হিমাংশু সিংহ: তাঁর অনশনমঞ্চের দিকে দু’দিন আগেও সরকারের তাকাবার জো ছিল না। দাবি মেনে শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা তো দূর অস্ত! সতর্ক উপেক্ষা আর অবহেলায় ভরে ছিল চারপাশ। সোনাম ওয়াংচুককে যেকোনো মূল্যে বাঁচাতেই হবে, আদালতের গুঁতো খেয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে শেষে বলপূর্বক নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে! কুড়ি পার করে একুশ দিনের মাথায়। মোদি সরকার বুঝেছে, তাঁর স্বাস্থ্যের আর সামান্য অবনতি হলে, জীবন সংশয় হলে জনগণ ছেড়ে কথা বলবে না। দ্রুত ছড়াবে প্রতিবাদ। আরশোলারা বড্ড দ্রুত ছড়ায়। সেই ভয় থেকেই তাঁকে অনশনমঞ্চ থেকে সটান তুলে নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে। নিয়ে যাওয়ার সময় একজন মন্ত্রীকেও দেখা গেল না কেন? এই মুহূর্তে সফদরজং হাসপাতালে তিনি। ওজন কমেছে প্রায় সাড়ে ৯ কেজি। মাল্টি অর্গান ফেলিওর রুখতে ডাক্তররা তাঁর ভাইটাল প্যারামিটারগুলি পরীক্ষা করছেন। কিন্তু আচমকা পুলিশ তুলে নিয়ে গেলেও তাঁর অনশনের উদ্দেশ্য সফল। দেশজুড়ে একটাই আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, সোনামকে বাঁচাতেই হবে, দাবিপূরণ করতেই হবে। আবার নিঃস্বার্থ লড়াই, আন্দোলনের ময়দানে দেখতে চাই তাঁকে। সরকার বধির হলেও এখানেই তাঁর জিত। যিনি তথাকথিত গদি দখলের লোলুপ বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে নিরস্ত্র, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অভিঘাতে আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিতে পেরেছেন অনায়াসে। নিঃশব্দে জাতির মেরুদণ্ডে বইয়ে দিয়েছেন লুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রতিবাদের অনাবিল স্রোত!
স্বার্থপর গড়াপেটার রাজনীতির গড্ডলিকা প্রবাহে দেশজুড়ে ওই একটা কথাই শতকণ্ঠে ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হয়েছে বিগত ৭২ ঘণ্টায়। অশক্ত শরীরেও গতকাল তিনি অনশনমঞ্চে শুয়ে বলছেন, সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। ওইদিন সংসদ অভিযান। শেষ দেখতে চান। সঙ্গে সবাইকে শামিল হওয়ার আহ্বান। যদি শরীর না চলে, কিছু হয়ে যায় ‘ভূত’ হয়ে ফিরে আসবেন দাবি আদায়ের লড়াইয়ে। এই নাছোড় স্পিরিট আজকের সুযোগসন্ধানী ক’জন বাজারি বিরোধী নেতার আছে? তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও ওই আপসহীন লড়াইয়ের মৃত্যু নেই। আজকের বিরোধীরা প্রতিনিয়ত ভোটের হিসাব কষছেন, আর কোন ডালে বসলে পকেট ভরতি থাকবে তার আঁকিবুকি কাটছেন। সঙ্গে ফাউও আছে। পুলিশ, সিবিআই, ইডি তাড়া করবে না বাড়িতে, অফিসে সামাজিক চৌহদ্দির দু’শো ঠিকানায়। বরং জুটবে ‘চারখান’ সশস্ত্র দেহরক্ষী। এত সামান্য চাওয়া? এরাই উন্নয়নের কারিগর, দেশের দশের ভবিষ্যৎ। বাহ রে আমাদের ৭৬ বছরের গৌরবময় সংবিধান ও গণতন্ত্র! বড্ড জানতে ইচ্ছে করে, ভারতের অন্তরাত্মাকে জীবন্ত ফুটিয়ে তোলার মুহূর্তে বি আর আম্বেদকর কি অপারেশন লোটাসের দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন শয়নে জাগরণে!
