Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

থিয়েটারের ঠাকুর

‘লোকে কয় অভিনয়, কভু নিন্দনীয় নয়,নিন্দার ভাজন শুধু অভিনেতাগণ।’ অনেক দুঃখে, অনেক ক্ষোভে এই পঙক্তিটি লিখেছিলেন বাংলা থিয়েটারের জনক গিরিশ ঘোষ।

থিয়েটারের ঠাকুর
  • ১৪ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: ‘লোকে কয় অভিনয়, কভু নিন্দনীয় নয়,নিন্দার ভাজন শুধু অভিনেতাগণ।’ অনেক দুঃখে, অনেক ক্ষোভে এই পঙক্তিটি লিখেছিলেন বাংলা থিয়েটারের জনক গিরিশ ঘোষ। সেটা উনবিংশ শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশ। বঙ্গ রঙ্গালয় তখন সমাজের শিক্ষিত, মধ্যবিত্তদের কাছে প্রায় অচ্ছুৎ হয়ে উঠেছে। বিশেষত ব্রাহ্ম সমাজিরা তার নিন্দায় মুখর। এমনকী বিদ্যাসাগর, নরেন্দ্রনাথ, রাজা কালীকৃষ্ণ দেবের মতো প্রগতিশীল মানুষও রঙ্গালয়ের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেন। ব্রাহ্ম কেশব সেনের ‘সুলভ সমাচার’ সহ একাধিক বাংলা পত্র পত্রিকা বাংলা থিয়েটারের নিন্দায় মুখর। কিন্তু কেন? কারণ, মঞ্চে বারাঙ্গনাদের ‘অনুপ্রবেশ’। ১৮৭৩ সালের আগে পর্যন্ত বাংলা থিয়েটারে পুরুষরাই নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন। তখন এই ছুঁৎমার্গ ছিল না। বরং একের পর এক ইংরেজ বিরোধী নাটক করে বাংলা থিয়েটার দেশবাসীর কাছে সম্মান অর্জন করেছিল। তাল কাটল ওই বছর ১৬ আগস্ট। মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরামর্শে ‘বেঙ্গল থিয়েটার’ তাঁরই লেখা নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’-র প্রযোজনায় ওইদিনই প্রথম মঞ্চে অভিনেত্রী নিয়ে আসে। ব্যস! তারপরই ‘গেল গেল রব’। ক্রমে বেঙ্গল থিয়েটারের দেখাদেখি বাকি রঙ্গালয়গুলিও বারাঙ্গনাদের দিয়ে অভিনয় করাতে শুরু করল। দাড়ি, গোঁফ কামানো গাল নিয়ে হেঁড়ে গলায় পুরুষদের নারী সেজে অভিনয় অসহ্য লাগলেও বারাঙ্গনা নারীরা মঞ্চে অভিনয় করবেন— এ হেন ‘স্বৈরী কাণ্ড’ শিক্ষিত বাঙালি মেনে নিতে পারেনি। ফলে তাঁরা একযোগে বয়কট করেছিলেন বাংলা থিয়েটারকে। ক্রমশ অন্ধকারে ডুবছিল বাংলা থিয়েটার। এই অন্ধকার থেকে বঙ্গ রঙ্গমঞ্চকে উদ্ধার করেছিলেন সেই মানুষটি, যাঁর গায়ে তথাকথিত প্রগতিশীলতার লেবেল ছিল না। ছিল না প্রথাগত শিক্ষা। 

