Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

যুদ্ধ যিনি শুরু করেছেন তাঁকেই থামাতে হবে

যুদ্ধ যিনি শুরু করেছেন তাঁকেই থামাতে হবে
  • ১৬ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল মিলে অবিবেচকের মতো যে যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করেছে তার পরিণতি বিশ্বব্যাপী এবং সুদূরপ্রসারী।

Advertisement

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র দু-সপ্তাহের মধ্যেই ইরান বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে, তবে পরাজিত হয়নি। যুদ্ধের প্রথম দিনেই আয়াতুল্লাহ খামেনেই-সহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছেন। ইরান তড়িঘড়ি তাদের একজন নতুন নেতা নির্বাচন করেছে এবং নতুন সামরিক নেতৃত্বও গঠন করেছে। পালটা যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল অক্ষ ঘোষণা দিয়েছে যে, সেই নতুন নেতৃত্বকেও তারা নির্মূল করে ছাড়বে। তেহরান, সানান্দাজ, ইসফাহান এবং ইরানের অন্যান্য প্রধান শহরে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১৩০০ ইরানি নিহত এবং দশ সহস্রাধিক মানুষ জখম হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিক্ষিপ্ত একটি ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র একটি স্কুলে আঘাত হানে। তার ফলে ১৬৮ জন শিশু এবং ১৪ জন শিক্ষক নিহত হন। কী অপরাধ করেছিলেন তারা? 
বিপুল ক্ষয়ক্ষতি
ইরানে যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—
 সামরিক লক্ষ্যবস্তুসমূহ, যেমন—ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, সশস্ত্র বাহিনীর ঘাঁটি, নৌ-সম্পদ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং উৎপাদন কেন্দ্রসমূহ।
 ঘরবাড়ি, স্কুল ও হাসপাতাল।
 প্রধান তেলের ডিপোগুলি (সেগুলি এখনো জ্বলছে)।
 জল সরবরাহ ব্যবস্থা, লবণাক্ততা দূরীকরণ কেন্দ্র প্রভৃতি অপরিহার্য পরিকাঠামো।
 জনস্বাস্থ্যের জন্য বড়ো ধরনের ঝুঁকি সামনে এসেছে। 
 এছাড়া ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে পরিবেশের।
ইরানের শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি নিঃসন্দেহে দমনমূলক। বিষয়টিকে আপাতত একপাশে সরিয়ে রেখে বরং দেশটির সাধারণ মানুষের বিপদের দিকটিতেই নজর দেওয়া দরকার। এমন ভয়াবহ ধ্বংসলীলার শিকার হওয়ার মতো কী অপরাধ তারা করেছে? ইজরায়েলের প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছিল যে, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ করেছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে। ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা করে ওমানের বিদেশমন্ত্রী দ্রুত ওয়াশিংটনে ছুটে যান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, ইরান ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে’ সম্মত হয়েছে এবং ‘কখনো, কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র না-রাখার’ শপথ নিয়েছে তারা। সেই আশ্বাসকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আকস্মিকভাবে আলোচনা বন্ধ করে দেন এবং ইরানের উপর হামলার নির্দেশ দেন।
ইরান হয়তো ইজরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতির জন্য একটি হুমকি হতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা কোনোরকম হুমকিই নয়। ২০২৫ সালের জুন মাসে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ পরিচালনার পর যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল যে, “ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।” বলা বাহুল্য যে, পূর্বোক্ত অভিযানটি ছিল একটি অবৈধ আক্রমণ। ‘মিডনাইট হ্যামার’ 
সত্ত্বেও, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রস্তুতি সেরে ফেলেই থাকে, তবে সেই অস্ত্রগুলি এখন কোথায়? যুক্তরাষ্ট্র কি পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ)—ইরান পরিদর্শন করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্ট দিতে বলেছিল? কোন দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে আর কোন দেশের কাছে থাকবে না, তা নির্ধারণ করার কোন এক্তিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে? যুক্তরাষ্ট্র কি ভারত, পাকিস্তান কিংবা উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করে তা ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে?
নীরব সমর্থন
