?
মৃত্যুকালে দ্বারকানাথ ঠাকুর যেমন অগাধ বিষয়সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন, তেমনই রেখে গিয়েছিলেন প্রচুর ঋণ। সেই দেনা শোধ করতে দেবেন্দ্রনাথকে বিক্রি করে দিতে হয় বহু সম্পত্তি, এমনকী বাড়ির আসবাবপত্রও। তারপরও যা রয়ে যায়, তা সামান্য নয়— ওড়িশায় তিনটি এবং পূর্ববঙ্গে তিনটি জমিদারি। সম্পত্তি এজমালি, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক দেবেন্দ্রনাথ। এক সময়ে তিনি যখন আর নিজে জমিদারি দেখাশোনা করতে চাইলেন না, তখন সে-ভার দিলেন জ্যেষ্ঠ জামাতা সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়কে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বিয়ের দিন শিলাইদহে মৃত্যু হয় সারদাপ্রসাদের। এবারে দায়িত্ব পড়ে জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথের উপরে। তিনি দানধ্যান করে, খাজনা মকুব করে, লোকসান ঘটিয়ে আসেন এবং তাঁর পুত্র দীপেন্দ্রনাথকে দেন জমিদারি দেখতে। দীপেন্দ্রনাথও খুব গুছিয়ে কাজ করতে পারেননি। ১৮৯০ সালে দেবেন্দ্রনাথ স্থির করেন, জমিদারি দেখাশোনার ভারটা রবীন্দ্রনাথকেই দেবেন। আসলে সেই মুহূর্তে পরিবারের আর কাউকে এই দায়িত্ব দেওয়া যেত না। দ্বিজেন্দ্রনাথ আপনভোলা দার্শনিক। সত্যেন্দ্রনাথ আইসিএস, রাজকর্মে ব্যস্ত। হেমেন্দ্রনাথ মৃত। স্ত্রীবিয়োগের পর থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ একরকম সংসারবিরাগী। বীরেন্দ্রনাথ ও সোমেন্দ্রনাথ অসুস্থ। সুতরাং একমাত্র রবীন্দ্রনাথই আছেন সামনে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের বয়স ত্রিশ হতে চলল, সাহিত্যচর্চা ছাড়া আর কিছুই করেন না। তাঁকেও একটা কাজে লাগাতে হয়!
পিতার আদেশে রবীন্দ্রনাথ অবাকই হয়েছিলেন। ‘আমি কবিমানুষ, পদ্যটদ্য লিখি, আমি এসবের কি বুঝি? কিন্তু বাবা বললেন, ‘তা হবে না; তোমাকে এ কাজ করতে হবে। কি করি? বাবার হুকুম, কাজেই বেরতে হল।’ কলকাতায় সেরেস্তায় বসে জমিদারির কাজ শিখতে হল তাঁকে। নিম্নতম কেরানির কাজ থেকে নায়েবের কাজ। সবই। তারপর পাড়ি দিতে হল পূর্ববঙ্গে। সেখানে তাঁদের তিনটি পরগনা: নদীয়া জেলায় বিরাহিমপুর, তার কাছারি শিলাইদহে। রাজশাহি জেলায় কালিগ্রাম, তার কাছারি পতিসরে। আর পাবনা জেলায় শাহজাদপুর, তার কাছারি শাহজাদপুর গ্রামেই। কনিষ্ঠ পুত্রকে জমিদারির কাজে বাঁধার চেষ্টা করেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। কিন্তু সফল হননি। রবীন্দ্রনাথ সুযোগ পেলেই পালিয়ে এসেছেন কলকাতায়। তবে পূর্ববঙ্গের নিসর্গ যে তাঁকে মুগ্ধ করেছিল, তা নিঃসন্দেহ। তিরিশ বছর বয়সে জমিদারি দেখতে এসে দশটি বছর পূর্ববঙ্গে কাটিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শাহজাদপুর ও শিলাইদহে ছিল তাঁর নিয়মিত যাতায়াত। রবীন্দ্রনাথ এখানকার প্রকৃতি ও মানুষের বিচিত্র জীবন প্রবাহের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত। এই সময়কালে তিনি লিখেছেন অসাধারণ সব ছোটগল্প। রচিত হয়েছে ‘পোস্টমাস্টার’, ‘ছুটি’, ‘দেনাপাওনা’-র মতো কালজয়ী গল্প। জমিদারির তদারক করতে এসে এই বাংলার মানুষ, প্রকৃতি ও জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যকে নতুন আঙ্গিকে অনুভব করেছিলেন, ‘ছিন্নপত্রে’র পত্রাবলি লিখেছেন। গোটা দুনিয়াকে এই ‘ছিন্নপত্র’-ই চিনিয়েছে বাংলাদেশের মাটি-মানুষকে।
