রাজু চক্রবর্তী, কলকাতা: রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে বিজেপি পার্টির স্বার্থের সংঘাত চরমে উঠেছে। কারণ, থানা-পুলিশ মহলে গেরুয়া পার্টির সাংগঠনিক রাশ ক্রমেই আলগা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পদ্ম প্রতীকে জয়ী বিধায়ক, এমনকি পরাজিত প্রার্থীদের দাপট। বঙ্গ বিজেপি এই মুহূর্তে ৪৩টি সাংগঠনিক জেলায় বিভক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জেলা সভাপতি কিংবা দলীয় সংগঠনের পদাধিকারীদের কথা কানেই তুলছেন না স্থানীয় থানার ওসি-আইসিরা। পার্টির নেতারা পুলিশ সংক্রান্ত বিষয়ে পুরোপুরি বিধায়কদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। যা নিয়ে গেরুয়া সংগঠনের অন্দরে চরম ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। সম্প্রতি আরএসএস’র শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় মজদুর সংঘের (বিএমএস) রাজ্য সাধারণ সম্পাদক দেবাশিষ ভট্টাচার্য কোলাঘাটে দুষ্কৃতী হামলার মুখে পড়েন। যা নিয়ে স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে লিখিত বিবৃতিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তোপ দেগেছে সংঘ। এবার গোটা বাংলাজুড়ে বিজেপির সংগঠনিক নেতৃত্বের ক্ষোভের মুখে রাজ্য প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে রাজ্য কমিটির এক নেতা বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর এক সিদ্ধান্ত সংগঠনকে দূর্বল করছে। পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বিধায়কদের কথা শুনে চলতে। ফলে পার্টির বিভিন্ন স্তরের সাংগঠনিক নেতাদের ‘ডোন্ট কেয়ার’ করছে থানার বড়-মেজো-ছোটবাবুরা। বিষয়টি নিয়ে পার্টির সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব বাড়ছে। আগামীতে তার কুফল ভোগ করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা ওই বিজেপি নেতার।
বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন রাজ্য প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তা। তাঁর কথায়, বামফ্রন্ট আমলে পার্টির জেলা সম্পাদকদের কথা শুনে চলত পুলিশ। তৃণমূল আমলে তা আমূল বদলে মুকুল রায়, সুব্রত বক্সি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা ডিজি-সিপি-ডিসি-ওসি নিয়ন্ত্রণ করতেন। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর শাসকদলের এমএলএ’দের কথাই শুনে চলছে পুলিশ। যেখানে বিজেপির বিধায়ক নেই, সেখানে সংশ্লিষ্ট বিধানসভার পরাজিত গেরুয়া প্রার্থীদের দেখানো পথেই হাঁটছে স্থানীয় থানার বাহিনী প্রধান। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই পার্টির ভিতরে চর্চা শুরু হয়েছে। জেলা সভাপতি কিংবা জেলা সাধারণ সম্পাদকদের তরফে পার্টির শীর্ষ স্তরে ‘পুলিশি অসহযোগিতার’ অভিযোগ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণবঙ্গের এক জেলা সভাপতির কথায়, তৃণমূলের এক দুষ্কৃীতি সম্প্রতি আমাদের এক মণ্ডল সভাপতির স্ত্রীর সঙ্গে অভব্য আচরণ করেছিল। থানায় লিখিত অভিযোগ করার পরেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারপর আমি নিজে ফোন করে থানার বড়বাবুকে আইনত ব্যবস্থা নিতে বলি। প্রত্যত্তরে ওই অফিসার জানান, একবার বিধায়ককে বলুন আমাকে বলতে। উত্তরবঙ্গের এক জেলা সম্পাদকের অভিযোগ, আমরা কয়েক দশক ধরে পার্টি করছি। বিধায়ক নব্য বিজেপি হিসেবে পরিচিত। এলাকায় দলের কর্মসূচি করতে থানায় অনুমতি নিতে গেলে পালটা প্রশ্ন শুনতে হল, বিধায়ক জানেন তো?
এ ধরনের ভুরি ভুরি নজির তৈরি হয়েছে শেষ তিনমাসে। রাজ্য কমিটির এক সদস্যের দাবি, এলাকায় পার্টির সংগঠন চালায় স্থানীয় নেতা-নেত্রীরা। দলীয় কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ যেকোনও সমস্যায় হাতের সামনে পাওয়া এই সব নেতাদের কাছে যান। বহু ক্ষেত্রেই বিভিন্ন প্রয়োজনে থানা-পুলিশের সহায়তা লাগে। এক্ষেত্রে থানা-পুলিশ ইস্যুতে সেই নেতা-নেত্রীদের কার্যত ‘ঠুটো জগন্নাথ’ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার জেরে এলাকার মানুষ থেকে পার্টির নীচুতলার আস্থা হারাচ্ছেন ওই সব বিজেপি নেতা-নেত্রীরা। ফলস্বরূপ দলের সংগঠন ক্রমেই দূর্বল হতে শুরু করেছে। অবিলম্বে পুলিশ পরিচালনার ক্ষেত্রে এই একক বিধায়কমুখী কৌশল না বদলালে, পার্টির মূল ভিত নড়ে যাবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ওই গেরুয়া নেতা।