Advertisement

তা সত্ত্বেও নিতান্তই ‘গেঁয়ো যোগী’ সেই মানুষটি তৎকালীন বহু শিক্ষিত বাঙালির পরম পূজ্য হয়ে উঠেছিলেন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ। রামচন্দ্রের পাদস্পর্শে যেমন প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন পাষাণী অহল্যা, ঠিক তেমনই শ্রীরামকৃষ্ণের পদধূলিতে প্রাণ ফিরেছিল বাংলা থিয়েটারের। তাঁর সংস্পর্শে এসে কালিমামুক্ত হয়েছিল বঙ্গ রঙ্গমঞ্চ, কালিমামুক্ত হয়েছিলেন অভিনেতা অভিনেত্রীরা। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের এটি অত্যন্ত কম আলোচিত একটি অধ্যায়। আগামী ১৬ আগস্ট সেই ‘থিয়েটারের ঠাকুর’-এর তিরোধান দিবস। তার আগে আসুন একটু পিছনে ফিরে তাকানো যাক। 
সেদিনটা ছিল ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২১ সেপ্টেম্বর। ঠাকুর বললেন, আমি থিয়েটার দেখতে যাব। শুনে তো মূর্চ্ছা যাওয়ার উপক্রম উপস্থিত সকলের। ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ রাম দত্ত বললেন, সে কী কথা, সেখানে সব নষ্ট মেয়েরা অভিনয় করে। আপনি যাবেন সেখানে! অসম্ভব। ঠাকুর জেদি— হ্যাঁ যাব, দেখব ‘চৈতন্যলীলা’। গিরিশ ঘোষের স্টার থিয়েটার তখন ‘চৈতন্যলীলা’ নাটক করে সাড়া ফেলে দিয়েছে। নবদ্বীপ থেকে গোঁড়া বৈষ্ণবরা এসে সে নাটক দেখে গিরিশের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। অতএব ঠাকুরকে ঠেকায় কে। আসলে ছেলেবেলায় কামারপুকুরে থাকাকালীন ঠাকুর নিয়মিত যাত্রা দেখতেন। যাত্রা দেখতে দেখতে তাঁর ভাব সমাধি ঘটত। তখন থেকেই অভিনয় কলার প্রতি তাঁর টান। ঠাকুরের ইচ্ছানুযায়ী ২১ সেপ্টেম্বর রাতে ব্যবস্থা হল থিয়েটার দেখতে যাওয়ার। রাম দত্ত সরে দাঁড়ালেন। ঠাকুরের সঙ্গে চললেন মাস্টার, বাবুরাম ও নারায়ণ। একখানি ঘোড়ায় টানা গাড়ি এসে দাঁড়াল স্টারের সামনে। গাড়ি দেখে থিয়েটারের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা গিরিশ এগিয়ে এলেন। ঈষৎ টলায়মান। গাড়ি থেকে ঠাকুর নামলেন। ঠাকুরকে দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল গিরিশের। এই লোকটিকে তিনি বিলক্ষণ চেনেন। আগে বার দুয়েক দেখেছেন। এঁর সম্পর্কে তাঁর মনে কোনওদিন কোনও ভক্তিভাব কিংবা শ্রদ্ধা জাগেনি। এঁর ক্ষণে ক্ষণে মূর্চ্ছা যাওয়া, ভাব সমাধি এসব বুজরুকি বলেই মনে হয়েছে তাঁর। তবু মান্যগণ্য লোকেরা এঁর ভক্ত, তাই তিনি এগিয়ে গেলেন। বাবুরাম বললেন, ঠাকুর এসেছেন তোমার থ্যাটার দেখতে। গিরিশ কঠোর। বললেন, প্রত্যেকের টিকিট লাগবে। 
— ও বাবা! সে তো অনেক টাকা গো। এত পাব কোথায়? বাবুরামের অনুনয়ে গিরিশ খানিকটা নরম হলেন। বললেন, ঠিক আছে ঠাকুরের টিকিট লাগবে না, কিন্তু বাকিদের টিকিট কাটতে হবে। তাই সই। উপরের একটি বক্সে স্থান হল ঠাকুরের। শ্রীরামকৃষ্ণ ‘চৈতন্যলীলা’ দেখেন আর মাঝে মাঝেই ভাব সমাধি হয় তাঁর। গিরিশ সবই লক্ষ্য করছিলেন। ঠাকুরের এই কাণ্ডকারখানা তাঁর অসহ্য লাগছিল। অভিনয় শেষ হলে ঠাকুরকে থিয়েটারের অফিস ঘরে এনে বসানো হল। তিনি দেখতে চান শ্রীচৈতন্যের চরিত্রাভিনেতাকে। কিন্তু তিনি তো অভিনেতা নন, অভিনেত্রী, বারাঙ্গনা— নটী বিনোদিনী! তাতে কী, ঠাকুরের কাছে তো তখন আসল আর নকল সব এক। তিনি বিনোদিনীর মাথায় হাত রাখলেন। বিনোদিনী তাঁর আত্মকথায় সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে গিয়েছেন— ‘অভিনয় কার্য্য শেষ হইলে আমি শ্রীচরণ দর্শন জন্য যখন আপিস ঘরে তাঁর চরণ সমীপে উপস্থিত হইতাম, তিনি প্রসন্ন বদনে উঠিয়া নাচিতে নাচিতে বলিতেন, ‘‘হরি গুরু গুরু হরি’’, বল মা ‘‘হরি গুরু গুরু হরি’’, তাহার পর উভয় হস্ত আমার মাথার উপর দিয়া আমার পাপ দেহকে পবিত্র করিয়া বলিতেন যে, ‘‘মা তোমার চৈতন্য হউক।’’ 
একবার নয়, শ্রীরামকৃষ্ণ একাধিকবার নাটকটি দেখেছিলেন। ‘বারাঙ্গনা কলুষিত’ রঙ্গমঞ্চে শ্রীরামকৃষ্ণের এই পদার্পণ সমাজে এক বিরাট অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। যে বাঙালি এতদিন থিয়েটার থেকে শত যোজন দূরে ছিল। সেই বাঙালির বাংলা থিয়েটারের প্রতি মনোভাবের পরিবর্তন হল। 