২৮ জুন লাদাখের শিক্ষাবিদ সন্তানের অনশনের শুরু থেকেই জুটেছিল শুধুই উপেক্ষা। গত কয়েকদিনে স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতেই সেই উদাসীনতাই বদলে গেল মিডিয়ার হেডলাইনে। ব্যাস টনক নড়ল সরকারের কেষ্টবিষ্টুদের। কারণ তিনি ভিতর থেকে একটা নিঃশব্দ নাগরিক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন যে এই তিন সপ্তাহে। আর তাতেই বিচলিত কেন্দ্রীয় সরকারের হুঁশ ফিরেছে। কেননা এত উপেক্ষা সত্ত্বেও আচমকাই তিনি তথাকথিত রাজনীতিবিদদেরও কয়েক যোজন পিছনে ফেলে দিয়েছেন। সততার বড়াই নয়, দুর্নীতি খতমের মেকি আস্ফালন নয়, ধান্দাবাজদের সেটিংয়ের ঘেরাটোপে থাকা মেরুদণ্ডহীন সমাজে অতর্কিতে প্রতিবাদের ঝড় তুলে দিয়েছেন লাদাখের ৫৯ বছর বয়সি এই প্রবীণ। বাক্যবাণে নয়, বাজারি অভিনয়েও নয়, নিজেকে অনশনে রেখে শরীরকে বিপন্ন করার হার না মানা জেদে।
একাধারে শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও সমাজকর্মী। তাঁর দাবি একটাই, সর্বভারতীয় ডাক্তারি কোর্সে প্রবেশিকা নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় মাথায় নিয়ে কেন্দ্রের শিক্ষামন্ত্রীকে গদি ছাড়তে হবে। যে কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক দেশেই এই দাবি তোলা অবিবেচকের কাজ বলে গণ্য হওয়ার কথা নয়। নিট কোনো হেলাফেলার পরীক্ষা নয়। আগামী দিনে যাঁদের হাতে নাগরিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব তাঁদের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের পক্ষে চরম ব্যর্থতার সূচক। কেউ দায় নেবেন না? গত এক মাস ধরে বারবার শোনা যাচ্ছে মন্ত্রিসভার রদবদলে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। কিন্তু ওইটুকুই। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে ফিরেছেন তাও প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল। দু’দিন বাদেই সংসদের গুরুত্বপূর্ণ বাদল অধিবেশনের শুরু। এখনও সরকার কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। বিরোধীরাও তথৈবচ। পাছে গেরুয়া সরকার রুষ্ট হয়, তারই ফলস্বরূপ মধ্যরাতে ইডি ফুলে ফেঁপে ওঠা নেতার খোঁজে মেহগনি কাঠের দরজায় টোকা দেয়, এই আতঙ্কে বিরোধী দলগুলি যে কথা মাথা উঁচু করে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ, সেই প্রায় লুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রতিবাদকে পাথেয় করেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন ‘থ্রি ইডিয়টসে’র র্যাঞ্চো। সোনামের আরও দাবি, যে মাটি থেকে তাঁর উত্থান সেই লাদাখকে ষষ্ঠ তফসিলের মর্যাদা দিতে হবে। লাদাখের যে তল্লাটে ওয়াংচুকের জন্ম সেই আলচিতে পরিবেশ পরিস্থিতি সারা বছর মোটেই অনুকূল নয়। অধিকাংশ সময়টাই বরফে ঢাকা। গ্রীষ্মে পানীয় জলের তীব্র সংকট। এই প্রতিকূলতাকে সঙ্গে নিয়েই তাঁর স্কুল শিক্ষা শুরু হয় দেরিতে, ৯ বছর বয়সে। কিন্তু প্রকৃত মেধাকে কখনো আটকে রাখা যায় না। শ্রীনগরের এনআইটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং সফল গবেষক। কিন্তু সব ছাড়িয়ে এক সংবেদনশীল সমাজকর্মী যিনি সরকারের হুকুম তামিল করার জন্য বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের জীবনকে বিপন্ন করতেও পিছপা নন।
