মাঝে মাঝে মনে হতে পারে, বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি সরকারগুলির মধ্যে কি কোনো অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে! কে কত দ্রুত হিন্দুত্ববাদীদের কর্মসূচি রূপায়ণ করে আরএসএস কিংবা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বাহবা আদায় করে নেবে—তার প্রতিযোগিতা। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি দলের নতুন সরকারের বয়স আড়াই মাস। এরই মধ্যে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার কার্যত সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট বার্তাকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে উপেক্ষা করতে শুরু করে দিয়েছে! অন্তত অভিযোগ তেমনই। না হলে যে বিতর্কে ইতিমধ্যেই জল ঢেলে দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত, তাকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রীতিমতো বিজ্ঞপ্তি জারি করার সাহস দেখায় কী করে একটি নতুন সরকার! আসলে দেশজুড়ে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর শুরুর সময় থেকেই আরএসএস-বিজেপির পক্ষ থেকে কৌশলে বার্তা দেওয়া হচ্ছিল যে ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে সেই ব্যক্তির নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে। এই কৌশলী প্রচারের লক্ষ্য যে সংখ্যালঘুরা—তা বোঝাও খুব কঠিন ছিল না। গত বছর বিহারে এসআইআর চলাকালীন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, ভোটার তালিকায় নাম না থাকার সঙ্গে নাগরিকত্ব থাকা, না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু তারপরেও অভিযোগ, এরাজ্যে সরকারে এসে শাসকগোষ্ঠী বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, যাঁদের ভোটার তালিকায় নাম নেই, তাঁরা সরকারের সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না! তখনই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি সরকার তাঁদের অ-ভারতীয় মনে করছে? এ প্রসঙ্গে একটি মামলা হওয়ায় নির্বাচন কমিশন, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক ও নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
দেশে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে বিরোধ বা বিতর্ক দেখা দিলে এর ফয়সালা করার অধিকারী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। অপরদিকে, ভোটার তালিকায় কার নাম থাকবে, কার নাম সংযোজিত হবে— তা ঠিক করে নির্বাচন কমিশন। নাগরিকত্ব ও ভোটার নিয়ে এই গোড়ার কথাটা গত মে মাসে ফের স্মরণ করিয়ে দিয়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেছিল, নির্বাচন কমিশন নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে পারে না। শুক্রবার অন্য একটি মামলায় বিচারপতিরা বলেন, আমাদের রায় স্পষ্ট ছিল। এসআইআর-এ নাম না থাকা মানে নাগরিকত্ব হারানো নয়। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক সংস্থা হলেও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার অধিকারী নয়। মামলাটি করেছেন পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসু। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এ বাদ পড়া ব্যক্তিদের আবেদনের শুনানি দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ করার দাবিতে আবেদন জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদ ও সুরক্ষার দাবিও তোলা হয়েছে আবেদনে।
নাগরিকত্ব নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এমন পরিষ্কার রায় থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অন্নপূর্ণা যোজনার কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, বিগত সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে ভূরি ভূরি অভিযোগ ছিল। দেখা যাচ্ছে, সিএএ বা এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়াদের অনেকে ট্রাইবুনালে আপিল করেননি। এমন প্রায় ৩০ লক্ষ নাম রয়েছে। এঁরা স্থায়ীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছেন। তাঁরা অন্নপূর্ণার টাকা পাবেন না। তবে যাঁরা সিএএতে এবং ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন তাঁদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অনুদান পাবেন। এ কথায় মানুষ আশ্বস্ত হয়েছিলেন। এখানে বলা প্রয়োজন, আপিল বা ট্রাইবুনালে আবেদনকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৪ লক্ষ (১৩ এপ্রিল পর্যন্ত)। কাজ এমন ধীর গতিতে চলছে যে এর মধ্যে মাত্র ৩৮ হাজারের নিষ্পত্তি হয়েছে। তার মানে, সব আপিলের ফয়সালা হলে (কতদিনে হবে কেউ জানে না) আরও কিছু নাম বাদের তালিকায় যুক্ত হতে পারে। কিন্তু তার আগেই আশ্চর্যজনকভাবে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে ট্রাইবুনালে বিচারাধীনদের অনেকেই নাকি বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছেন! বাতিল হচ্ছে তাঁদের রেশন কার্ডও। বিচারের আগেই কেন সরকার এমন ‘অমানবিক’ হচ্ছে তা তাঁরা জানেন না। ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’-এর স্লোগান দিয়ে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তাদের এহেন ভূমিকায় অজানা আশঙ্কায় ভুগছেন অনেকেই। অবশ্য ভরসা জুগিয়েছে শীর্ষ আদালত। কেন এসআইআর-এ বিচারাধীনদের অন্নপূর্ণা প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া বা রেশন কার্ড বাতিল করা হচ্ছে তার জবাব চেয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে নোটিস পাঠিয়েছে। প্রশ্নের মুখে নতুন সরকার। উঠছে স্বচ্ছতার প্রশ্নও। পরিষেবা বন্ধের ফতোয়া জারির পিছনে অন্য কোনো মতলব কাজ করছে কি না তা নিয়েই সংশয়। রাজ্যের সামাজিক প্রকল্পের উদ্দেশ্যই হল মানুষকে সুরাহা দেওয়া। তাই প্রশ্ন জাগছে, তাহলে কি সরকারের চোখে এরা অ-ভারতীয়? মামলাকারীর আইনজীবী তথ্য দিয়ে সরকারের এই ভূমিকার কথা জানানোয় সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা জানান, ভোটার তালিকায় নাম বাদ গেলে কেউ সরকারি প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হবেন, এমন রায় তাঁরা কখনোই দেননি। আসলে নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার, ভোটার আর নাগরিকত্বের মধ্যে পার্থক্য রাজ্যের নতুন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা জানেন না তা নয়। তবু তা উপেক্ষা করার কারণ সম্ভবত একটাই— দলীয় কর্মসূচি পালনের বাধ্যবাধকতা।