Bartaman Logo
২৮ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

মহালয়ায় তর্পণের মাহাত্ম্য

মৃত্যুর মধ্যে মানুষের জীবনের এই সুকঠোর সত্য লেগে আছে যে, সংসারে তাকে আর সেইরূপে কখনও ফিরে পাওয়া যাবে না। মৃত্যুর পর থেকে যায় প্রিয়জনদের ঘিরে নানান টুকরো স্মৃতি।

মহালয়ায় তর্পণের মাহাত্ম্য
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০

সোমব্রত সরকার: মৃত্যুর মধ্যে মানুষের জীবনের এই সুকঠোর সত্য লেগে আছে যে, সংসারে তাকে আর সেইরূপে কখনও ফিরে পাওয়া যাবে না। মৃত্যুর পর থেকে যায় প্রিয়জনদের ঘিরে নানান টুকরো স্মৃতি। মৃত্যু একটি অমোঘ কাহিনিও লেখে জীবনের— প্রিয়জনের সমস্ত ত্রুটি মুছে দেয়, তার কান্তস্বরূপ আমাদের মনের মধ্যে ফুটিয়ে তোলে। মনকে অন্তর্মুখী করতে শিখলে, চলে যাওয়া প্রিয়জনের ওই কান্তরূপকে অবলম্বন করে স্মৃতির ভেতর দিয়ে অনায়াসে তার কাছে পৌঁছনো যায়।

