ভারতে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতালের তরফে নির্দিষ্ট আর্থিক প্যাকেজ অফার করা হয়। এটি একটি মন্দের ভালো ব্যবস্থা। কারণ, রোগী বা তাঁর পরিবার অনুমান করে নিতে পারেন রোগমুক্তিসহ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে একজনের মোট কত খরচ হতে পারে। তার মধ্যে রোগনির্ণয়ের নানাবিধ পরীক্ষা, বেড ভাড়া, অপারেশন, ওষুধ-পথ্যসহ অপারেশন-পরবর্তী চিকিৎসা খরচও তার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। মোদ্দা কথা, হাসপাতালে রেখে সম্পূর্ণ চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ সবল হয়ে একজন রোগীর বাড়ি ফেরা পর্যন্ত যাবতীয় খরচই চিকিৎসার প্যাকেজ বলে গণ্য হয়। কিন্তু বাস্তবে এই সুবিধা বেশিরভাগ হাসপাতালে মেলে না। প্যাকেজ দেখে ভরসা পান অনেকে। কেননা উপযুক্ত বা পর্যাপ্ত অঙ্কের স্বাস্থ্য বিমা থাকলে তেমন দুশ্চিন্তা হওয়ার কথা নয়। এর বাইরেও দু-পাঁচ পার্সেন্ট টাকা দরকার হতে পারে বলে ধরে নেওয়া হয়। টাকাপয়সা জোগাড়ও করা হয় সেইমতো। কিন্তু চিকিৎসা শেষে, এমনকী মাঝপথে পৌঁছেও কিছু হাসপাতাল বুঝিয়ে দেয় যে প্যাকেজ একটি কথার কথা। রোগীকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরাবার বাস্তব খরচ তার চেয়ে অনেক বেশি! হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একের পর এক ‘ক্ষুদ্র অক্ষরের মাহাত্ম্য’ ঝুলি থেকে বের করতে থাকে। পেশেন্ট পার্টির বিস্ময়ের জবাবে তারা দাবি করে, প্যাকজ সবসময়ই শর্তসাপেক্ষ। তারা উল্টে চাপসৃষ্টি করে এই বলে যে, ‘প্যাকেজ ভালো করে পড়ে নেননি কেন? ওর মধ্যেই সব সবিস্তারে বলা আছে!’ বেসরকারি হাসপাতালে বড় কোনও রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বস্তুত এইভাবে বেশিরভাগ সময়েই রোগীর পরিবারকে যুগপৎ বোকা বনে যেতে হয় এবং শেষমেশ চরম অসহায়তাও জোটে।
প্রিয়জনের প্রাণ বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট পরিবারের তখন দিশেহারা অবস্থা হয়। ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে এবং গয়নাগাঁটি বেচেও কূলকিনারা পাওয়া যায় না। অনেকে বাধ্য হন ভিটেমাটি বেচে দিতে এবং চড়া সুদের হারে ঋণও নিতে। এ কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, এমন অমানবিক কাণ্ড প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ঘটেই চলেছে। রাজ্য স্বাস্থ্য কমিশনেও এমন অভিযোগ দায়ের হয়েছে বিস্তর। কিছু ঘটনায় তারা কড়া ব্যবস্থাও নিয়েছে নানা সময়ে। কিন্তু তারপরও বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতালের অমানবিক কারবার বন্ধ হয়নি। তারা শোধরায়নি বিন্দুমাত্র। মানুষের দুর্দশা বহাল যথাপূর্ব! কিন্তু বাংলায় চলছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানবিক সরকার। তারা এই অন্যায় আর বরদাস্ত করতে রাজি নয়। তাই আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষকে পূর্ণ সহায়তা দিতে আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য। কড়া বিল আনছে তারা। এই বিলের প্রতিপাদ্য হাসপাতালের তরফে অফার করা প্যাকেজের বাইরে এক টাকাও রোগীর কাছে দাবি করা যাবে না। ঘোষিত প্যাকেজের অঙ্কের মধ্যেই পুরো চিকিৎসা পরিষেবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিতে বাধ্য থাকবে। চলতি বিধানসভা অধিবেশনেই আনা হচ্ছে এই সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল। বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমগুলি প্যাকেজের বাইরে যাতে কানাকড়িও নিতে না-পারে, তা নিশ্চিত করতেই কড়া আইনি সংস্থান থাকছে ওই বিলে।
নিয়ম লঙ্ঘনে দোষী হাসপাতাল বা নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে আইনানুসারে কঠোর পদক্ষেপ করতে পারবে রাজ্য প্রশাসন। ‘সেবা বিক্রি হয় না, সেবা দিতে হয়’—বেসরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এই কথা আগেই জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল, ‘আপনারা ব্যবসা করছেন করুন কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফার জন্য বিলের বহর বাড়াবেন না।’ তারপর থেকে বেসরকারি হাসপাতালগুলির দিকে কড়া নজর রেখে চলেছে রাজ্য স্বাস্থ্য কমিশন। এতসবের পরও চিকিৎসা খরচ নিয়ে, আরও নির্দিষ্টভাবে বলা চলে, প্যাকেজের বাইরে মোটা টাকা গুনে নেওয়া সংক্রান্ত ভূরি ভূরি অভিযোগ সামনে আসছে। এই আবহেই আসছে ‘দি ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ২০২৫’ বিল। দেখতে হবে, বিলটি যেন দ্রুত আইনে পরিণত এবং কার্যকর হয়। তাহলে রাজ্যবাসী যে সুরাহা পাবেন তা হবে অভূতপূর্ব। এজন্য মানবদরদি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁরা আজীবন কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই স্মরণ করবেন।