Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মূল প্রাপ্তি যন্ত্রণা ও হতাশা, কিছু রগড়ও

এসআইআর আতঙ্কে বৃদ্ধের মৃত্যু! নামখানার মৌসুনিতে উত্তেজনা। দুই: এসআইআর: অফিসে যাওয়ার তাড়ায় দুর্ঘটনায় মৃত্যু ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের।

মূল প্রাপ্তি যন্ত্রণা ও হতাশা, কিছু রগড়ও
  • ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী, এক: এসআইআর আতঙ্কে বৃদ্ধের মৃত্যু! নামখানার মৌসুনিতে উত্তেজনা। দুই: এসআইআর: অফিসে যাওয়ার তাড়ায় দুর্ঘটনায় মৃত্যু ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের। তিন: এসআইআর আতঙ্কে হৃদরোগ, বৃদ্ধার মৃত্যু জীবনতলায়। চার: শুনানির লাইনে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা, বসার জায়গা ছিল না! শ্রীরামপুরে এসআইআর-ঘটিত মৃত্যু ঘিরে শোরগোল। পাঁচ: তিন মৃত্যুতে নাম জড়াল এসআইআর প্রক্রিয়ার। ছয়: এসআইআর আতঙ্কে এবার বৃদ্ধের মৃত্যু হিঙ্গলগঞ্জে। সাত: ভোটার কার্ড ও তালিকায় পদবিতে ভুল, কুমারগঞ্জে নিজেকে শেষ করলেন বৃদ্ধ। নয়: শিক্ষক, গাড়িচালক, টোটোচালক ও বধূর মৃত্যুতে ‘দায়ী’ এসআইআর! রাজ্যে ৪ মৃত্যু ঘিরে রাজনৈতিক তরজা। দশ: বিষ খেয়ে ‘বিফল’, রেললাইনে মাথা দিলেন নোটিস পাওয়া যুবক! রাজ্যে ‘এসআইআর আতঙ্কে’ মৃত আরো ৩... বস্তুত মাস তিন-চার যাবৎ খবরের কাগজগুলিতে, টিভি নিউজে এমন সংবাদ-শিরোনামের বিরাম নেই।

Advertisement

কোনো সুস্থ স্বাভাবিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ও সমাজের পক্ষে এই জিনিস হজম করা কঠিন। তাই ভুক্তভোগী মানুষজন তাঁদের মতো করেই কিছু প্রতিবাদ করেছেন—শুনানি কেন্দ্রে বিক্ষোভ, রাস্তা ও ট্রেন অবরোধ। যাঁদের সাহসে কুলোয়নি তাঁদের একজন শুনানিতে হাজির হয়েছেন ঠাকুর্দার কবরের মাটি নিয়ে! গা ভরতি নথিপত্র ঝুলিয়ে এবং মাথায় দলিল দস্তাবেজের ট্রাঙ্ক নিয়ে হাজির একজন ঘাটালে। খড়গ্রামে বাবাসাহেব এবং গান্ধীর ছবি ও গুচ্ছ নথিসহ একক মিছিল করেছেন এক ব্যক্তি। কোভিড ১৯ টিকা সার্টিফিকেটে জ্বলজ্বল করছে প্রধানমন্ত্রীর ছবি। অতএব এসআইআর নথি হিসেবে সেটাই গ্রহণ করতে হবে। এমন দাবিতে একজন ওই সার্টিফিকেট উঁচুতে ধরে গিয়েছেন শুনানিতে। ‘এসআইআরে বাদ্যযন্ত্রের মতোই বাজানো হচ্ছে আমাদের’—প্রতিবাদে মৌসুনি দ্বীপের বাসিন্দারা বাজনা বাজাতে বাজাতেই শুনানি কেন্দ্রে পৌঁছেছেন। বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠে গিয়ে, বিবাহের সাজেই শুনানিতে অংশ নিয়েছেন এক যুগল! সোমবার ইংরেজবাজারে এক শুনানি কেন্দ্র রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়।

