পি চিদম্বরম: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের এই যুদ্ধ কোনো দূরবর্তী সংঘাত নয়। এটি পশ্চিম এশিয়ায় সংঘটিত হচ্ছে, যা ভারতীয় উপমহাদেশেরই প্রতিবেশী অঞ্চল। এই অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় বসবাস করছেন। তাঁদের চাকরি বা কর্মসংস্থান হয়েছে সেখানে। অসংখ্য ভারতীয় শিয়া মুসলমানের সঙ্গে ইরানের জনগণের রয়েছে এক গভীর ও অটুট বন্ধন। ঐতিহাসিকভাবেই ভারত ইরানের সঙ্গে তার দীর্ঘ ও প্রাচীন সম্পর্কের দাবি করে এসেছে। বিগত বছরগুলিতে ভারত ইরানের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের দাবিও জানিয়ে এসেছে—যার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল চাবাহার বন্দরের উন্নয়ন। তবে বিজেপি সরকারের শাসনকালে সেই দাবিগুলির ভিত্তি কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম একটি কারণ হল ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব।
আর কাঙ্ক্ষিত নয়
পুরানো সেই সুসময়ে, কোনো সংঘাত বা বিরোধ দেখা দিলে ভারতই হত সবচেয়ে বেশি সমাদৃত ও কাঙ্ক্ষিত মধ্যস্থতাকারী। তবে এবার, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল—উভয় পক্ষই ভারতকে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলেছে। একমাত্র ইরানই মাঝে মাঝে ভারতকে পরিস্থিতি সম্পর্কে ‘অবহিত’ করার বা ‘ব্রিফিং’ দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিকতা বজায় রেখেছে। ভারত ইজরায়েলের প্রতি কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণই করেছে—যার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হল ব্রিকস (বিআরআইসিএস) জোটভুক্ত দেশগুলির তরফে উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাবের উপর ভারতের ভেটো প্রদান; যে প্রস্তাবটিতে ইজরায়েলের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের এই জোট ভারতকে আলোচনার ‘বাইরে’ই রেখেছে এবং এর পরিবর্তে কাছে টেনে নিয়েছে পাকিস্তানকে, মধ্যস্থতাকারী হিসাবে!
ভারত এখন আর এমন ভান করতে পারে না যে, পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধ আমাদের দেশের উপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। এই যুদ্ধ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের অর্থনীতিরই ক্ষতিসাধন করেছে—বিশেষ করে সেই দেশগুলির, যাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সামুদ্রিক স্বার্থের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অংশীদারিত্ব রয়েছে। আসুন, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি—যেদিন যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল—তারপর থেকে ভারতের অর্থনীতির কিছু সূচকের দিকে নজর দেওয়া যাক: (নিবন্ধের শেষে টেবিল দ্রষ্টব্য)
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফাঁকা বুলি এবং আস্ফালনের সঙ্গে দুনিয়া সম্যক অবিহত। কেউই তাঁকে বিশ্বাস করেনি যখন তিনি বড়াই করে বলেছিলেন যে ইরানের বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে; কিংবা ইরানি সামরিক সম্পদ বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই; অথবা পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে (একবার না দুবার?) ইরানের ‘শাসনব্যবস্থায়’; কিংবা আমেরিকার খসড়া প্রস্তাবগুলি ইরান মেনে নিয়েছে; অথবা (বিভিন্ন সময়ে) যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ট্রাম্প সাহেব যুদ্ধ থামান, তারপর আবার শুরু করেন, এবং এরপর একটি বিরতির ঘোষণা দেন। এরই মধ্যে, ইজরায়েল ইরান ও লেবাননে আক্রমণ চালিয়ে যায় এবং ইরান তার পালটা জবাব দেয়। বিশ্ব জানে যে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা আসলে কখনোই থামেনি।
সবকিছু স্বাভাবিক নয়
সরকার দাবি করছে যে ‘সবকিছুই স্বাভাবিক’। তবে রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআইI) সম্ভবত এই যুদ্ধের খরচ ও পরিণাম সম্পর্কে অধিকতর সচেতন। তাদের এপ্রিল মাসের বুলেটিনে,
আরবিআই ‘আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সৃষ্ট চাপ’, ‘জ্বালানি ও খাদ্যের কারণে সৃষ্ট ভোক্তা মূল্যস্ফীতি (সিপিআই)’, ‘বন্ডের ইল্ড বা আয়ের হার’, ‘আমদানি কমে যাওয়া’ এবং ‘বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের (এফআইআই) অস্থির প্রবাহ’-এর বিষয়গুলি চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, “যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলগুলি দ্রুত পুনরুদ্ধার না করা যায়, তবে তা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য নানাবিধ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি
করতে পারে...” পেট্রল ও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা ছাড়া (সম্ভবত নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে), সরকার কার্যত আর বিশেষ কিছুই করেনি। দেখেশুনে মনে হচ্ছে যে, সরকার যেন নিছক এক দর্শক হয়ে ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকিয়ে আছে—আর মনে মনে নীরবে প্রার্থনা করছে যেন এই ঘটনাগুলি ভারতীয় অর্থনীতিতে কোনো আঘাত বা ক্ষত সৃষ্টি না করে।
ভারতের জনগণ অত্যন্ত সহনশীল এবং ধীরস্থির প্রকৃতির। তাঁরা জানেন যে, সরকারের কাছ থেকে খুব বেশি সাহায্য পাওয়ার আশা তাঁদের নেই। তাঁরা তাঁদের বর্তমান চাকরি এবং আয়ের উৎসগুলি রক্ষা করার ব্যাপারে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এলপিজির (এলপিজি) বর্ধিত মূল্য এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, সাধারণ পরিবার এবং ছোটোখাটো খাবারের দোকানগুলি এখন জ্বালানি হিসাবে কাঠ ব্যবহার করতে শুরু করেছে। গড়পড়তা প্রতিটি পরিবারই তাদের ভোগব্যয় কমিয়ে দিয়েছে এবং জমানো অর্থ বা সঞ্চয়ে হাত দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বাইরে কোনো বিশৃঙ্খলা বা হতাশা চোখে পড়ে না ঠিকই; কিন্তু গ্রাম ভারত ঘুরে দেখলে বোঝা যায় যে, সাধারণ মানুষ আসলে বেশ চিন্তিত। প্রধানমন্ত্রী চারটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন এবং নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিলটি—যা সংসদ ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পাস করেছিল—পুনরায় কার্যকর করার লক্ষ্যে পরিচালিত একটি কৌশলী প্রচারে পুরোপুরি নিমগ্ন রয়েছেন। ৫ মে-র পর তিনি হয়তো আবার শাসনকাজে মনোনিবেশ করবেন।
সরকার আরো অনেক কিছু করতে পারে
মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করতে এবং তাদের আয় বাড়াতে সরকার আরো অনেক পদক্ষেপ করতে পারে:
• সরকার এমজিএনআরইজিএ-র অধীনে বকেয়া মজুরি পরিশোধ করতে পারে এবং সেই কর্মসংস্থান কর্মসূচিটি পুনরায় চালু করতে পারে, যা ‘জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন’ বাতিল ও পরবর্তীতে নামমাত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর থেকে এক প্রকার থমকে রয়েছে।
• কেন্দ্রের গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ কর্মসূচিকে (পিএমজিএসওয়াই) ত্বরান্বিত করা যেতে পারে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে বরাদ্দকৃত ১৯ হাজার কোটি টাকা ছয়-আট মাসের মধ্যেই ব্যয় করা যেতে পারে (যেমনটা ঘটেছিল না ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে, যখন ৬,৮৭১ কোটি টাকা অব্যবহৃত রয়ে গিয়েছিল); এছাড়া প্রয়োজনে এই খাতে আরো অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা যেতে পারে।
• ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ‘পানীয় জল মিশন’ বা
‘জল জীবন মিশন’-এর জন্য প্রাথমিক বাজেট এস্টিমেট (বিই) ছিল ৬৭ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু সংশোধিত বাজেট এস্টিমেট (আরই) নেমে এসেছিল মাত্র ১৭ হাজার কোটি টাকার এক হতাশাজনক পর্যায়ে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য বাজেটে নির্ধারিত ৬৭,৬৭০ কোটি টাকার ব্যয় বরাদ্দটি অর্থবর্ষের শুরুতেই বা অগ্রিম পর্যায়ে (ফ্রন্ট লোডেড) খরচ করা যেতে পারে এবং রাজ্য সরকারগুলির কাছে তহবিলগুলি দ্রুত ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে।
• কোভিড মহামারির সময়ের মতো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ আর যেন না-হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ক্ষেত্রে (এমএসএমই) ঋণ প্রদানের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য লোকসান মেটানোর জন্য, সরকারের উচিত, সুনির্দিষ্টভাবে একটি অর্থের পরিমাণ বরাদ্দ করা। পাশাপাশি, দ্রুত ঋণ বণ্টনের জন্য ব্যাংকগুলিকে নির্দেশ দিয়ে সেই শিল্প ক্ষেত্রটিকে পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন, যা বর্তমানেও এক গভীর স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
• ‘জনকল্যাণমূলক পণ্য ও পরিষেবা’ (পাবলিক গুডস) নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। মানুষের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যয় বরাদ্দ করা। ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যুদ্ধের ফলে দেশবাসীর উপর যে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার মোকাবিলায় এটাই হতে পারে অত্যন্ত কার্যকরী একটি উপায়। হতভম্বের মতো নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকার চেয়ে এই পদক্ষেপ নিঃসংশয়ে অনেক বেশি শ্রেয়।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত