পঁচাত্তরটি গ্রামের একটাই পুজো, অযোধ্যার কোলে দেবীদুর্গার আরাধনায় আদিবাসীরা
  • ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দুর্বাদল চন্দ্র, ঝালদা: পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের চূড়ায় আদিবাসীদের দুর্গাপুজোয় জড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৭৫টি গ্রামের মানুষের আবেগ। থিমের চমক নেই, নেই চোখ ধাঁধানো আলো। তা সত্ত্বেও ভক্তি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এই পুজো হয়ে ওঠে অনন্য।

Advertisement

১৯৮১ সালে শুরু হয় এই পুজো। তার আগে পাহাড়ের উপরের গ্রামগুলির বাসিন্দারা পুজো দেখতে বাঘমুন্ডি, বলরামপুর, আড়ষা সহ পাহাড়ের নীচের বিভিন্ন যেত। শুরুতে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় পুজোর আয়োজন করা হলেও বর্তমানে সেখানে পাথরের তৈরি মন্দির গড়ে উঠেছে। অযোধ্যা, পুনিয়া হাসান, রাঙ্গা, তারপানিয়া সহ আশপাশের প্রায় ৭৫টি গ্রামের বাসিন্দা এই পুজোয় শামিল হন। ষষ্ঠী থেকেই শুরু হয় পুজোর আয়োজন। সপ্তমীর সকালে নারী-পুরুষ একসঙ্গে পাহাড়ের উপর মাঝিবাঁধ থেকে মায়ের বারি নিয়ে আসেন। বাঙালি রীতি মেনে পুজো হলেও তার প্রতিটি পরতে মিশে থাকে আদিবাসী সংস্কৃতির ছোঁয়া। সাবেকি একচালা প্রতিমা আর নিষ্ঠাভরে দেবী আরাধনাই এই পুজোর মূল আকর্ষণ। সপ্তমী থেকেই ভক্তদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। পর্যটকদের কাছেও এই পুজো বিশেষ আকর্ষণের।
শুধু পুজো নয়, উৎসবের দিনগুলিতে শরীরচর্চা ও যুবসমাজকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করতেও উদ্যোগী হন উদ্যোক্তারা। অষ্টমী ও নবমীতে আয়োজিত হয় বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা। পাহাড়ের বিভিন্ন গ্রাম ছাড়াও বাইরের এলাকার দলগুলি তাতে অংশ নেয়। সন্ধ্যায় ছৌ, পাতা ও দেশাই নাচ সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে ওঠে পাহাড়। ঢাক, ধামসা ও মাদলের তালে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। একাদশীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসব। পুজো কমিটির সম্পাদক আখিল সিং সর্দারের কথায়, ‘পাহাড়ের প্রায় ৭৫টি গ্রামের মানুষের জন্য এই একটিই দুর্গাপুজো। তাই পুজোর দিনগুলিতে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। ১৯৮১ সালে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, আজও তা একই নিষ্ঠায় চলে আসছে।’
কমিটির যুব সদস্য পেয়ারা মাছুয়ার বলেন, ‘আলোকসজ্জা, থিম না থাকলেও আমাদের পুজোর আনন্দে খামতি নেই। ফুটবল প্রতিযোগিতা ও আদিবাসী সংস্কৃতির নানা অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মণ্ডপে ভিড় করেন মানুষ।’
সব মিলিয়ে, অযোধ্যা পাহাড়ের চূড়ার এই পুজো মনে করিয়ে দেয়, দেবী আরাধনার আনন্দ ধনসম্পদ বা বাহ্যিক আড়ম্বরে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তরিকতা, ঐতিহ্য আর মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই যে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে, ৪৫ বছরের এই পুজো তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।  অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে দেবী পার্বতী। নিজস্ব চিত্র