এসআইআর নামক ধুম মাচানো শুরু হয়েছে বিহার থেকে। সেখানে নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যেই ধামাকা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল বঙ্গেও। ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গসহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বকেয়া এসআইআর সম্পন্ন করার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। তবে আলোচনা ও আকর্ষণের কেন্দ্রে বাংলাই। এসআইআর নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য যাই হোক, তাকে কটাক্ষ করেছেন কেবল বিজেপি নেতারা। কিন্তু কেন? গেরুয়া শিবির ভাবছিল, এতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল জব্দ হচ্ছে। লালবাতি জ্বলে যাচ্ছে টিএমসির ভোটব্যাংকে! ভাবখানা এই, ঘুঘু ধান খেয়ে যাও বারেবারে, এবার পড়ে গিয়েছ মরণফাঁদে! একুশে না-পাওয়ার যন্ত্রণা জুড়োবে এবার। এর থেকে এই অনুমান করা কি অন্যায় যে বাংলায় তৃণমূলকে শায়েস্তা করতেই এসআইআর একটা বৃহত্তর প্ল্যান, যেখানে ইসিআই ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র।

উপর্যুক্ত অসম্পূর্ণ তালিকা এবং বর্ণনাতেই স্পষ্ট এসআইআর থেকে এই পর্যন্ত বাংলার প্রাপ্তি কী? শতাধিক সহনাগরিকের অকালমৃত্যু, গণহয়রানি আর কিছু রগড়। বহির্বঙ্গে কর্মরত কেউ কেউ এই ‘সুযোগে’ বাড়ি এসে মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন হয়তো। কিছু ভোটারকে তলব করা হয়েছে একাধিকবার। হাজিরা দিতে যাওয়ায় শ্রমিকের রুটিরুজিতেই শুধু টান পড়ছে না, অনেক ছোটো সংস্থা ভয়ানক বিপাকে পড়ছে কর্মীর অভাবে। থমকে যাচ্ছে কিংবা বন্ধই হয়ে যাচ্ছে উৎপাদন। ভাবা যায়, শুনানির নামে ১.৪৭ কোটি ভোটারকে নিয়ে টানাটানি! এই বেনজির গণহয়রানির যন্ত্রণা তুলে ধরতে দিল্লিতে নির্বাচন সদনে হাজির স্বয়ং মমতা। লাগাতার প্রতিবাদ করে চলেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। হতাশা অবশেষে প্রকট বিজেপির অন্দরেও। কারণ তারা সার বুঝে গিয়েছে, শুধু জাতই গেল পেট ভরল না।

ইসিআই’কে সামনে রেখে দিল্লির মাতব্বররা গণতন্ত্রের দোহাই দিয়েছিলেন। কিন্তু হলফ করে বলা যায়, গণতন্ত্র যেমন প্রহসন ছিল তেমনই থাকবে। দুর্বৃত্তায়ন-অর্থায়ন দূর করার আন্তরিকতা কোথায়? ভোটারদের সঙ্গে লাগাতার বেইমানি এবং দলবদলুদের রুখবে কে? ইস্তাহারে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত। বুনিয়াদি শিক্ষার ভিত মজবুত করা থেকে গবেষণার পরিসর বৃদ্ধিই মানবোন্নয়নের চেনা পথ। সে তো কানাগলি এখন! স্কুলছুট নামক অভিশাপ কতটা কমানো গিয়েছে? একবিংশ শতকের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ পরিবেশরক্ষার মতো বিষয়টি ইস্তাহারে গুরুত্ব পায় না, যেন সবাই ট্রাম্পবাদী! কম অস্ত্র কিনে পড়শি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির নীতি ব্রাত্য ঘোষিত। সম্প্রদায়গত ধর্মে রাষ্ট্র হয় হস্তক্ষেপ করছে অথবা চালিয়ে যাচ্ছে তার অনৈতিক পৃষ্ঠপোষণা। গতি পাচ্ছে মেরুকরণের রাজনীতি। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসন প্রতিদিন হেরে যাচ্ছে। বৈষম্য কমানোর আন্তরিক প্রচেষ্টা অন্তর্হিত। প্রতিবছর কয়েকশো ধনাঢ্য ব্যক্তি ও পরিবারের সংখ্যাবৃদ্ধি নিয়েই চলছে আহ্লাদ। কাজের নিশ্চয়তা এবং প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির প্রয়াসের জায়গা কুক্ষিগত করেছে রেউড়ি সংস্কৃতি। উদ্বাস্তু সমস্যা এক ঐতিহাসিক সত্য। উদ্বাস্তু পরিবারের মধ্যে থেকে মেধাসম্পদ তুলে আনার বিপুল সুযোগ হেলায় নষ্ট হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রগঠনে সেটাই হতে পারত বিরাট হাতিয়ার।

