উজ্জ্বল পাল, বিষ্ণুপুর: পেটের ব্যামো সারাতে স্বপ্নাদেশ পেয়ে বিষ্ণুপুরের ভড়ায় পুজো প্রচলন করেছিলেন জমিদার গোপাল মণ্ডল। পুজো চালু করে তাঁর অসুখ যেমন সেরেছিল, তেমনই তাঁর ভাগ্যের চাকাও ঘুরে গিয়েছিল। খাজনা আদায়কারী থেকে তিনি জমিদারিত্ব পেয়েছিলেন। সেই থেকে প্রায় সাড়ে ৩০০বছর আগে চালু হওয়ায় পুজো আজও জমিদার বাড়িতে নিষ্ঠার সঙ্গে হয়ে আসছে। তবে আগেকার তালপাতার ছাউনি সরিয়ে ঠাকুর দালান হয়েছে। সেখানেই ধুমধাম করে পুজো হয়ে আসছে। আগেকার মতো নহবত না বসলেও সাবেকি পুজোকে ঘিরে মণ্ডল পরিবারের সদস্যরা ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে যখন ভাস্কর রাওয়ের নেতৃত্বে মল্লভূম বিষ্ণুপুরে বর্গি আক্রমণ হয়, তখন মল্লরাজের নির্দেশে কোতুলপুরের লাউগ্রাম থেকে পরিবার নিয়ে বিষ্ণুপুরের ভড়া গ্রামে চলে আসেন মণ্ডল পরিবারের আদি পুরুষ লুইধর মণ্ডল। বর্ধমান রাজার তালুক ওই ভড়া অঞ্চল তখন ছিল গভীর জঙ্গল ঘেরা। সেখানে বসবাস করত ‘ভড়’ নামক এক জনজাতি। তাঁরা কৃষি কাজ জানতেন না। জঙ্গলের পশু শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। লুইধরের পরিবার ভড়ায় বসবাস শুরু করার পর প্রথমদিকে তাঁদেরও একইভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে হত। কিন্তু, পরবর্তীকালে ভড়া এলাকা বিষ্ণুপুরের মল্লরাজার অধীনে আসা লুইধরের নাতি গোপাল মণ্ডলকে ওই এলাকার খাজনা আদায় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই সময় তিনি টানা পেটের সমস্যায় ভুগতে থাকেন। কোনো মতেই রোগ সারছিল না। ওই সময় একদিন রাতে বিষ্ণুপুর রাজাদের কুলদেবী মা মৃন্ময়ী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন, ভড়া গ্রামের বাড়িতে শক্তিপুজোর আয়োজন করতে। তখনো গোপাল জমিদার হয়ে ওঠেননি। তাই অর্থাভাব ছিল। তা সত্ত্বেও দেবীর আদেশ মেনে তিনি খড় ও তালপাতার ছাউনি দিয়ে দুর্গামন্দির করেন। পদ্মফুলের ভ্যাট ও চাষের গুড় দিয়ে ‘ভ্যাটনাড়ু’ বানিয়ে মায়ের প্রসাদ বানানো হয়। দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করার পর তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তার কিছুকাল পরেই তিনি ভড়া সহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি মৌজার জমিদারিত্ব লাভ করেন। তারপর থেকে ধুমধাম করে পুজো হয়। কালের নিয়মে জমিদারিত্ব চলে গিয়েছে। তবে এখনো জমিদারবাড়িতে রয়েছে আগেকার ভগ্ন নাটমন্দির। মণ্ডলবাড়ির সদস্যরা অনেকেই কর্মসূত্রে বাইরে চলে গিয়েছেন। তবু পুজোর সময় তাঁরা প্রায় সকলেই গ্রামে ফেরেন।
জমিদারবাড়ির সদস্যরা বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা জীব হত্যার বিরোধী ছিলেন। তাই পুজোয় চালকুমড়ো বলি হয়। পুজোর সময় পরিবারের বধূরা সাবেকি শাড়ি আর পায়ে আলতা রাঙিয়ে চৌদল নিয়ে স্থানীয় ‘সানবাঁধা’ সায়রের ঘাটে নবপত্রিকা আনতে যান।



