নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ। বালি। ইন্দোনেশিয়ার এক অপরূপ দ্বীপভূমি। সবুজ প্রকৃতিতে সাজানো বালি দ্বীপকে পরমযত্নে আগলে রেখেছে বালি সাগর আর ভারত মহাসাগর। ইন্দোনেশিয়ার জলজগতে ভেসে থাকা অজস্র দ্বীপের মধ্যে বালির জনপ্রিয়তা পর্যটকমহলে সর্বাধিক। সবুজের মলাটে জোড়া এহেন মায়াবী দ্বীপে দিনকয়েক ছুটি কাটানো এক পরম পাওনা। হলফ করে বলতে পারি বালিতে পৌঁছানো মাত্রই তার প্রেমে পড়ে যাবেন। বালির প্রকৃতি যেমন রোম্যান্টিক, তেমন ঐতিহ্যময় এখানকার সংস্কৃতি। কলকাতা থেকে সরাসরি বালি যাওয়ার কোনো উড়ান নেই। তাই কলকাতা থেকে প্রথমে চলুন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর। সেখান থেকে আবার বিমান বদলে পৌঁছাবেন বালির ডেনপাসার শহরে। কলকাতা থেকে বিমানে চার ঘণ্টায় পৌঁছাবেন কুয়ালালামপুর। আবার সেখান থেকে তিন ঘণ্টার উড়ান সফরে পৌঁছাবেন বালি। বালি ভ্রমণের জন্য যাতায়াত নিয়ে দিন সাতেকের ভ্রমণসূচি তৈরি করতে হবে। বছরভর এখানে মনোরম আবহাওয়া। মাঝেমাঝেই বৃষ্টি হয় বলে এখানকার প্রকৃতি সবুজ, সজল। এবার আসি ভিসার কথায়। ভারতীয়দের জন্য বালির বিমানবন্দরে অন অ্যারাইভাল ভিসার ব্যবস্থা রয়েছে, এছাড়াও, অনলাইনে ভিসা করা যায়।
বালির ডেনপাসার বিমানবন্দর থেকে রওনা দিন মূল শহরের উদ্দেশে। এই পথে পেরতে হবে সাগর সেতু। ডেনপাসার বালির রাজধানী শহর। গাছগাছালির ছায়াঘেরা সাজানো জনপদ। শহরটার অবস্থান দ্বীপের দক্ষিণপ্রান্তে। ডেনপাসারকে কেন্দ্র করেই পুরো দ্বীপটা ঘুরে দেখতে হবে। শহর থেকে অনতিদূরেই রয়েছে চমৎকার দুই সৈকত—সানুর আর কুটা। দুই সৈকতের লাগোয়া হোটেল-রিসর্টের ছড়াছড়ি। এখানেই বালিভ্রমণের দিনগুলোয় রাত কাটানোর জন্য পছন্দসই আস্তানা খুঁজে নিন। বালি ভ্রমণের জন্য গাড়ি ভাড়া করতে হবে। এছাড়াও, রয়েছে স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবস্থাপনায় নানাধরনের কন্ডাকটেড ট্যুর। বালির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। একদা যাযাবরদের দখলে থাকা এই দ্বীপভূমিতে পঞ্চম শতকে ভারত থেকে হিন্দুধর্মের আগমন ঘটে। ইন্দোনেশিয়া মুসলিম প্রধান দেশ হলেও বালির মানুষজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। দ্বীপে রয়েছে অজস্র মন্দির। সেখানে পূজিত হন হিন্দুদেবদেবীরা। আর এখানকার মানুষজনের মধ্যে রামায়ণ ধর্মগ্রন্থের বিশাল প্রভাব রয়েছে।
ডেনপাসার থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে বেদুগুল গঞ্জ। পথ গিয়েছে গ্রাম, গঞ্জ, সবুজ পাহাড়ি প্রকৃতি পেরিয়ে। গ্রাম্য বাড়িগুলোর স্থাপত্যশৈলী নজরকাড়ে। গ্রামগুলোও দৃষ্টিনন্দন। বেদুগুলে পাহাড়ের কোলে ভেসে রয়েছে বেরাটন হ্রদ। হ্রদে বোটিং করা যায়। হ্রদের অন্যতম আকর্ষণ একখণ্ড দ্বীপের ওপর প্যাগোডাকৃতির উলুনদানু মন্দির। হ্রদের পাড়ে আরও কয়েকটি মন্দির ও একটি বৌদ্ধস্তূপ রয়েছে। যাত্রাপথে কফিবাগানগুলোও দেখে নিতে পারেন। বালির একপ্রান্তে ভারত মহাসাগরের গায়ে টিলার ওপর গড়ে উঠেছে বিখ্যাত তানহালট মন্দির। ভাটার সময় সৈকতের ভিজে বালি মাড়িয়ে পৌঁছাবেন মন্দিরের দোরগোড়ায়। বালির সমস্ত প্রধান মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ নিষেধ। বাইরে থেকেই মন্দির দর্শন সারতে হবে। তানহা লট সৈকত থেকে সূর্যাস্তের অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। সৈকতের ধারে প্রচুর হস্তশিল্প সামগ্রীর দোকানপাট।