Advertisement

সাধকেরা ভগবান লাভের প্রথম সোপান হিসেবে ভক্তকে নিজের মনে বিগ্রহের কোনও একটি প্রিয়রূপকে ফুটিয়ে তোলবার কথা বলেন। মৃত্যুর পর যে রূপ আজ চোখের আড়ালে গেছে, ভাবরূপে সে বিরাজ করে মনে! মনের রূপে প্রিয়জনের সঙ্গে চির-মিলনে জীবনের চরম সার্থকতা ঘটে মানুষের।
মহালয়া হল মৃত্যুতে অবগাহনের তিথি। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় বলেছেন, ‘মহা আলয়’ থেকে মহালয়া কথাটি এসেছে। আলয় অর্থাৎ আশ্রয়। মহালয়া শব্দটিকে স্ত্রীবাচক অর্থ হিসেবে ব্যবহার করে শাস্ত্রবিদেরা বলেন, এই দিনে পিতৃপক্ষের অবসান হয়। অমাবস্যার অন্ধকার দূর হয়ে আলোকময় দেবীপক্ষ আসে। দেবী দুর্গাই হলেন মহা আলয়— আশ্রয়।
সাধকেরা বলেন, মহা লয় থেকে মহালয়া। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমার দিন সূর্য উত্তরায়ণের চরম বিন্দুতে এসে মেশে। সেদিন সূর্যের আলো সবথেকে বেশি থাকে। আলো ঝলমল সুদীর্ঘ দিন। আর দিন ফুরলে মস্ত চাঁদের আলোকোজ্জ্বল পূর্ণিমা। এদিন উত্তরায়ণের শেষ। তারপর শুরু হচ্ছে দক্ষিণায়ন।
উত্তরায়ণে যখন দিনের আলো বাড়তে থাকে, মানুষের মধ্যকার শুভচেতনাও এ সময় সুপ্তাকারে মনের ভেতর বড় হতে থাকে। আষাঢ়ী পূর্ণিমা একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, এই দিন সূর্যের আলো সবচেয়ে বেশি থাকে বলে যাঁরা আদিত্যের উপাসক, তাঁরা এই তিথিটিকে অমৃতত্বের প্রাপক বলে ধরে নেন। তারপর শুরু হয়ে গেল দক্ষিণায়ন।
আলোতে যে চেতনার উপচয় ঘটেছিল মানুষের মনে, তাকে আর ধরে রাখা যায় না। প্রকৃতিতে এই আলো বেড়ে ও কমে আসার ঘটনাগুলো মানুষের দেহের মধ্যেও ঘটে।
জীবনের প্রথম পর্যায়ে প্রাণ যৌবনের দিকে কী তাড়াতাড়ি উজিয়ে যায়! এক সময় আসে, জরা এসে আক্রমণ করে বসে মানুষের দেহকে।
সাধকেরা একমাত্র পারেন জরা ও মৃত্যুকে জয় করতে। দক্ষিণায়নের অন্ধকার বৃত্তির সম্মুখে তাঁরাই দাঁড়িয়ে পড়েন। রুখে দিতে পারেন জরা। তাঁরা বলেন, স্বধা। নিজের মধ্যে নিজে থাক। দেহে জরা নামছে, নামতে দিও না। বল, তুমি অজর অমৃত— এই ভাবনায় তোমার চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে রাখ।
পিতৃগণেরা জরা রোখবার সাধনা শিখিয়ে গেছেন মানুষকে। ঋগ্বেদে দু’ধরনের পিতৃগণের কথা রয়েছে। মর্ত পিতৃগণেরা সূর্যের আবর্তনের সঙ্গে ঘুরে চলেছেন। আর যাঁরা আবর্তন রুখে দিতে জানেন, তাঁরাই দিব্য পিতৃগণ। এঁরাই অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এঁদের সাধনধারার নাম মহালয়া। দক্ষিণায়নের অমাবস্যার তিথির নামও তাই মহালয়া। মহানির্বাণের তিথি।
শ্রীশ্রীচণ্ডী পুঁথিতে মহালয়া বলতে পিতৃলোককে বোঝানো হয়েছে। বৈদিক ভাবনার মর্ত পিতৃগণদের অর্থাৎ জরা-মরণে জীবন থেকে সরে যাওয়া পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে আমরা মহানির্বাণের দিন মহালয়ায় শ্রদ্ধা নিবেদন করি, মনে করি। তাঁদের উদ্দেশে তর্পণ করি।
সংস্কৃত ‘তৃপ’ শব্দ থেকে তর্পণ কথাটি এসেছে। তৃপ কথার মানে তৃপ্তি বা সন্তুষ্টি। দেবতা, ঋষি, আচার্য, গুরু এবং মাতৃকুল ও পিতৃকুলের পূর্বপুরুষদের তুমি তৃপ্ত কর, সন্তুষ্টি দান কর। এঁরা সকলেই বিদেহী। দেহ ছাড়াও বর্তমান আছেন।