কট্টর বামপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রয়াত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা নাট্যমঞ্চের প্রতি শ্রীরামকৃষ্ণের এই অবদানকে স্বীকার করেছেন। নটী বিনোদিনীর আত্মজীবনী ‘আমার কথা’-র একটি সংস্করণের সম্পাদকীয়তে তিনি ও নির্মাল্য আচার্য লিখেছেন, ‘... রঙ্গালয়ে রামকৃষ্ণের আগমন সে সময়ে একটি বড় ঘটনা। ... রঙ্গালয় ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের লোকে তখন সুনজরে দেখত না, সমাজে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা ছিল— অভিনেতারা দুশ্চরিত্র, আর অভিনেত্রীরা বারাঙ্গনা বলে ঘৃণার পাত্র ছিল। ... এই সামাজিক অসম্মান ছিল মর্মান্তিক। রামকৃষ্ণের পদার্পণ তাই রঙ্গালয়ের একটা সামাজিক মর্যাদা এনে দিয়েছিল বলেই মনে হয়।’
ঠাকুর স্বয়ং থিয়েটারে যাওয়ায় আর বিনোদিনীর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করায় মানুষের মনে থিয়েটার সম্পর্কে যে বীতরাগ ছিল তা কেটে যেতে শুরু করল। 
ঠাকুর থিয়েটারকে কতটা গুরুত্ব দিতেন, আর একটি ঘটনা থেকে তা বোঝা যায়। সেটা ১৮৮৫ সালের কথা। গিরিশ তখন পুরোপুরি ঠাকুরের চরণে নিবেদিত প্রাণ। এক সন্ধেয় শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর শিষ্যরা এসেছেন গিরিশের বাড়িতে। কথাবার্তা চলছে। এদিকে গিরিশকে থিয়েটারে যেতে হবে। কিন্তু তাঁর মন চাইছে না ঠাকুরকে ছেড়ে থিয়েটারে যেতে। সে কথা তিনি ঠাকুরকে জানালে, ঠাকুর তাঁকে থিয়েটারে যেতে অনুমতি দেন। কিন্তু তার পরেও গিরিশের মন মানতে চায় না। তিনি বলেন, ভাবছি থিয়েটার ছোঁড়াগুলোকেই ছেড়ে দিই। অর্থাৎ কমবয়সিদের হাতে থিয়েটারের কাজ সঁপে দেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি। শুনে ঠাকুর বললেন, ‘না না, ও বেশ আছে। ওতে অনেকের উপকার হচ্ছে।’ ঠাকুর উপলব্ধি করেছিলেন যে, থিয়েটারে সমাজের উপকার হয়। 
থিয়েটারের প্রতি শ্রীরামকৃষ্ণের এই অবদানের কথা পেশাদার রঙ্গমঞ্চ কখনও ভোলেনি। তাই হাতিবাগানের থিয়েটার হলগুলোতে শ্রীরামকৃষ্ণের একখানি ছবি থাকতই থাকত। এখনও কোনও কোনও থিয়েটার হলে ঠাকুরের ছবি দেখা যায়। পেশাদার থিয়েটার দেহ রেখেছে। কিন্তু বর্তমানে যে প্রগতিশীল থিয়েটারের চর্চা বাংলার নাট্যদলগুলো করে থাকে, তারা কিন্তু এই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন। নিজের সংস্কৃতি, নিজের ইতিহাস বিস্মৃত হওয়া কখনওই প্রগতিশীলতার নির্দশন হতে পারে না, এ কথা ইতালীয় নাটককার দারিও ফো থেকে শুরু করে ঋত্বিক ঘটক সকলেই বিশ্বাস করতেন। দারিও ফো বলেছিলেন, সমাজের এলিট ক্লাস সবসময়েই তাদের সংস্কৃতি, তাদের ইতিহাস সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। তাই তিনি লোকজ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার পক্ষে সওয়াল করতেন। 
ঋত্বিক ঘটকও তাঁর সিনেমায় ছৌ, ঝুমুর নাচ, বাউল গান, মহাকাব্য, পুরাণকে বার বার রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, এতে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা, বক্তব্যকে তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সহজতর হয়। কোনও জাতি শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তার আর বাড়বৃদ্ধি হয় না। ‘বনসাই’ করার সময়ে যেমন গাছের শিকড় ছেঁটে তার বৃদ্ধি রোধ করা হয়, সেইরকমই। যুগে যুগে সমস্ত শাসক সেই কাজটাই করে এসেছে। 
আমরা যতই ২৭ মার্চ আন্তর্জাতিক নাট্য দিবস পালন করি না কেন, বাঙালির আসল নাট্য দিবস হওয়া উচিত ২১ সেপ্টেম্বর, যেদিন শ্রীরামকৃষ্ণ থিয়েটারে পদার্পণ করেছিলেন, সেই দিনটি। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা নিজেদের ইতিহাস ভুলতে বসেছি। নিজেদের সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে হিন্দি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। আজ যখন বাংলাভাষা, বাঙালির উপর একের পর এক আক্রমণ নেমে আসছে তখন বাংলার নাট্যদলগুলির উচিত বাংলা রঙ্গমঞ্চে শ্রীরামকৃষ্ণের এই অবদানকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করা। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