বালিতে ঘুরতে এসে এখানকার হস্তশিল্প গ্রামে অবশ্যই যাবেন। বালির হস্তশিল্পের খ্যাতি পর্যটকমহলে অপরিসীম। এমনই এক শিল্পগ্রাম হল বাতুবুলান। গ্রামের ঘরে ঘরে তৈরি হয় নানারকমের আকর্ষক হস্তশিল্প সামগ্রী। দরদাম করে সেখান থেকে কেনাকাটাও করা যায়।
এই গ্রামেই দেখে নিন ঐতিহ্যময় বারং নৃত্যানুষ্ঠান। স্থানীয় পুরা কাহিনিকে কেন্দ্র করে এক অনবদ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বালির সেলুক, উবুদ গ্রামেও নানাধরনের হস্তশিল্প তৈরি হয়। বাতুবুলান দেখে চলে আসুন আরণ্যক পাহাড়ে ঘেরা মনোরম বেদুলুগঞ্জে। এখানে দ্রষ্টব্য গোয়া গাজা গুহামন্দির। নির্মাণকাল দশম শতক। গুহায় রয়েছে গণেশ ও শিবমূর্তি। গুহার বাইরে সপ্তগঙ্গা প্রস্রবণ। একটি পাহাড়ি ঝরনাও রয়েছে এখানে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মন ভরে যাবে।
বালির উত্তরপ্রান্তে পাহাড়ি জনপদ কিন্তামানি প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠেছে। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পৌঁছাবেন সেখানে। এখানে বেড়াতে আসা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মাউন্ট বাটুরের আকর্ষণে। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে অনর্গল নিঃসৃত হচ্ছে কালো ধোঁয়া। পাহাড়ের পাদদেশে ঢেউ খেলছে বাটুর হ্রদ। বিরাট সরোবর। হ্রদের একপাশে একটুকরো গ্রাম্য জনপদ। এবার চলুন আগুং পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা প্রায় দু’হাজার বছরের পুরনো বালির বৃহত্তম বেখাশি মন্দির দেখতে। কিন্তামানি থেকে পাকদণ্ডী পাহাড়ি পথ গিয়েছে বেশাখির দোরগোড়ায়। এই সড়কপথের প্রায় পুরোটাই সবুজ প্রকৃতিতে সাজানো। পাহাড়ের গায়ে অল্প কয়েকটা ঘরবাড়ি নিয়ে আপাত নির্জন বেশাখি গ্রামের পরিবেশ। পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে ২৩টি শিল্পমণ্ডিত মন্দির গুচ্ছ নিয়ে বিরাট মন্দির কমপ্লেক্স। প্রতিটি মন্দিরই প্যাগোডাকৃতির। বহিরাঙ্গে নিখুঁত প্রস্তরভাস্কর্য। বেশাখি মন্দির ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা পেয়েছে। মূল মন্দিরটির অবস্থান পাহাড়ের সর্বোচ্চ অংশে। মন্দিরে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে।
বালি দ্বীপের প্রকৃতিকে মোহময় করে তুলেছে এখানকার একাধিক সৌন্দর্যময় সাগরবেলা। যার মধ্যে সানুর সৈকতের কথা আলাদাভাবে বলতেই হয়। বালির জনপ্রিয়তম সৈকত এটি। এখান থেকে লঞ্চে চেপে অচেনা দ্বীপেও যাওয়া যায়। এছাড়াও, কুটা, জিম্বারান, নুসাদুয়া সৈকতগুলোও পর্যটকমহলে যথেষ্ট জনপ্রিয়। ডেনপাসার শহর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি টিলার মাথায় রয়েছে বিখ্যাত উলুয়াতু মন্দির। টিলার পাদদেশে আছড়ে পড়ছে ভারত মহাসাগরের অনন্ত জলরাশি। উলুয়াতু মন্দিরে শেষ বিকেলে ভিড় জমায় পর্যটকরা। মন্দির প্রাঙ্গণে সূর্যাস্তের মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য ‘কেচাক’। সঙ্গে স্থানীয় গ্যামেলন বাদ্যযন্ত্রের সুরমুর্ছনায় মুখরিত হয়ে চারপাশের পরিবেশ। অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে সূর্যাস্তকে সাক্ষী রেখে অনুষ্ঠিত হয় আগুন নৃত্য। সে এক রোমহর্ষক নৃত্যকলা।
অয়ন গঙ্গোপাধ্যায় • ছবি: সুবীর কাঞ্জিলাল