


অগ্নিভ ভৌমিক, করিমপুর: কৃষ্ণনগর থেকে আশি কিলোমিটার সফর শেষে মহিষবাথান মোড় পার করে কিছু দূর এগলেই করিমপুর বাসস্ট্যান্ড। এই দীর্ঘ রাস্তার দু’ ধারের গ্রামবাংলার ছবি করিমপুরে এসে বদলে যায়। স্থায়ী বাসস্ট্যান্ড, মার্কেটিং সোসাইটি, আইটিআই কলেজ, কর্মতীর্থ, লালন মঞ্চ, পার্ক দিয়ে সাজানো ব্যস্ত শহর করিমপুর।যদিও প্রশাসনিক ভাবে তা এখনও পঞ্চায়েত।
করিমপুর বাজারে থলে হাতে দাঁড়িয়ে উন্নয়নের ‘সাতকাহন’ শোনাচ্ছিলেন তীর্থঙ্কর পাল। তিনি বলেন, ‘এই সরকারের আমলে করিমপুরের ছবিটাই বদলে গিয়েছে। এখন করিমপুরকে আর গ্রাম বলা যায়না। শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাটা একটু ভালো হলেই সব সমস্যা মিটে যেত।’ পাশেই বাস ধরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন মনোজিৎবাবু। তীর্থঙ্করবাবুর কথার রেশ টেনেই তিনি বললেন, ‘আমাদের এখান থেকে বহরমপুর ৫০ কিলোমিটার আর কৃষ্ণনগর ৮০ কিলোমিটার। গাড়িতে আসা-যাওয়া করতেই সারাদিন চলে যায়।’
বাংলাদেশ লাগোয়া নদীয়া জেলার শেষ বিধানসভা করিমপুর। রেললাইনের দীর্ঘদিন ধরে রেলপথের দাবি থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতায় তা বিশবাঁও জলে। করিমপুর বিধানসভায় জয়ের ধারা বজায় রাখতে প্রথমবার সেলিব্রিটি সোহম চক্রবর্তীকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। রেললাইন কবে হবে? প্রচারে বেরিয়ে এই প্রশ্নও শুনতে হয়েছে ওঁকে। জবাবে তিনি বলছেন,দুই সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং আবু তাহের খান পার্লামেন্টে বহুবার রেলপথের কথাতুলেছেন। কেন্দ্রকে বিঁধে সোহম বলেছেন, ‘কেন্দ্রের বক্তব্য যে এখানে রেলপথ তৈরি লাভজনক নয়। বিজেপির সরকার লাভ খুঁজছে। আর এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে সেটা দেখতে পাচ্ছে না।’
ঘাসফুল শিবিরের সেলিব্রিটি প্রার্থীকে প্রত্যন্ত করিমপুরবাসী কীভাবে নেবে তা নিয়ে নানা চর্চা হয়েছিল। কিন্তু বিগত এক মাসের প্রচারে সেলিব্রেটি তকমা ঝেড়ে ফেলে নতিডাঙা থেকে চরমুক্তারপুর পর্যন্ত কখনও টোটোয়, কখনও হেঁটে চষে বেরিয়েছেন। একদিকে রাজ্য সরকারের উন্নয়ন এবং অন্যদিকে করিমপুর নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বঞ্চনাকে প্রচারের হাতিয়ার করেছেন। টলিউডের অভিনেতাকে কাছে পেয়েযুবক-যুবতীরা সেলফির আবদার করেছেন। সোহমও তা মিটিয়েছেন। তৃণমূলের এক নেতার কথায়, ‘সেলিব্রিটি প্রার্থীকে দেখতে মানুষের উৎসাহকে ইভিএম পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াই আমাদের কাজ।’
সোহম বলেন, ‘মানুষের ভালো সাড়া পাচ্ছি। এসআইআরে বিজেপি চক্রান্ত করে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। সেখানে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করতে দিল্লি ছুটে যাচ্ছেন। মানুষ সবটাই দেখছেন। বিজেপি যেভাবে করিমপুরকে বঞ্চিত করে রেখেছে, তার জবাব মানুষ দেবে।’
অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ ২০১১ সালে করিমপুরেরসিপিএমের বিধায়ক ছিলেন। ২০১৬ সালে মহুয়া মৈত্রের কাছে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। তারপর দলবদল করে ২০২১ সালের বিজেপির টিকিটে তৃণমূল প্রার্থী বিমলেন্দু সিংহ রায়ের কাছে পরাজিত হন। টানা পরাজয়ের হ্যাটট্রিক এড়ানো তাঁর কাছে একপ্রকার মর্যাদার লড়াই। তাই তিনিও চুটিয়ে প্রচার করছেন। সমরেন্দ্রবাবু বলেন, ‘গত দু’ বার তৃণমূল ভোট চুরি করে জিতেছিল। করিমপুর-২ ব্লকে ভোট হতে দেয়নি। এবার সেখানেও বিজেপি ভালো ভোট পাবে। করিমপুরবাসী জানেন যে, বিজেপি জিতলেই রেলপথের স্বপ্ন পূরণ হবে। তাই মানুষ বিজেপিকেই ভোট দেবে।’
ভোটের পাটিগণিত বলছে, করিমপুর বিধানসভায় দু’টি ব্লক রয়েছে। করিমপুর-১ ব্লকের ৮টি পঞ্চায়েত এবং করিমপুর-২ ব্লকের ৬টি পঞ্চায়েত। এই কেন্দ্রের ৩৮ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক যেকোনো রাজনৈতিক দলের জিয়নকাঠি। আর এই সংখ্যালঘু ভোটের সিংহভাগটাই রয়েছে করিমপুর-২ ব্লকের পঞ্চায়েতগুলোতে। গত লোকসভা নির্বাচনে করিমপুর-১ ব্লকে তৃণমূলের থেকে বিজেপি অনেকটাই এগিয়েছিল। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে করিমপুর বিধানসভায় তৃণমূল ১২,৩২৩ ভোটে লিড পায় এবং একুশের বিধানসভা নির্বাচনে ২৩,৫৭৫ ভোটে তৃণমূল জয়ী হয়েছিল। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই বিধানসভায় একুশের তুলনায় চব্বিশে সিপিএমের ভোট ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাম-কংগ্রেস আলাদাভাবে লড়াই করছে। তাই ভোট কাটাকাটির অঙ্ক কিছুটা চিন্তায় ফেলেছে ঘাসফুল শিবিরকে।