রবীন্দ্রনাথ তখন শাহজাদপুরের জলপথে। ১৮৯১-র ২০ জুন, এক চন্দ্রালোকিত রাত। যখন সব নৌকা ডাঙায় বাঁধা ছিল, হাওয়ার অভাব বোধ করায় একটি নিচু পাড় দেখে এক হাঁটু জলের মাঝে নৌকা বাঁধতে বললেন কবি। কিন্তু মুহূর্তেই উঠল ঝড়, আর রবীন্দ্রনাথের ‘বোটটা যেন একটি শিকলি-বাঁধা পাখির মতো পাখা ঝাপটে ঝট্পট্ ঝট্পট্ করছিল। ঝড়টা থেকে থেকে চীহি চীহি শব্দ করে একটা বিপর্যয় চিলের মতো হঠাৎ এসে পড়ে বোটের ঝুঁটি ধরে ছোঁ মেরে ছিঁড়ে নিয়ে যেতে চায়, বোটটা অমনি সশব্দে ধড়ফড় করে ওঠে।’ রবীন্দ্রনাথের মনে হল, ‘জীবনটা একটা গম্ভীর বিদ্রুপ, এর মজাটা বোঝা একটু শক্ত— কারণ, যাকে নিয়ে মজা করা হয়, মজার রসটা সে তেমন গ্রহণ করতে পারে না।’ বেশিরভাগ মানুষই যখন বুক চাপড়াতে থাকে, তখন প্রকৃতির রুদ্র
রূপ থেকেও রস খুঁজে নেওয়ার মৌন এক আহ্বান জানায় ‘ছিন্নপত্র’।
১৮৮৬-র ২৪ জুন, বন্দোরা সমুদ্রতীরে যখন সমুদ্র দেখছিলেন, তাকে খাঁচার উন্মত্ত বাঘ মনে হচ্ছিল। কবি লিখলেন, ‘পৃথিবীর সৃষ্টির আরম্ভ থেকে এই ডাঙায় জলে লড়াই চলছে— ডাঙা ধীরে ধীরে নীরবে এক-এক পা ক’রে আপনার অধিকার বিস্তার করছে, আপনার সন্তানদের ক্রমেই কোল বাড়িয়ে দিচ্ছে— আর পরাজিত সমুদ্র পিছু হটে হটে কেবল ফুঁসে ফুঁসে বক্ষে করাঘাত করে মরছে।’ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একটা চিরন্তন বিরোধ সম্পর্ক যেন আঁকা হয়েছিল এখানে। আসলে গোটা ছিন্নপত্র জুড়েই প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অমোঘ প্রেম চিত্রায়িত হয়েছে স্বর্গ থেকে নেমে আসা ভাষা, ভাব ও আবেগের এক ঘূর্ণিজলে। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য প্রমথনাথ বিশী উচ্ছ্বসিত ছিলেন ‘ছিন্নপত্র’ নিয়ে। তাঁর মতে, ছিন্নপত্রের নায়িকা হচ্ছে বাংলাদেশের উপর বয়ে যাওয়া পদ্মা নদী, আর নায়ক স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। প্রকৃতির নিঃশব্দ ক্রীড়ার মাঝে রবীন্দ্রনাথ সব কিছু খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে শাহজাদপুরের কথা। কাছারিবাড়ির গল্প। বাংলাদেশের আপামর মানুষের কথা।
আজ সেই স্মৃতিবিজড়িত শাহজাদপুর কাছারিবাড়িতে ঘটে যাওয়া হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা বাঙালির মাথা নত করে দিয়েছে। কত সহজে বলা হচ্ছে, একজন দর্শনার্থীকে আটকে রেখে মারধরের অভিযোগে যে উত্তেজনার শুরু, তা বিস্ফোরিত হয়েছে ঐতিহাসিক এই ভবনের দরজা-জানালায়, মিলনায়তনের কাঠামোয় এবং রবীন্দ্র-স্মৃতির নিঃশব্দ গর্ভগৃহে। যখন একের পর এক মব দেখেছে গোটা বাংলাদেশ, তখন ঘটনাটি অপরিকল্পিত— এমনটা মেনে নেওয়া কঠিন। গত একটা বছরে সমাজের মধ্যে যে ‘অবক্ষয়’ বাসা বেধেছে এবং তাতে একটা মবের জন্ম দেওয়া খুবই সহজ। একের পর এক মবকে প্ররোচনা দিয়ে যাওয়ার পরিণতিই এই লজ্জাজনক ঘটনা। সম্প্রতি ইউনুস সরকারের তরফে বহুবার বলা হয়েছে, মব কালচার বরদাস্ত করা হবে না। কিন্তু কাছারিবাড়ি ভাঙচুর প্রমাণ করে, বাংলাদেশের প্রশাসন আড়ালে ‘পাকিস্তানপন্থী’, ‘সাম্প্রদায়িক’ মবকেই তোষণ করে। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিতর্কের জন্ম, তার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অবমূল্যায়ন এবং তাঁর প্রতি প্রকাশ্য শত্রুতা এক ভয়াবহ প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