একথা ঠিক, বড়ো বড়ো সংবিধান সংশোধনী বিল পাশের জন্য প্রয়োজনীয় ‘অপারেশন লোটাস ৩৬০’-এর অংশ নন তিনি। নির্বাচনি রাজনীতির মুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর সংশ্রবের কথাও কারও জানা নেই। তবু দীর্ঘ উপেক্ষার পরও সরকার এবং বিরোধী সবারই টনক নড়ছে। বিশেষ করে বিরোধীদের। উচ্চকিত হাইভোল্টেজ রাজনীতির যুগেও লাদাখের প্রত্যন্ত এলাকার এক শিক্ষাবিদের নীরব অনশন দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। মোক্ষম শিক্ষা দিয়েছে। কারণ তথাকথিত পাওয়ার পলিটিক্স বলতে আমরা যা বুঝি তার অংশ নন তিনি। মন্ত্রীসান্ত্রি হওয়ার দাবিদারও নন। স্বভাবতই সরকার পক্ষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। আর ইন্ডিয়া জোট তো ছন্নছাড়া। আগেই বলেছি, তিনি সক্রিয় রাজনীতির মানুষ নন। অমায়িক শিক্ষাবিদ ও প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী। কাশ্মীরের বরফ ঠান্ডায় যাতে কর্মরত সেনা জওয়ানরা একটু স্বস্তি পান সেই লক্ষ্যেই একটু উষ্ণতার জন্য তৈরি করেছেন সোলার প্যানেল। -৩০ ডিগ্রিতেও ওই সোলার প্যানেল জওয়ানদের গরম রাখে। লাদাখের পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ে কাজ করার ফাঁকে বরফের স্তূপ থেকেই গ্রীষ্মের জলের চাহিদা পূরণের পথও বাতলেছেন নিজস্ব প্রযুক্তি সংক্রান্ত প্রজ্ঞা দিয়ে। পরিবেশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্য ২০১৮ সালে ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পান তিনি। ২০১৯ সালে কাশ্মীরকে দু’টুকরো করার কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন তাঁকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি মোদি সরকারকে ধাক্কা দেয়। থ্রি ইডিয়টসের র্যাঞ্চোর সঙ্গে বাস্তবের মাটিতে পরিচয় হয় ভারতবাসীর। লাদাখে আন্দোলনরতদের উপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে চার জনের মৃত্যুতে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে নরেন্দ্র মোদি সরকার জাতীয় নিরাপত্তা আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি যোধপুরের জেলে বন্দি ছিলেন। প্রায় ৬ মাস তাঁকে কারা অন্তরালে রেখেও প্রতিবাদী মনটাকে খতম করতে পারেনি নরেন্দ্র মোদি সরকার। তাঁর স্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। শীর্ষ আদালতের কড়া মনোভাব আঁচ করেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক তাঁর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। তামাম বিরোধী নেতানেত্রীকে ছাপিয়ে গিয়েছে তাঁর নীরব শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। তাঁর আন্দোলন জনমানসে ঢেউ তোলার পর এখন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ওমর আবদুল্লাও যন্তরমন্তরে কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা ফেরতের দাবিতে আন্দোলনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ বিরোধীরা দেরিতে হলেও বুঝতে পারছেন সোনাম পথ দেখিয়েছেন। মরা গাঙে ঢেউ তুলে একটা কথা বুঝিয়ে দিয়েছেন, সবাইকে কিনে নিলেই প্রতিবাদের মৃত্যু হয় না। হতে পারে না। এই স্পিরিট যদি স্বীকৃত বিরোধী দলগুলির থাকত, তাহলে জাতীয় রাজনীতি আজকের মতো একপেশে হয়ে যেত না।
৪২ বছর আগে লাদাখে সোনামের বাবার অনশনমঞ্চে ছুটে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ফলের রস খাইয়ে তাঁর অনশন ভেঙেছিলেন। উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। সেই রক্তই বইছে পুত্রের শরীরেও। পণ্ডিত নেহরুর আমলে ৫৮ দিন টানা অনশন করে মৃত্যু বরণ করেছিলেন শ্রীরামালু। কিন্তু তাঁর দাবি পূরণ করে জন্ম হয়েছিল নতুন অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের। সৎ নাছোড়বান্দার নিঃস্বার্থ প্রতিবাদ কখনো বিফলে যায় না। সোনাম ওয়াংচুকের নিজের জীবন বাজি রেখে এই কুড়ি দিনের অনশনও দেশের তামাম বিক্রি হয়ে যাওয়া বিরোধী শক্তিকে নতুন পথের সন্ধান দেবে। হাসপাতালে শুয়ে এই শিক্ষাই দিয়ে গেলেন লাদাখের অকুতোভয় শিক্ষাবিদ বিজ্ঞানী। তাঁকে নমস্কার।