দীপাবলির আনন্দ
  • ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রঙিন কাগজ আর আলো

Advertisement

উৎসব মানেই আলো আর আনন্দ। অনেকেই ভাবে, বাজি পোড়ালে তবেই আনন্দ হয়। কিন্তু এটা ভাবতে হবে, এমন কোনো আনন্দ আমরা করব না, যার জন্য বৃহত্তর সমাজের অনেকটা ক্ষতি হয়। শব্দবাজি ফাটানোর উপর তো সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েইছে। আতশবাজিতেও প্রচণ্ড বায়ুদূষণ হয়। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে, শ্বাসকষ্ট হয়। তাই দীপাবলিতে উচিত আলো দিয়ে ঘর সাজিয়ে আনন্দ করা। ঘর সাজানোর জন্য রঙিন কাগজও ব্যবহার করা যায়। ঘর সাজানোর কাজে পরিবেশের কথা চিন্তা করে প্লাস্টিকও বর্জন করা উচিত। প্লাস্টিক সহজে ধ্বংস হয় না। তাই আমাদের বাড়ির আশপাশ নোংরা করে। তাই ব্যবহার করতে হলে কাগজ ব্যবহার করাই উচিত। কালীপুজোয় এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে আশপাশের মানুষজন বিরক্ত হন। আমরা রংবেরঙের কাগজ ও আলো দিয়ে ঘর সাজাই। বাড়ির সামনেই পাড়ার পুজোর মণ্ডপ। সেখানে আনন্দ করি। কালীপুজো উপলক্ষ্যে গান, আবৃত্তির অনুষ্ঠান হয়। আমি প্রতি বছরই আবৃত্তি পরিবেশন করি। আমাদের বন্ধুদের শপথ, কখনোই বিপজ্জনক বাজি পোড়াব না।
—আরাধ্যা ঘোষ, পঞ্চম শ্রেণি

বাজির মজা

উৎসব ও পার্বণ আমাদের জীবনে আনন্দ নিয়ে আসে। দীপাবলি-কালীপুজো হোক বা অন্য কোনো উৎসব— বাজি পুড়িয়ে আমরা আনন্দ প্রকাশ করি। তার মানে বোঝা যাচ্ছে বাজি আমাদের আনন্দের অন্যতম অংশ। আতশবাজির রঙিন আলো সকলের মনেই এনে দেয় আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। তাই আমরা কালীপুজোর রাতে ফুলঝুরি, রংমশাল, তুবড়ি, চরকি পুড়িয়ে আনন্দ উপভোগ করি। বাবা-মা বা বড়ো কেউ থাকলে তবেই বাজি পোড়াই। কখনো একা একা বাজি পোড়াই না। আর শব্দবাজি কখনোই ফাটাই না। শব্দবাজির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন। শুধুমাত্র আইন করেই কোনো সামাজিক ব্যাধিকে ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নাগরিকদের সুস্থ বিবেচনা ও সচেতনতা। কারণ অতিরিক্ত শব্দে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষজনের প্রভূত অসুবিধা হয়। কাছাকাছি প্রচণ্ড জোরে বাজি ফাটলে কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সব সময় সতর্কভাবে বাজি পোড়ানো উচিত। যেখানে বাজি পোড়ানো হবে, সেখানে এক বালতি জল রেখে দেওয়া উচিত। কারণ, অসাবধানতাবশত কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত জল পাওয়া যাবে। সকলে নিরাপদ ও সুন্দর দীপাবলি পালন করুক, এই প্রার্থনাই করব।
—রিতৃমা ঘোষ, অষ্টম শ্রেণি

চোদ্দো শাখ, চোদ্দো প্রদীপ

 কালীপুজোর আগের দিন ‘ভূত চতুদর্শী’ নামে পরিচিত। এদিন নাকি ভূতেদের উৎপাত বাড়ে। এইদিন আমরা চোদ্দো শাখ খাই। সন্ধেবেলা বাড়িতে চোদ্দো প্রদীপ দেওয়া হয়। এই প্রদীপ দিয়ে বাড়ি সাজানোর কাজটি করতে আমার খুব ভালো লাগে। কালীপুজোর দিনটিতে তো অনেক প্রদীপ দিয়ে গোটা বাড়ি সাজিয়ে তুলি। অনেকে আলোকসজ্জার জন্য মোমবাতি ব্যবহার করলেও আমার কিন্তু প্রদীপই পছন্দ। কালীপুজোর দুপুর থেকে শুরু প্রস্তুতি। প্রদীপে সলতে দেওয়া, তেল ঢালা এই কাজগুলো সেরে রাখতে হয়। মায়ের সঙ্গে এই কাজগুলো সেরে রাখি। তারপর কোথায় কোথায় প্রদীপ বসালে দেখতে সুন্দর লাগবে, সেটা দেখে নিয়ে প্রদীপ বসিয়ে রাখি। সন্ধে হলে আমি আর মা প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে দিই। বন্ধ করে দিই ইলেকট্রিক। আমাদের গোটা বাড়ি প্রদীপের আলোকমালায় সেজে ওঠে। তারপর বাড়ির বড়োদের উপস্থিতিতে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে বাজি পোড়াই। আলো, হাসি আর মজায় ভরে ওঠে আমার দীপাবলি।
—সোমা পাল, দশম শ্রেণি