শিক্ষাখাতে ব্যয়বরাদ্দ কম রাখার একমাত্র যুক্তি খুঁজে পাই: একটি শ্রেণির মানুষকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা যায়। স্বাস্থ্যখাতে নিম্ন ব্যয়বরাদ্দের যুক্তিও অনুরূপ: মানুষকে শারীরিকভাবেও দুর্বল রাখা সম্ভব। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং দুর্বল স্বাস্থ্যের মানুষকে শাসন করা সোজা। এই ধরনের মানুষ যত বেশি থাকবে রাজনৈতিক দলের মিটিং মিছিল সভায় তত বেশি ভিড় নিশ্চিত করা যাবে। বাহু ফুলিয়ে বলা যাবে, রেকর্ড মানুষের সমাবেশ নিয়ে আমরা জনসভা ‘সফল’ করেছি। আসলে, গরিবের সংখ্যা তলানিতে চলে গেলে ‘মেহনতি’ মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করার অহংকার যে ফুরিয়ে যায়!

ভোটপাখির ভূমিকায় নেমে বা ভোটের সময় ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে আর যাই হোক কোনো একটা রাজ্যের কল্যাণসাধন সম্ভব নয়। সর্বক্ষণ মানুষের সঙ্গে থেকে মানুষের‌ জন্য নিরন্তর‌ কাজ না করলে এই লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। এর উলটো রাস্তাটির নাম অবশ্যই ‘জুমলা’। জুমলা হাতিয়ার করে আর যাই হোক রাজনীতির উদ্দেশ্যসাধন হতে পারে না।

কেন্দ্র নস্যাৎ করছে রাজ্যের প্রশাসনিক পদক্ষেপকে। রাজ্য নস্যাৎ করছে কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে। এতে কেবল যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাই জলাঞ্জলি যাচ্ছে না, মদত পাচ্ছে দুর্বৃত্তরাজ। কেউ তো প্রাইমারির পড়ুয়া নয়, তাহলে সমন্বয়ের ব্যর্থতা কেন পদে পদে? রাজভবন, নীতি আয়োগ, এনএসও, আরবিআই, কোর্ট, ইসিআই, মানবাধিকার কমিশন, লোকায়ুক্ত প্রভৃতিকে কেন্দ্রের দাসানুস করে তোলার মরিয়া চেষ্টা তো ভয়ংকর প্রবণতা!

নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার কোন গ্যারান্টি দিচ্ছে এসআইআর? ‘অনুপ্রবেশকারীরা’ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অপরাধ সংঘটনের আর কোনো শক্তি এদেশে থাকবে না তো? জম্মু ও কাশ্মীর নিয়েও কিন্তু অনেক কথা বলেছিলেন মোদি-শাহ জুটি। তারপরেও কিন্তু পহেলগাঁও হয়েছে। এছাড়া জঙ্গিদের অন্যবিধ তৎপরতাও জারি আছে যথারীতি। অর্থাৎ কোনো ব্যবস্থাই ফুল প্রুফ নয়। বরং বেশি জরুরি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মানুষের রাজনীতি করা এবং উত্তরোত্তর মানুষের আস্থা বৃদ্ধি।

আইনসভার মানোন্নয়নেই-বা কী পদক্ষেপ? অধিবেশনের মেয়াদ কিন্তু সংকুচিত হয়েছে। সামান্য সময়েরও সদ্ব্যবহার হয় ক্বচিৎ। হয় সরকার নিজের পিঠ নিজে চাপড়াচ্ছে অথবা বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করে চলেছে একদল বিরোধী। ভণ্ডামি আর কুকথাতেই‌ কালক্ষয়। গঠনমূলক সমালোচনা এক দুর্লভ বস্তু। বিরোধী কণ্ঠ যত ক্ষীণ হয় তত ভালো শাসকের। বিরোধীকণ্ঠরোধের একটাই অর্থ এবং তা বেশ সরল: নির্বাচকদের বক্তব্য, চাওয়া-পাওয়া পত্রপাঠ নাকচ। জনগণের প্রতিনিধিত্বের পরিসর ক্রমে বহু কোটি টাকার ক্লাবে রূপান্তরিত হচ্ছে নাকি? জন্ম-কর্মসূত্রে যাঁরা ক্ষুধা ও গরিবির যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে অপারগ, দায়িত্ব তাঁদেরই হাতে ন্যস্ত হওয়ার পরিণাম ভুগছে দেশ। রুলিং পার্টির চাহিদা এবং সদস্যদের কোয়ালিটি মাফিক আইন তৈরি ও সংশোধন হচ্ছে। ফলে অধোগতিই বর্ধমান।

ভারতীয় গণতন্ত্রের আজকের একটি বড়ো ব্যাধির নাম কুকথা। নির্বাচন কমিশন এবং আইন আদালতও তাদের শোধরাতে পারছে না। পরিণামে বাড়ছে নির্বাচনি হিংসা। ‘উৎসব’ শব্দটি মশকরায় পরিণত। জনসেবার মোড়কে নির্বাচনব্যবস্থা, সংসদ, সরকার প্রভৃতি হয়ে উঠেছে একশ্রেণির রাজনীতির কারবারির আখের গোছাবার উপায়। তাই শাসক এবং রকমারি বিরোধীদের কাছে দাবি, গণতন্ত্রের স্বার্থে শুধু মানুষের রাজনীতিই যেন তারা করে। যে রাজনীতির প্রতি মানুষ বিমুখ হয়, তরুণ প্রজন্ম আকর্ষণ হারায়, যে রাজনীতিকে বেশিরভাগ মানুষ ধান্দাবাজির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে অন্তত তাকে দিয়ে দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ হবে না।

‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’র বদনাম ঘোচাতে না পারলে ভারতীয় গণতন্ত্রের মুক্তি নেই। বৃহত্তম হয়েও এই গণতন্ত্র পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, মিয়ানমার, মালদ্বীপ প্রভৃতি প্রতিবেশী দেশকে কোনো অনুপ্রেরণা জোগাতে পারবে না। এই দায় কেন্দ্রীয় শাসক দলের অবশ্য একার নয়, বহু দলীয় গণতন্ত্রে অংশগ্রহণকারী সকলের। প্রতিটি নির্বাচনের আগে এই বিষয়গুলির মীমাংসা কাম্য।

যখন একাধিক পড়শি রাষ্ট্র শত্রুভাবাপন্ন, তখন জাতির সুরক্ষার জন্য দেশের সমস্ত মানুষের আন্তরিক সাহায্য, সমর্থন, সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। পরিবর্তে নাগরিকদের একাংশকে হোস্টাইল করে বাস্তবে যে কোনো লাভই হবে না, এই সত্য বিস্মৃত হলে তা এক মস্ত দুর্ভাগ্য।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