অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: কাটোয়ার ঘোড়ানাশ গ্রামজুড়ে এখন দিনরাত শুধুই খটাখট শব্দ। তাঁত চলছে। দুর্গাপুজোর বাকি আর মাসখানেক। ইতিমধ্যে ঘোড়ানাশ গ্রামের তাঁতিদের হাসি চওড়া হয়ে উঠেছে। শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির ঘরণি নীতা আম্বানির সংস্থা ‘স্বদেশি’-র মোটা টাকার বরাত এসেছে তাঁদের কাছে। মালবেরি সিল্কের শাড়িতে ফুটিয়ে তুলতে হবে সিংহবাহিনী দেবী দশভুজার ছবি। আর তা হবে হস্তচালিত তাঁতের মাধ্যমে। দেড়শোর বেশি এ ধরনের শাড়ি তৈরি করতে নাওয়া খাওয়া ভুলে লেগে পড়েছেন গ্রামের তাঁত শিল্পীরা। এক একটি শাড়িতে দেবী দুর্গার ছবি ফুটিয়ে তুলতে পারলেই নগদ ৫০ হাজার টাকা মজুরি। এই শাড়িগুলি পুজোর আগেই পৌঁছে যাবে দেশ ও বিদেশের মহিলাদের কাছে। এই বরাত বাংলার বর্তমান তাঁতশিল্পের মৃতপ্রায় বাজারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
শুধুই সিল্কের শাড়িই নয়, বাংলার জামদানি শাড়িতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণর রাসলীলাও ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে হস্তচালিত তাঁতে। তবে সেগুলি শাড়ি হিসেবে নয়, ব্যবহৃত হবে ওয়াল হ্যাঙ্গিং হিসেবে। এরকম দুশোরও বেশি ওয়াল হ্যাঙ্গিংয়ের বরাত দিয়েছে নীতা আম্বানির সংস্থা। বাংলার প্রাচীন পটচিত্রের আদলে ফুটে উঠবে শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা। জামদানি শাড়ি বাঙালির অহংকার ও গর্ব। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রেম ও প্রতিবাদের প্রতীক। এই দুয়ের মেলবন্ধনে ভারতের বহুত্ববাদী সত্তাকে তুলে ধরতে চাইছেন তাঁতশিল্পীরা। এই কাজে মোটা টাকা আয় হচ্ছে তাঁতশিল্পীদের। ‘স্বদেশি’-র এই উদ্যোগ বাংলায় ধুঁকতে থাকা তাঁত শিল্পে প্রাণ সঞ্চার করবে বলে মত জামদানি শিল্পীদের।
সাড়ে ছ’ মিটার লম্বা মালবেরি সিল্কের শাড়িজুড়ে ফটে উঠছে মা দুর্গার অবয়ব। এক একটি শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগছে দেড় থেকে দু’ মাস পর্যন্ত। ভিন্ন রঙের শাড়ির আঁচলজুড়ে মা দুর্গা, শাড়িতে জমিতে থাকছে পদ্মফুল ও সিংহ। এতদিন এসব কাজ শুধু খাদি জামদানিতেই শোভা পেত। এখন সিল্কের প্রচলন বেড়েছে বলেই এমন কাজের বরাত বেশি আসছে বলে মত শিল্পীদের। ঘোড়ানাশ গ্রামের তাঁতশিল্পী বরুণকুমার পাল বলেন, আমি শ্রীকৃষ্ণ থিমের উপর যেমন শাড়ি বুনছি, পাশাপাশি সিল্কের উপরেও মা দুর্গা বুনছি। এতে আমাকে মজুরি দেওয়া হচ্ছে পঞ্চাশ হাজার টাকা করে। তাঁতশিল্পী রাঘবেন্দ্র সুন্দর দাস বলেন, আগে আমরা ফাইন খাদি সুতোর মধ্যে নানা নকশা ফুটিয়ে তুলতাম। এবার আমরা পিওর মালবেরি সিল্কের উপর দুর্গা মূর্তি ফুটিয়ে তুলেছি। স্বদেশি ভাবনা থেকেই এই কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জামদানির উপর শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলাও ফুটিয়ে তুলে ওয়াল হ্যাঙ্গিং করছি। প্রাচীনকালের সূক্ষ্ম মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসাবে জামদানি শাড়ি বাঙালি মহিলাদের কাছে পরিচিত ছিল। মসলিনের উপর হাতে করে নকশা ফুটিয়ে তুলে জামদানি শাড়ি তৈরি করা হয়। পুরানো দিনের বাংলার তাঁতশিল্পীদের হাতে তৈরি জামদানি হারিয়ে যেতে বসেছিল। এখন সেই জামদানির পাশাপাশি সিল্কের কদরও বাড়ছে। কাটোয়া ২ ব্লকের জগদানন্দপুর পঞ্চায়েতের ঘোড়ানাশ, মুস্থলী গ্রামের দীর্ঘবছর ধরে অনেক মানুষ তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। এখানকার শিল্পীদের হাতের কাজ বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশ ও বিদেশের বাজারে সমাদৃত। বিশ্ববাজারের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাঁরা দিনরাত এক করে তৈরি করছেন স্কার্ফ, খাদি, মসলিন, জামদানি শাড়ি। মুঘল আমলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা জামদানি এক সময়ে হারিয়ে গেলেও ইদানিং ফের বাংলার শিল্পীদের হাত ধরে সমাদর ফিরে পাচ্ছে।-নিজস্ব চিত্র