আচার্য, গুরু ও দেবতাদের সূক্ষ্মতত্ত্বের কথাবার্তা আমাদের শাস্ত্রাদির ভেতর রয়েছে। আমাদের দেহটার গ্রন্থিমোচন হয়ে গেলে আমরা ধরতে পারি অস্থি-চামড়ার মধ্যে চার ধরনের অস্তিত্ব খেলে বেড়াচ্ছে। আচার্য বা গুরুই জানেন পূর্বের history and past life — অতীত জীবনের সমস্ত কথা। তিনিই শুধু সংস্কার বদলাতে পারেন।
Highest ideal reach — ভগবত সাক্ষাৎকার তাঁরই ঘটেছে। আচার্য, গুরুরাই মানুষের হাত ধরেই সংস্কার বদলে দেন। যেদিকে সংস্কারের বেগ, সেদিকে ছেড়ে সূত্র ধরে রাখেন নিজের হাতে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘যেমন মাছ নিয়ে খেলে— প্রথমে সুতো ছেড়ে দেয়, পরে অবশ হলে টেনে তোলে, তেমনি করেন সদগুরু।’
সংস্কার বদলালে দেহের মধ্যকার চারটি ভাগ পরিষ্কার ধরা যায়। বাইরের জগৎ নিয়ে মানুষের যে অত্যধিক মাতামাতি, হইহই, হট্টমেলা— সমস্তটাই স্থূলদেহের কাজ। মন যখন পড়াশোনাসহ নানান ধরনের সৃজনশীল কাজকর্মে গিয়ে বসল, বিচারশক্তির প্রখরতা বেড়ে গেল মানুষের, এটাই সূক্ষ্মদেহের অস্তিত্ব।
মনে যখন সমস্তরকমের বাহ্য সৃষ্টির কাজ দমে গেল, আকাশের মতো ব্যস্ত ও অনন্ত হয়ে গেল বোধ, কারণদেহ প্রকট হয়ে উঠল মানুষের। যখন সমাধিস্থ অবস্থা সাধকের, ওটাই মহাকারণদেহ। মানুষ চলে গেলেও মহাকারণ অস্তিত্বের বিলয় হয় না ধরে মহালয়ার মহানির্বাণের কালে তর্পণের বিধি দেওয়া হয়েছে শাস্ত্রে।
মৃত্যুর পরও মানুষের অস্তিত্ব নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তার কৃতকর্মের সঞ্চিত অদৃষ্ট দ্বারা। এই অদৃষ্টের প্রতিরূপ হিসেবে কঠোপনিষদের মধ্যে অমরাত্মা যমের কথা বলা রয়েছে।
তিনিই প্রথম মানুষ, যিনি মৃত্যুকে বরণ করেও অমর হয়েছিলেন। এজন্যই তর্পণের ভেতর যম তর্পণেরও একটি দিক ধার্য করা হয়েছে শাস্ত্রে।
কেবলমাত্র মৃত পূর্বপুরুষদের জন্য তর্পণ করার নিয়ম শাস্ত্রাদির ভেতর দেওয়া হয়নি। তর্পণ করতে হবে পৃথিবীর সমস্ত মানুষজনের সামগ্রিক সুখ, সমৃদ্ধি, স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করে। তর্পণের মন্ত্রে সে কথা বলে দেওয়া হয়েছে, ‘তৃপ্যন্ত্ত সর্বমানবা।’
মানুষদের তৃপ্ত করার জন্য তর্পণ। মহালয়ার এই লগ্নে যাঁদের কেউ নেই, তাঁদেরও স্মরণ করা হচ্ছে তর্পণের মন্ত্রে, ‘যাঁরা আমাদের বন্ধু নন, যাঁরা জন্মান্তরে আমাদের বন্ধু ছিলেন, যাঁরা আমাদের কাছে জলের প্রত্যাশা করেন, তাঁরা সম্পূর্ণরূপে তৃপ্তি লাভ করবেন।’
তিনটি পক্ষের কথা বলা রয়েছে শাস্ত্রে। পিতৃপক্ষ, দেবীপক্ষ ও প্রেতপক্ষ। পিতৃপক্ষের শেষে মহালয়ার সাধনা। মহামৃত্যুতে অবগাহন। মৃত্যুতে ঝাঁপ দিয়ে সাধক চলে যাচ্ছেন অমৃতের কুলে। এইটি দেবীপক্ষের সাধনা। কোজাগরী পূর্ণিমার দিন এ সাধনাও শেষ হয়ে যাবে।
ঘটবে আরও এক উত্তরণ। মৃত্যু ও অমৃত দুটো এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে। সিদ্ধচেতনা জাগবে সাধকের মনে। এই পর্যায়টির নাম প্রেতপক্ষ। দীপান্বিতা অমাবস্যার দিন এ সাধনা শেষ হলে সাধকেরা শিবের মতো মৃত্যুঞ্জয় হয়ে উঠবেন।
গয়াতে বিষ্ণুর যে পরমপদ রয়েছে, ওটাই হল মানুষের প্রেতে উত্তরণ— লোকোত্তরে অবগাহন। ওখানে দিন-রাত কিছু নেই। সৎ-অসৎও নেই।
বিষ্ণুর নাম ভগ। ভগ হলেন জনসাধারণের দেবতা। সবাইকার আরাধ্য ভগবান। বিষ্ণু, ভগ বা আদিত্য। এই হল মানুষের জীবনের প্রত্যক্ষ সূর্য অর্থাৎ আলোর বলয়। এর মধ্যে কত কত অন্ধকার, অবিদ্যার নাশ করে তাকে এগতে হয়।
