Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আশঙ্কার পারদ চড়ছে

সাল ২০১৯। দেশব্যাপী জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নে সরকারের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উক্তি ছিল, ‘আপ ক্রনোলজি সামঝাইয়ে।’

আশঙ্কার পারদ চড়ছে
  • ১৫ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সাল ২০১৯। দেশব্যাপী জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নে সরকারের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উক্তি ছিল, ‘আপ ক্রনোলজি সামঝাইয়ে।’ সরকার প্রথমে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনবে। তারপর তৈরি হবে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি। বিহারের ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ ( সংশোধন) বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন-এর কাজের অগ্রগতি বোঝাতে গিয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনও হয়তো বলতে পারে, ক্রনোলজিটা বুঝুন। নভেম্বরে বিহার বিধানসভা ভোটের আগে সেই রাজ্যে ‘প্রকৃত ভোটার’ যাচাইয়ের নামে ফর্মপূরণের কাজ শুরু হয়েছে। রবিবারের মধ্যেই নাকি ৮০ শতাংশ ফর্মপূরণের কাজ হয়ে গিয়েছে বলে দাবি কমিশনের। এই তাড়াহুড়োর কারণ হতে পারে ২৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত মামলার পরবর্তী শুনানি। তার আগে ২১ জুলাই আদালত তাদের কিছু পর্যালোচনার উপর কমিশনের লিখিত বক্তব্য জানতে চেয়েছে। ওই দিন আদালতকে কমিশন বোধহয় দেখাতে চায়, ফর্মপূরণের কাজ ১০০ শতাংশ শেষ। সেইসঙ্গে দিতে পারে ‘শুদ্ধিকরণে’র কেন প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যা। 

Advertisement

অথচ গত ১০ জুলাই মামলার শুনানিতে এই তাড়াহুড়ো নিয়ে প্রশ্ন তুলে শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরা বলেছিলেন, কেন ভোটার তালিকা সংশোধনের সঙ্গে বিহারের নির্বাচনকে জড়ানো হচ্ছে? এই কাজ স্বাধীনভাবে গোটা দেশে করা যেতে পারে। তাই জনমনে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন কমিশনের ব্যস্ততা, অতিরিক্ত সক্রিয়তা কি বুঝিয়ে দিচ্ছে না যে সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ তারা যেন গায়ে মাখতে নারাজ। এই মামলার প্রথম দিনে ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের কাজ বন্ধ করার নির্দেশ না দিলেও কমিশনের কাছে মূলত তিনটি প্রশ্ন রাখেন বিচারপতিরা। এক, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় কমিশনের ক্ষমতার কথা। দুই, এই ক্ষমতা প্রয়োগের প্রক্রিয়া এবং তিন, সময়সীমা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ন্যায্য ভোটারের তালিকা তৈরির জন্য যে ১১টি নথির তালিকা তৈরি করেছে কমিশন, তাতে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ও রেশন কার্ড নেই! কমিশনের যুক্তি, আধার নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, পরিচয়ের প্রমাণ। এ প্রসঙ্গে বিচারপতিরা বলেন, যে ১১টি নথির কথা বলা হয়েছে তার কোনওটিই স্পষ্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, সবই পরিচয়ের প্রমাণপত্র। তাঁরা আরও বলেছিলেন, যেসব নথি পেতে আধারের প্রয়োজন হয়, সেইসব নথি তালিকায় থাকলেও আধার নেই! আদালত একথাও মনে করিয়ে দেয়, নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাজ, নির্বাচন কমিশনের বিষয় নয়। তাই তালিকায় ভোটার, রেশন ও আধার কার্ড যুক্ত করার কথা কমিশনকে বিবেচনা করতে বলে শীর্ষ আদালত। কিন্তু প্রশ্ন হল, তা কি তালিকায় ঢোকানো হয়েছে? উত্তর স্পষ্ট নয়। 
বরং কমিশনের ভূমিকায় বিরোধীদের আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। মামলাকারী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির আশঙ্কা ছিল, ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের নামে বিহারে তিন কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে এক কোটি পরিযায়ী শ্রমিক। রবিবার কমিশন জানিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধন করতে নেমে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বুথস্তরের অফিসাররা বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি, নেপালি ও রোহিঙ্গার সন্ধান পেয়েছেন। ৩০ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় এদের নাম থাকবে না। তার মানে, কে নাগরিক, কে নয়—তা ঠিক করে দিতে চলেছেন বুথস্তরের অফিসাররা? এদের আধার, ভোটার কিংবা রেশন কার্ড আছে কি না তা অবশ্য জানায়নি কমিশন। আগামী বছরের মাঝামাঝি পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের ভোট। এরপর এই দুই রাজ্যেও ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ শুরু হবে। ক্রনোলজিটা পরিষ্কার। অভিযোগ হল, প্রথমে ভোটার তালিকার সংস্কার, তারপর জনগণনার মাধ্যমে বিদেশি অনুপ্রবেশকারীর তকমা দিয়ে সংখ্যালঘু, আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া নানা জনজাতির মানুষকে দেশছাড়া করা হবে। যা বিজেপির দর্শন। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি নির্বাচন কমিশন ও জনগণনার মাধ্যমে আসলে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি তৈরিতে নেমে পড়েছে মোদির সরকার? আশঙ্কাটা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। তবু বলা দরকার, একটি স্বাধীন সংস্থা হিসাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে যে পর্যবেক্ষণের কথা শুনিয়েছে শীর্ষ আদালত তার মর্যাদা দিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার কথা ভাববে তারা। কমিশন তার নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বজায় রাখবে। এবং এই সংক্রান্ত মামলার পরবর্তী শুনানির দিন (২৮ জুলাই) আদালত কী বলে, তাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সে দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন কোটি কোটি ভোটার। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