Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মোদি-ট্রাম্প দোস্তি একদম ভেঙে পড়েছে

২০২৪ সালের অক্টোবরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রার্থী হিসেবে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘প্রাইম মিনিস্টার মোদি ইজ দ্য নাইসেস্ট হিউম্যান বিয়িং অ্যান্ড আ টোটাল কিলার!’

মোদি-ট্রাম্প দোস্তি একদম ভেঙে পড়েছে
  • ২ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ২০২৪ সালের অক্টোবরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রার্থী হিসেবে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘প্রাইম মিনিস্টার মোদি ইজ দ্য নাইসেস্ট হিউম্যান বিয়িং অ্যান্ড আ টোটাল কিলার!’ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট, তখন সফরের সময় মোদিজি বলেছিলেন, ‘একটি উন্নত ভারতের জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হল মেক ইন্ডিয়া গ্রেট আগেইন (এমআইজিএ বা মিগা)। যখন আমেরিকা এবং ভারত একসঙ্গে কাজ করে, তখন ম্যাগা প্লাস মিগা থেকে মেগা হয়—সমৃদ্ধির জন্য একটি মেগা অংশীদারিত্বে পরিণত হয়।’ স্কুলপড়ুয়া ছেলেদের মতোই অনবদ্য এক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন দুই নেতা।

Advertisement

দোস্তি এবং বন্ধুত্বের উষ্ণতা কোথায়?
বিচ্ছিরি ধাক্কা
আমি জানি যে নরেন্দ্র মোদি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৭ মে থেকে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেননি। আমরা সবচেয়ে বেশি যা জানি তা হল, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স এবং মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও ৯ মে রাতে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলেন এবং যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য অনুরোধও করেন তাঁকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে এই ধরনের কথোপকথনের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন যে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাতভর দীর্ঘ আলোচনার পর, আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে ভারত ও পাকিস্তান সার্বিকভাবে এবং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’ ১০ মে বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে এই ঘোষণার বাস্তবতা সম্পর্কে ভারতীয়দের টনক নড়িয়ে দিয়েছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনোরকম ধোঁকা দেননি। যুদ্ধবিরতিতে দুই দেশ সম্মত হয়েছিল ১০ মে বিকেল ৩টে ৩৫ মিনিটে এবং সেদিন বিকেল ৫টায় ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর ধরা হয়। সন্ধ্যা ৬টায় মার্কিন বিদেশ সচিব গম্ভীরভাবেই এই তথ্য ‘কনফার্ম’ করেন। আমেরিকা কীভাবে দাবি করেছে যে তারা এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে (যদি চাপসৃষ্টি না-হয়ে থাকে) এবং সেটা কেন করেছে, তা আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি বলে আমার মনে হয়। এর একাধিক যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে:
চীনের কারণ
• ভাইস প্রেসিডেন্ট ভান্স ৯ মে সন্ধ্যায় নরেন্দ্র মোদিকে ‘ভয়ঙ্কর গোয়েন্দা তথ্য (অ্যালার্মিং ইনটেল)’ শেয়ার করেছিলেন। উদ্বেগজনক গোয়েন্দা তথ্যটি কেবল পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি কিংবা এই বিবাদে চীনের ভূমিকা সম্পর্কিত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী উভয়েই বলেছেন যে ‘পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল’-এর কাছে ভারত নতি স্বীকার করবে না। যদি এমন কোনও হুমকি নাই থাকে, তবে ভারতের তরফে কেন এমন একটি বাক্যাংশ ব্যবহার করা হয়েছিল?
• চীনের ভূমিকা সম্পর্কে, এটা একেবারে স্পষ্ট যে—পাকিস্তানকে চীনা বিমান (জে-১০) এবং চীনা ক্ষেপণাস্ত্র (পিএ,-১৫) ব্যবহার করার অনুমতি চীন দিয়েছিল। চীনা ইনপুট এবং পাকিস্তান বিমান বাহিনীর কমান্ড সেন্টারে চীনা বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি ছাড়া এগুলি ব্যবহার করা যেত না। (ভারত সেগুলিকে ‘নিউট্রালাইজড’ করার পাশাপাশি আক্রমণ রুখে দিয়েছিল।)
• india.com এবং defencexp.com নামক দুটি ওয়েবসাইট রিপোর্ট করেছে যে, কর্নেল র‌্যাঙ্কের পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের চীনের গণফৌজের (পিএলএ) ওয়েস্ট ও সাউথ থিয়েটার কমান্ড এবং সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের জয়েন্ট স্টাফ কমান্ডে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে চীনের গাইডেন্স স্পষ্টতই সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল।
• পাকিস্তান দাবি করেছে যে তারা ভারতের এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাক করে চীনের তৈরি হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল। চীনের সরকারি সংবাদ সংস্থা জিনহুয়া এটিকে ‘যুদ্ধে একটি নতুন যুগের ভোর’ হিসাবে বর্ণনা করেছে। (যদিও আদমপুর বিমান ঘাঁটিতে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম অক্ষতই রয়েছে)
চারদিনের যুদ্ধ এবং তার ট্যুইস্টেড কোর্সটা দেখুন। ৭ মে ভারত অ্যালগরিদম-ড্রাইভেন (পূর্ব-নির্দেশিত এবং স্বয়ংক্রিয়) যুদ্ধের যুগে প্রবেশ করেছিল। কোনও সৈন্য স্থল সীমান্ত কিংবা নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) অতিক্রম করেনি। কোনও বিমানও প্রবেশ করেনি প্রতিপক্ষের আকাশসীমায়। প্রধান অস্ত্র ছিল ক্ষেপণাস্ত্র এবং সশস্ত্র ড্রোন। অগ্রণী পক্ষ যে সুযোগ পায় সেটা ভারতই পেয়েছিল এবং সেইমতো ৭ থেকে ৯ মে’র মধ্যে পাকিস্তানকে ভয়ানক শাস্তি দিয়েছিল ভারত। বিজয়ের সেই মুহূর্তে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ঢুকে গিয়ে যুদ্ধটা থামানোর জন্য হস্তক্ষেপ করে বসেন। ‘সবচেয়ে ভালো মানুষ (দ্য নাইসেস্ট হিউম্যান বিয়িং)’-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বকে একপাশে সরিয়ে রেখে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য তিনি ভারতকে চাপ দেন। সৌদি আরব এবং কাতার সফরকালে ভারতের সতর্ক প্রতিবাদ উপেক্ষা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, তাঁর মধ্যস্থতা এবং ‘কোনও বাণিজ্য না-করার’ হুমকিই এই যুদ্ধ থামিয়েছে।
ট্রাম্প সাহেবের বেনিয়া ঝোঁক
দিন দিন এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, ট্রাম্প পরিবারের বাণিজ্যিক স্বার্থই ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের নেপথ্যে মূল চালিকা শক্তি। ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ফার্মের নাম ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়াল (ডব্লুএলএফ)। এই সংস্থাটি পাকিস্তানের সঙ্গে একটা রফায় যায়। তারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের সঙ্গেও দেখা করেছিল। অতঃপর, পহেলগাঁও সন্ত্রাসবাদী হামলার মাত্র চারদিন পর, ২৬ এপ্রিল ডব্লুএলএফ পাকিস্তান ক্রিপ্টো কাউন্সিলের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রাথমিক ‘হ্যান্ডস অফ’ অ্যাপ্রোচ ত্যাগ করেন। ৭ মে’র পর থেকে উন্মত্ত কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের শেষকথা ছিল, যেমনটি তিনি দাবি করেছিলেন।
দোস্তি সত্ত্বেও ভারতীয় ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের হাতকড়া এবং পায়ে শিকল পরিয়ে বহিষ্কার করেছিল আমেরিকা। প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটিও শব্দ শোনা যায়নি। ভারত থেকে আমদানির উপর চড়া শুল্ক চাপানো হল। তার প্রতিবাদেও একটিও শব্দ নেই। পাকিস্তানকে আইএমএফ লোনের পক্ষে ভোট দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একটিও শব্দ নেই তা 
নিয়েও। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয়সহ বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হল। প্রতিবাদে ভারতের তরফে একটিও শব্দ 
শোনা গেল না। ভারতীয় পড়ুয়ারা এই মুহূর্তে 
তাঁদের ভিসা খারিজের হুমকির মুখোমুখি। তা নিয়ে একটিও শব্দ নেই। স্টুডেন্ট ভিসা ইন্টারভিউ স্থগিত ঘোষিত হয়েছে। একটি কথাও বলা হয়নি তার জন্য। দোস্তি স্রেফ ভেঙে পড়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আর কোনও লেনদেনে নেই! মোদিজি এমন একটি পরিবারের প্রধানের সঙ্গে লেনদেন করছেন যারা বহু মিলিয়ন ডলারের ডব্লুএলএফ-এর মালিক এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্প্রতি একটি বাণিজ্যিক চুক্তিও তারা করেছে। তিনি এমন একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে লেনদেন করছেন যিনি পোটাস (মার্কিন প্রেসিডেন্ট)-এর পোশাক, বর্ম, সম্পদ এবং ক্ষমতার ব্যবহার করতে দ্বিধা করবেন না।
অপারেশন সিন্দুরের প্রতি ভারতের রাজনৈতিক সমর্থন এবং তাঁর কঠোর বক্তব্য সত্ত্বেও, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণে মোদিজি সত্যিই হতবাক। পাকিস্তান আর চাপের মুখে নেই: তাদের প্রতি চীনের সামরিক সমর্থন এবং আমেরিকার কূটনৈতিক সমর্থন রয়েছে। সামরিক কৌশল পুনর্নির্মাণের জন্য ভারতকে নয়া পরিকল্পনা শুরু করতে হবে। আমাদের আমেরিকা নীতি পুনর্নির্মাণের জন্যও ভারতকে নতুন করে ভাবতে হবে। 
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