মানুষের এগনোর পথটি দেবকৃত্য। শক্তির মধ্যে দিয়ে তা নিষ্পন্ন হচ্ছে বলে অসুর-ঘাতিনী মহাশক্তির পুজো হচ্ছে দেবীপক্ষে।
চণ্ডীতের অন্ধকার বিলয়ের কথা আছে। প্রথমে রয়েছে রাত্রিসূক্ত। দিবাসূক্ত কিন্তু নেই। রয়েছে দেবীসূক্ত, ‘বিনাশেন মৃত্যুং তীর্ত্বা’।
মানুষ মৃত্যুকে মানছে না বলে পিতৃপক্ষে পূর্বপুরুষদের ডেকে আনছে, আহ্বান করছে। তর্পণ করছে জীবনে কোনও ভালো কাজ করবার আগে পূর্বপুরুষদের। এই ভাবনা নিয়ে শাস্ত্রপুঁথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তর্পণের প্রথা।
জনমেজয় বললেন, ‘ভগবান, ভোগাবসনে সবাই কি নিজের নিজের প্রকৃতিতে লীন হন? সকালকার কেমন গতি লাভ হয়?’ মহাভারতের স্বর্গারোহণ পর্বে এই জিজ্ঞাসার উত্তরে বৈশষ্পায়ন বললেন, ‘মহারাজ, কর্ম শেষ হলে সবাই যে নিজের নিজের প্রকৃতি পায়, ব্যাপারটা অমন নয়। এগুলো দেবগুহ্য বিষয়। আমি ভগবান কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের মুখেই শুনেছি, মহাত্মা ভীষ্ম মৃত্যুর পর গিয়েছেন বসুলোকে। মহাবীর কর্ণ প্রবেশ করেছেন সূর্যের শরীরে। এমন করে মানুষেরাও লোক কিংবা দেহপ্রাপ্ত হয়।’ কর্ণ মৃত্যুর পর সূর্যের শরীরে প্রবেশের আগে জোর একটা ধাক্কা খেলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মারা যাওয়ার পর কর্ণ পৌঁছলেন স্বর্গরাজ্যে। সেখানে তাঁকে খাদ্য ও পানীয় হিসেবে দেওয়া হল রাশি রাশি ধনসম্পদ।
থালায় ভরা সোনা, রূপা, হীরে, জহরত দেখে প্রশ্ন তুললেন কর্ণ, ‘আমাকে খাবার দাবার হিসেবে এমন সব বিচিত্র জিনিস দেওয়া হচ্ছে কেন?’ পিতৃলোকের অধিপতি ধর্মরাজ তাঁকে বললেন, ‘তুমি সারাজীবন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলে যে! নিজের শক্তি ও পরাক্রম দেখানোর কী প্রবল বাসনা ছিল তোমার। রাজ্য, সম্পদ, নারীর প্রতি খালি মনোযোগ। তুমি সবসময়ের জন্য ব্যস্ত ছিলে যুদ্ধক্ষেত্রে। একবারের জন্যও কি তুমি কখনও তোমার পূর্বপুরুষদের আত্মার কথা চিন্তা করেছ? তাঁদের তৃপ্তির জন্য জল তর্পণ করেছ?’
কর্ণ বললেন, ‘ধর্মরাজ, এ দোষ আমার নয়। মা আমাকে জন্ম দিয়ে ত্যাগ করেছেন। ছুতোর সম্প্রদায়ের মানুষ অধিরথ ও তাঁর স্ত্রী রাধা আমাকে মানুষ করেছেন। দুর্যোধন রাজ্যের অধিপতি করে আমার জন্মকে হেয় প্রতিপন্ন করা পাণ্ডবদের মুখ বন্ধ করেছেন। বীর যোদ্ধাদের সমকক্ষ হয়েও প্রতি পদক্ষেপে আমি অপমানিত হয়েছি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে আমি প্রথম কৃষ্ণের মুখে জানলাম আমার বংশ পরিচয়। যুদ্ধ আরম্ভ হল। সতেরো দিনের মাথায় আমার মৃত্যু ঘটল। আপনি বলুন, মৃত পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে জল তর্পণ করার সময় আমি কখন পেলাম?’
ধর্মরাজ বললেন, ‘মর্তে যাও তুমি, কর্ণ। তোমার মৃত পিতৃপুরুষেরা অতৃপ্ত রয়েছেন। তাঁদেরকে জল প্রদান করে তুমি স্বর্গে ফিরে এসো। তখন এখানকার খাদ্য ও পানীয় তুমি লাভ করতে পারবে।’ যমরাজের নির্দেশে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপ্রতিপদ তিথিতে কর্ণ আবার মর্তে ফিরে এসে এক পক্ষকাল থেকে পিতৃপুরুষদের জল তর্পণের মাধ্যমে নিজের পাপস্খলন করে স্বর্গে ফিরে গেলেন। এই বিশেষ সময়কালকে শাস্ত্রে পিতৃপক্ষ বলা হয়েছে। পিতৃপক্ষের শেষ দিন মহালয়া।

সম্পর্কিত সংবাদ