অবচেতন মন আসলে কী?
অবচেতন মন আসলে কী?
মনের দু’টি অংশ— সচেতন এবং অবচেতন। আমরা রোজ সচেতনভাবে বহু কাজ করি। যেমন বাজারে গিয়ে পরখ করে সবজি কিনি। মাছ টিপে দেখি টাটকা কি না। অফিসের নানা হিসাব সামলাই। আবার বিভিন্ন কাজ করি অভ্যাসে। যেমন হাঁটার সময় পা ফেলি। জুতোর ফিতে বাঁধি। কম্পিউটারের কি- বোর্ডে আঙুল চালাই। এই অভ্যেসগত কাজ আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করি অবচেতন মনের সাহায্যে। আবার ভয় পাওয়া ও আনন্দ প্রকাশ, রাগের বহিঃপ্রকাশ, পছন্দ বা অপছন্দ জাহির করা—এমন আচরণগুলিও অবচেতন মনই নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকী আমরা সচেতনভাবে যে কাজগুলি করি, সেগুলিকেও অবচেতন মন প্রভাবিত করে। যেমন, ছোট বয়সে কারও সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার কারণে বড় হওয়ার পরেও তাঁর উপস্থিতিতে বিরক্তি বোধ করা ইত্যাদি। অবচেতন মনের গঠন স্থির করে মস্তিষ্কে চালিত হওয়া কোটি কোটি তথ্য, দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি, অভ্যেস এবং সহজাত প্রতিক্রিয়া।
স্বপ্ন কি অবচেতন মনের সুপ্ত বার্তা বহন করে?
স্বপ্নকে অবচেতন মনের ভাষা বা সুপ্ত বার্তা হিসেবে দেখার ধারণাটি সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সাইকোঅ্যানালিসিস থেকে এসেছে। তিনি মনে করতেন, স্বপ্ন হল অবচেতন মনের ইচ্ছা এবং দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। তবে আধুনিক মনোবিজ্ঞানে স্বপ্ন হল অনেকটা দিনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। যেখানে সারাদিনের স্ট্রেস বা টেনশন ফুটে ওঠে। যেমন—আমার খুব অ্যাংজাইটি হলে স্বপ্ন দেখি, উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যাচ্ছি! তাই স্বপ্ন আমাদের ভয় বা উদ্বেগের প্রতিফলন হতে পারে।
শৈশবের স্মৃতি বর্তমানকে প্রভাবিত করে?
অবচেতন মনে জমা থাকা শৈশবের অভিজ্ঞতা জীবনের চলার পথের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করে দেয়। যদি কেউ সর্বক্ষণ কঠোর পরিবেশে, অত্যধিক শাসন, ঝগড়া-অশান্তির মধ্যে বেড়ে ওঠেন বা অবহেলার শিকার হন, তবে বড় হয়ে তার মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস প্রাধান্য পায়। আবার কেউ যদি স্নেহময় বা নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, অন্যদের সহজে গ্রহণ করতে শেখেন।
‘অটোপাইলট মোড’ কী?
আমাদের মস্তিষ্কের একটি বড় অংশ অটোপাইলট মোডে কাজ করে। গাড়ি চালানোর সময় আমরা একদিকে যেমন রাস্তা স্ক্যান করি, অন্যদিকে অন্য চিন্তা করি, এই বিষয়টিই অটোপাইলট বা অবচেতন মনের কাজ। আমরা রোজ হাজার হাজার ছোট ছোট সিদ্ধান্ত সচেতনভাবে নিই না। অবচেতন মনের এই অটোপাইলট মোড দক্ষ করে তোলে। যেমন—ব্রাশ করা, দোকানে ঢুকে একই ফ্লেভারের চা-কফি খাওয়া, ভিড় কাটিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটা এমন নানা সিদ্ধান্ত অবচেতন মন দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়।
আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়?
ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বা ইনটিউশন কিংবা অন্তর্দৃষ্টি অনেকটাই অবচেতন মনের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো পেইন্টিং দেখে কেন ভালো লাগল বা একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক কেন চট করে কারও অসুখ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন, সবকিছুর পিছনেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তথ্য বা আবেগ বিশ্লেষণ করার কাজটি করে অবচেতন মন।
সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে অবচেতন মনকে প্রভাবিত করা সম্ভব?
অবচেতন মন অনেকটা আর্কিওলজির মতো। মাটির নীচ থেকে পুরনো বাসনকোসন, ধ্বংসস্তূপ, অলঙ্কার বের করে একটা সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে! এই কাজটি মনোবিদের।
অবচেতন মন কি সচেতন মনের দখল নিতে পারে?
সাধারণত তারা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তবে তীব্র আবেগ, খুব বেশি রাগ বা ক্ষোভের সময় অবচেতন মন অনেকসময় সচেতন মনে প্রভাব বিস্তার করে ফেলে। তখন আমরা বলে উঠি, ‘জানতাম বিষয়টা ঠিক হচ্ছে না, তবুও নিজেকে আটকাতে পারছিলাম না। চিত্কার করেই ফেললাম!’
কীভাবে অবচেতন সম্পর্কে আরও সচেতন হবেন?
নিজেকে খেয়াল করতে হবে। নিজে কী কাজ করছি তার প্রতি মন দিতে হবে। পাশাপাশি আত্ম-বিশ্লেষণের অভ্যাস তৈরি করা দরকার। লক্ষ্য করতে হবে নিজের মধ্যে কেমন আবেগ তৈরি হচ্ছে এবং সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ কীভাবে হচ্ছে। নিয়মিত সারাদিনের নানা ঘটনায় নিজের প্রতিক্রিয়াগুলিকে পর্যবেক্ষণ করলে অবচেতন মনের কাজগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সাক্ষাত্কার: সুপ্রিয় নায়েক