আলোর উৎসব

বাজি পোড়ানো দীপাবলির একটা অঙ্গ। দীপাবলি আলোর উৎসব। চারপাশ রঙিন আলোয় ভরে ওঠে। আতশবাজির আলোক বিচ্ছুরণ রাতকেও দিন করে দেয়। চারদিকে আনন্দের হিল্লোল। তবে, যেকোনো উৎসবের আনন্দ তখনই সার্থক, যখন পরিবেশ ও অপরজনের নিরাপত্তার কথা মনে থাকবে। তাই বাজি পোড়ানোর সময় পরিবেশের কথা মাথায় রাখতে হবে। আনন্দের অজুহাতে এমন কিছু করা উচিত নয় যে, যাতে পরিবেশের কোনো রকম ক্ষতি হয়। শুধু মানুষ নয়, পশু-পাখিরও যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে নজর রাখা উচিত। তাই সমস্ত বিধিনিষেধ মেনে সকলে দীপাবলির আনন্দে মেতে উঠুক, এই কামনাই করি।
—সায়েদা হানিফা মুবাসসিরা, অষ্টম শ্রেণি

আলোর মালা

 বাজি ছোটোদের অত্যন্ত প্রিয়। কিছু বাজি আছে আকাশে উঠে আলোর মালা তৈরি করে। সেগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে। এই জন্যই সারা বছর কালীপুজোর জন্য অপেক্ষা করে থাকি। ফুলঝুরি আর তুবড়ি পোড়াতে আমার খুব ভালো লাগে। লাল, সবুজ আলো হয়, এমন ফুলঝুরিও কিনি। আর চিরাচরিত চেনা ফুলঝুরি তো আছেই। আমাদের পাড়ার একটি কাকা ভালো তুবড়ি তৈরি করতে পারেন। বলেন, ‘অ্যালুমিনিয়াম চূর্ণ দিলে তুবড়ি থেকে সাদা আলো ছিটকে পড়ে।’ এবারের দীপাবলিতে আলোকের ঝরনা ধারা ছড়িয়ে পড়ুক এই আশাই রইল।
—জয়িতা আদক, অষ্টম শ্রেণি

ব্রাহ্মণপাড়া চিন্তামণি ইনস্টিটিউশন, জগৎবল্লভপুর

 দেশ সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু সমাজ পরাধীনতার আঁচ থেকে মুক্ত হয়নি। ছড়িয়ে আছে কুসংস্কার, অশিক্ষা। একই পরিস্থিতি হাওড়ার জগৎবল্লভপুরেও। এখানকার হাতেগোনা কয়েকটি মানুষ পেয়েছেন শিক্ষার আলো। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্বর্গীয় সাতকড়ি কুণ্ডু। তিনিই কয়েকজন শিক্ষানুরাগীর সহযোগিতায় তৈরি করেন একটি সহপাঠক্রমিক বিদ্যালয়। সেটা ১৯২৩ সাল। ওই গ্রামের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পেল। সহশিক্ষার অনুমোদন থাকলেও প্রাথমিক বিভাগেও মেয়েদের পাঠাতেন অভিভাবকরা। চেষ্টা করেও ১৯৪৩, ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ শিক্ষাবর্ষে দু’-একটি ছাত্রী ভরতি হলেও ধরে রাখা যায়নি। ১৯৬৬ সালে প্রাতঃকালীন বালিকা বিভাগ চালু হতে শ্রেণিকক্ষ পূর্ণ হতে লাগল। এই গ্রামে মেয়েরাও শিক্ষার আলো পেল। সে সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন শিবরাম বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এবং বহু শিক্ষানুরাগীর প্রচেষ্টায় এবং খোদনময়ী বেজের দান করা জমিতে তৈরি হয় ‘খোদনময়ী ভবন’। এটি মেয়েদের ক্লাস করার জন্য ব্যবহৃত হত।
পরবর্তীকালে বেশ কিছু বিশিষ্ট মানুষের উদ্যোগে ও সরকারি সাহায্যে তৈরি হয় মেয়েদের জন্য নতুন ভবন। ১৯৯৮ সালে জগৎবল্লভপুরের শঙ্করহাটিতে ওই ভবন গড়ে তোলা হয়। গুমাডাঙ্গি, আয়মাচক, ঘোড়াদহ, পাঁতিহাল, নরেন্দ্রপুর, ভুড়শুট সহ দূর-দূরান্ত থেকে এই স্কুলে মেয়েরা আসে। বর্তমানে ছাত্রী সংখ্যা ১ হাজার ৬০০। তবে, বেশিরভাগ ছাত্রীই ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার।
শিক্ষিকাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, অভিভাবক ও গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে স্কুলের। রেজাল্টও বেশ ভালো। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শেষ হয়েছে হীরক জয়ন্তীর সমাপ্তি অনুষ্ঠান।
ছাত্রীদের পড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিকাশে নজর দেওয়া হয়। তবে, স্কুলের একাদশ শ্রেণিতে রয়েছে শুধু কলা বিভাগ। বিজ্ঞান বিভাগ ও ভোকেশনাল কোর্স চালু হলে এখানকার মেয়েদের দূরে যেতে হয় না। আশা করি, স্কুলের বিভিন্ন সমস্যা কাটিয়ে তুলতে সরকারি সহ নানা স্তরের মানুষের সাহায্য পাব। এই স্কুল গৌরবের সঙ্গে এগিয়ে যাবে।
—তন্দ্রাবতী সিট, টিচার-ইন-চার্জ
সংকলক: শম্পা সরকার
ছবি: দীপেশ মুখোপাধ্যায়