পশ্চিম এশীয় অঞ্চলে ইজরায়েলের শত্রু রয়েছে। এর মূলে রয়েছে সেই ইতিহাস, যখন ফিলিস্তিনিদের দখলে থাকা ভূমিতে ইজরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, বিগত বছরগুলিতে ইসলামিক দেশগুলিসহ সমগ্র বিশ্ব ইজরায়েলের অস্তিত্বকে একটি বাস্তবতা হিসাবে মেনে নিয়েছে। ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিন বিভাজন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ভারত ভোট দিয়েও পরবর্তীকালে, ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বরে স্বীকৃতি দিয়েছিল নবগঠিত ইজরায়েল রাষ্ট্রকে। ১৯৯২ সালে উভয় দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়। বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হয়েছে। পশ্চিম এশীয় সংঘাতের বিষয়ে ভারত বরাবরই একটি সংযত ও নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছিল—অন্তত এখন পর্যন্ত। তবে ইদানীং ভারত একটি পক্ষ অবলম্বনের অবস্থানে চলে গিয়েছে। তার প্রমাণ, গত ১২ মার্চ রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত এক প্রস্তাবে ভারতের সমর্থন। ওই প্রস্তাবে কেবল ইরানকেই একতরফাভাবে নিন্দা করা হয়েছিল। যখন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ‘‘উগ্র শিয়া জোট এবং উদীয়মান উগ্র সুন্নি জোট’’-এর মোকাবিলায় ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং বিভিন্ন আরব, আফ্রিকান ও ভূমধ্যসাগরীয় দেশকে নিয়ে গঠিত একটি ‘ষড়ভুজ’ জোটের কথা বললেন, তখন তার প্রতিবাদে ভারত টুঁ শব্দটিও করেনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য বা ‘গোলপোস্ট’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার প্রাথমিক লক্ষ্য থেকে সরে এসে তিনি এখন ইরানের সামরিক শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা, সরকার পরিবর্তন এবং সবশেষে ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মতো লক্ষ্যগুলি নির্ধারণ করেছেন। আর তাই, প্রত্যাশামতোই তিনি ইরানের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ‘‘তোমাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নাও। তোমাদের জন্য এটি একটি মওকা।”—এই বুলিটি একেবারেই ব্যর্থ প্রমাণিত হল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠকারিতার সুবাদে, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি গণঅসন্তোষ ক্রবর্ধমান। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন 
হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ট্যাঙ্কারগুলির চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রান্নার গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে ভারতে। এমনকি সেগুলির দামও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মারাত্মক। বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারগুলোতে ধস নেমেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই যুদ্ধের পিছনে প্রতিদিন ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে। তবে এই যুদ্ধের মানবিক মূল্য (হিউম্যান কস্ট) যে কতখানি, তা পরিমাপ করা অসম্ভব।
সবার আসল রূপ উন্মোচন করে যুদ্ধ
বিখ্যাত সেনানায়ক জেনারেল ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার বলেছিলেন, ‘‘যুদ্ধ হল নিষ্ঠুর, অর্থহীন এবং বোকামি।’’ চারবছর আগে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়েছিল রাশিয়া। কিন্তু সেই যুদ্ধে এখনো জয়লাভ করতে পারেনি তারা। এদিকে, রাশিয়ার ঋণের বোঝা আকাশচুম্বী হয়েছে আর তেল থেকে তাদের আয় কমে গিয়েছে। রুশ সেনাবাহিনীকে এখন নির্ভর করতে হচ্ছে ভাড়াটে সৈনিকদের উপর। ইরানের ক্ষেত্রে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। যেহেতু এই যুদ্ধ মূলত যন্ত্রপাতির (অস্ত্রশস্ত্রের) মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, তাই সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির সরবরাহ অব্যাহত থাকা পর্যন্তই যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ জারি রাখতে পারবে।
একটি যুদ্ধ শুরু করার আগে কোনো দেশের অবশ্যই জানা উচিত, সেই যুদ্ধ কখন থামাতে হয়। যুদ্ধ প্রতিটি দেশ এবং প্রতিটি মানুষের আসল রূপ উন্মোচন করে দেয়। রাশিয়া যখন ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায়, তখন ভারত সরাসরি তার নিন্দা না করেও বলেছিল যে, ‘‘এটি যুদ্ধের যুগ নয়।’’ অথচ, যুক্তরাষ্ট্র যখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করল, তখন এমন কোনো নীতিবাক্য শোনা গেল না। পশ্চিম এশিয়ায় বর্তমানে যে যুদ্ধ চলছে, সেখানেও এমন নীতিবাক্যের অনুপস্থিতি লক্ষণীয়।
যুক্তরাষ্ট্র/ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার এই যুদ্ধের নেপথ্যে জাতিগত এবং ধর্মীয় কিছু প্রচ্ছন্ন প্রভাব বা স্রোত কাজ করছে। ইজরায়েল যে একটি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেই সমস্ত মূল নীতিকেই অস্বীকার করছে, যেগুলির ভিত্তিতে দেশটির জন্ম। যাদের কাছে ‘জোর যার, মুলুক তার’ই একমাত্র সত্য—হায়, ভারত নিজস্ব কিছু স্বার্থান্বেষী পদক্ষেপের সৌজন্যে আজ তাদেরই সামনে এক ভীরু ভিক্ষুকের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে দেশকে!
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

সম্পর্কিত সংবাদ