মাটির নীচে সাম্রাজ্য!
  • ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বরূপ কুলভী: আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে নেপোলিয়ন, সামরিক শক্তির জোরে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা। সেই অভিযান দেখেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। ঝরেছে বহু রক্ত। এ তো গেল ইতিহাসের কথা। কিন্তু এই সময় দীর্ঘদিন ধরে সবার চোখের আড়ালে গড়ে উঠেছে এক সুবিশাল সাম্রাজ্য। তার ব্যাপ্তি পর্তুগাল থেকে ইতালি। ইউরোপের চার-চারটি দেশের উপকূল বরাবর মাটির নীচে এই সাম্রাজ্য তৈরি করেছে একদল পিঁপড়ে। ৬ হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই উপনিবেশ সমগ্র প্রাণী জগতের মধ্যেই সবচেয়ে বড়ো।

Advertisement

এমনিতে পিঁপড়ে সামাজিক প্রাণী। দলবদ্ধভাবে বড়োসড়ো কলোনি বা উপনিবেশে তারা বসবাস করে। সেখানে রানি পিঁপড়ে, পুরুষ পিঁপড়ে, কর্মী বা শ্রমিক পিঁপড়েরা নিজেদের নির্দিষ্ট কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করে। নিজেদের কলোনি রক্ষার জন্য তারা দলবদ্ধভাবে লড়াই করে। পৃথিবীতে পিঁপড়েদের প্রায় ১৪ হাজারের বেশি প্রজাতি ও উপপ্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীদের অনুমান, পিঁপড়েদের মোট প্রজাতির সংখ্যা ২২ থেকে ২৫ হাজার হতে পারে। এরমধ্যে অন্যতম হল আর্জেন্তাইন পিঁপড়ে। বৈজ্ঞানিক নাম লাইনপিথেমা হুমাইল। পিঁপড়েদের এই প্রজাতি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। এদের আবাসস্থল ছিল দক্ষিণ আমেরিকা ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে। তবে এরা এখন সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপে এদের কীর্তি গবেষকদের নজর কেড়ে নিয়েছে। একটি গবেষণা রিপোর্ট সম্প্রতি ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল সায়েন্সেস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এমনিতে পিঁপড়েদের প্রজাতিগুলি সচেষ্ট থাকে যে, তাদের নিজস্ব ঢিবিগুলি যেন কোনো মতেই প্রতিবেশী কলোনি গ্রাস করে নিতে না পারে। কিন্তু পর্তুগাল থেকে ইতালি পর্যন্ত বিস্তৃতি সাম্রাজ্যে বিরল চিত্র ধরা পড়েছে। এখানে মিলেমিশে একে অপরের সঙ্গে রয়েছে তারা। সেখানে পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ  বাসায় কোটি কোটি পিঁপড়ে রয়েছে। তাদের একে অন্যের সঙ্গে কোনো শত্রুতা নেই। এর ফলেই তারা একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। যেন হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে থাকা একটা ভূগর্ভস্থ শহর।
আর্জেন্তাইন পিঁপড়েদের মাটির নীচের নেটওয়ার্ক বা বাসা অত্যন্ত বিশাল। সাধারণ পিঁপড়ে তো দূরের কথা, পৃথিবীর অন্যতম বড়ো পিঁপড়ের বাসাও এর কাছে নস্যি। মধ্য আমেরিকার লিফ কাটার পিঁপড়েদের একটা একটা বাসা টেনিস কোর্টের মতো বড়ো হতে পারে। কিন্তু আর্জেন্তাইন পিঁপড়েদের একে অপরের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ এই নেটওয়ার্কের কাছে তা কিছুই নয়। 
ইউরোপের উপকূল বরাবর এই কলোনি তৈরি করেছে আর্জেন্তাইন পিঁপড়েরা। আর এর বাড়বাড়ন্তের নেপথ্যে রয়েছে এখানকার আবহাওয়া। এখানে হালকা শীত আর শুষ্ক গ্রীষ্মকাল এই পিঁপড়েদের বাসা বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ। বহু বছর ধরে শহর, চাষের খেত, উপকূল অঞ্চলের নীচে মানব চক্ষুর অন্তরালে ওই কোটি কোটি পিঁপড়ে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বাসা তৈরি করেছে।
অন্য পিঁপড়েরা নিজেদের এলাকা দখলে রাখার জন্য অন্য ঢিপি বা কলোনির সঙ্গে লড়াই করে। সেখানে এই নেটওয়ার্কে এক কলোনির সঙ্গে অন্য কলোনির বাসিন্দাদের লড়াই হচ্ছে না কেন? গবেষকদের অনুমান, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা এই পিঁপড়ে সমাজের সদস্য সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাদের চেষ্টাতেই এই নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে এদের ডিএনএ ও শরীরের রাসায়নিকের গন্ধ একই রকম। সেজন্য ভিন্ন ভিন্ন বাসার পিঁপড়েরা একে অপরকে শত্রু মনে করে না। তাই মারামারি নেই। 
গবেষকরা বলছেন, উনবিংশ ও বিংশ শতকে এই পিঁপড়েগুলি ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলিতে পৌঁছায়। সেখান থেকে মাটি, নার্সারির চারাগাছ ও নির্মাণ সামগ্রীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ঘরবাড়ি, পার্ক, উচ্ছিষ্ট খাবার এদের বাড়বাড়ন্তের সহায়ক হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হল, বিদেশ থেকে আসা পিঁপড়ের বিস্তার স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে কি প্রভাব ফেলতে পারে? উত্তর হল— হ্যাঁ। এদের দাপটে উৎখাত হয়ে যাচ্ছে স্থানীয় পিঁপড়ের দল। এই স্থানীয় পিঁপড়েদের সাহায্যে অনেক গাছের বীজ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেগুলি পিছু হটার ফলে এক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও ফসল ও গাছের পক্ষে ক্ষতিকারক কিছু পোকাকে শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করে আর্জেন্তাইন পিঁপড়ে। কারণ, ওইসব পোকার শরীরের মিষ্টি তরল এই পিঁপড়েদের খাবার। এর ফলে ওইসব বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে এবং এর ফলে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।
এই আর্জেন্তাইন পিঁপড়েদের জন্য স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব? বিজ্ঞানীদের দাওয়াই, পিঁপড়েদের কলোনির বিস্তার আটকানোই একমাত্র পথ। এক্ষেত্রে কীটনাশক ছড়ালে বিশেষ কোনো কাজ হবে না। কোনো বাসা কীটনাশকে ধ্বংস হলেও পরে এর প্রভাব কমে গেলে পাশের বাসার পিঁপড়ে তা দখল করে ফেলবে।