কে না জানে, পাকিস্তান শাসনামলে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। এর পরিকল্পনা হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই। ১৯৫৯ সালের গোড়ার দিকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের উদ্যোগে করাচিতে এক লেখক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আইয়ুব খান ঘোষণা করেন, পাকিস্তানি ভাবাদর্শের প্রতি লেখকদের আনুগত্য থাকতে হবে। পাকিস্তানের ভিতর অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালিত্ব, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদিকে তিনি পঞ্চমবাহিনীর ঘটনা বলে প্রকাশ করেন। একে কঠোর হাতে দমন করার নীতি ঘোষণা করেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ নয়।’ পাকিস্তানের নেতাদের সমর্থন জানায় সাম্প্রদায়িক দক্ষিণপন্থী এবং বাঙালি-বিদ্বেষী ও ক্রিমিনাল অবাঙালিরা। রবীন্দ্রবিরোধীদের অধিকাংশই পাকিস্তানের সেবা করে গিয়েছেন। কেউই প্রগতিশীল ধারার সঙ্গে থাকেননি। গণমানুষের আন্দোলন, সংগ্রামে কারও অংশগ্রহণই কোনওকালে ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, পাকপন্থার সেবা করার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র থেকে লুটপাটের ফায়দা লোটা।
বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য যেমন আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে, তেমনই রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করার জন্য, রবীন্দ্রনাথের গান গাইবার জন্যও আন্দোলন করতে হয়েছে। তখন রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারণ করাটা ছিল রাজনৈতিক অপরাধ। তবুও বাঙালির প্রবল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মুখে সেই নিষেধাজ্ঞা টেকেনি। কারণ বাঙালি বুঝতে পেরেছিল ‘রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বাঙালির আত্মপরিচয় অসম্ভব।’ আজ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার করে আসা সেই বাংলাদেশেই রবীন্দ্রনাথ আক্রান্ত! রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে ঘটে চলেছে নানা ধরনের বিতর্ক ও আক্রমণ— যার প্রতিটি যেন বাঙালির সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের একেকটি স্তর উন্মোচন করছে। আসলে এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এক সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক উচ্ছেদ প্রকল্প।
বাংলাদেশের একটি নদীর উপর একটি নৌকোয় চড়ে বসুন আর ক্ষণিক ছিন্নপত্র ও ক্ষণিক চারপাশের জীবন ও প্রকৃতির মাঝে ডুবে থাকুন। আস্তে আস্তে একটি ছবি ভেসে উঠবে আপনার অক্ষিপটে। অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করবেন, গোটা বাংলাদেশটাই রাবীন্দ্রিক। মানুন, না মানুন— নৈরাজ্যের বাংলাদেশে সেই রবীন্দ্রনাথই আবার মুক্তির পথ দেখাবে। বারবার।
মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন আর রবীন্দ্রনাথ— বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এই পালকগুলির কোনও একটিকে বিচ্ছিন্ন করলে, খসে যাবে অন্য পালকগুলিও। চোখের সামনে পড়ে থাকবে কঙ্কালসার এক বাংলাদেশ। এটা বাঙালির থেকে ভালো আর কে জানে!