স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: বাইরে থেকে দেখলে মনে শুধুমাত্র বাঁশের বুননে মণ্ডপসজ্জা। প্রবেশের লাইন বেয়ে ভিতরে যতই ঢোকা যাবে, ততই এই ভাবনা বদলে যাবে। অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশে নজর কাড়বে। আঁধারির মধ্যে থেকে ইতিউতি উঁকি দেবে বিন্দু বিন্দু আলোর ঝলকানি। সঙ্গে চারিদিকে রহস্যময় সুর। ঐশ্বরিক পরিবেশে মাতৃরূপকে দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপনা করতে প্রস্তুত পাটুলির কেন্দুয়া শান্তি সংঘ। ঠিক উলটো দিকে যাত্রাশুরু সংঘ। সেখানে আবার মায়ের অভয়া রূপ। প্রতিমার হাতে নেই কোনও অস্ত্র। পদ্মফুলের উপর বিরাজমান দশভুজা। মণ্ডপের অন্দরমহলে পঞ্চদুর্গার মূর্তি।
পাটুলি বৈষ্ণবঘাটায় দু-পাড়ায় টানটান লড়াই। দুটি মণ্ডপেই প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে লোহা। তবে তার প্রয়োগে তফাত রয়েছে। ৬৭তম বর্ষে পদার্পণ করল পাটুলির অন্যতম শো-স্টপার কেন্দুয়া শান্তি সংঘ। এবারে শিল্পী সুশান্ত শিবানী পালকে সঙ্গী করে দুর্গাপুজোতে কোমর বেঁধেছেন উদ্যোক্তারা। এবারে তাদের থিম ‘নিগূঢ়’। রহস্যের জালে বাঁধা পড়েছে মণ্ডপ থেকে শুরু করে মাতৃপ্রতিমা। রহস্যময় অন্দরমহল বেয়ে ঢুকলেই দেখা যাবে মায়ের বিরাট রূপ। প্রায় ৪০ ফুট উঁচু দশভুজা এখানে উড়ন্ত। তাঁর পরিবারেও একইভাবে বিরাজমান। গোটা মণ্ডপটি ঘুরতে ঘুরতে মাকে দেখতে পাবেন দর্শনার্থীরা। একেবারে শেষ পর্যায়ে গেলে তাঁদের চোখ আটকাবেই। বিশাল আকৃতির চাঁদ। মণ্ডপ থেকে একটি রাস্তা উঠে গিয়েছে রহস্যে ভরা সেই দুনিয়ায়। সেই দৃশ্য বন্দি করতে হাতে উঠে আসবেই পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটা। পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত বলেন, ইতিমধ্যেই আমাদের পুজো নিয়ে দর্শকদের মধ্যে উন্মাদনা ধরা পড়েছে। প্রতিমা আর চাঁদটাই এবছরে আমাদের ইউএসপি, যা দর্শক টানার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নেবে। পাড়ার পুজোর এই আকর্ষণকে কোনওভাবে ভিড়ের মধ্যে দেখতে নারাজ স্কুল পড়ুয়া দেবদত্ত মণ্ডল। তাই মাকে নিয়ে মণ্ডপ প্রাঙ্গণে হাজির কিশোর। ঠাকুরের রূপ দেখে মুগ্ধ সে। আর তার মায়ের বক্তব্য, শিল্পী দারুণ বানিয়েছেন। চাঁদটাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে দেখতে ইচ্ছে করে।
আলো-আঁধারি ঘেরা মণ্ডপ থেকে বের হয়েই কিছুটা স্নিগ্ধ প্রতিমা দর্শন করতে দর্শনার্থীদের হাঁটতে হবে মেরে কেটে ৫-৭ মিনিট। বৈষ্ণবঘাটার লক্ষ্মীনারায়ণ কলোনিকে পুজোর আবহে জমজমাট করে তুলেছে যাত্রাশুরু সংঘ। এবারে তাদের থিম ‘আবহমান’। খানিকটা সাবেকি ঘরানায় তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। লোহার কাঠামোর উপর শাড়ির কাপড় দিয়ে বিভিন্ন নকশা দিয়ে সেজে উঠেছে যাত্রাশুরু প্যান্ডেল। ঢুকেই নজরে আসেব প্রকাণ্ড মায়ের মুখাবয়বের রেপ্লিকা। লোহার শিক দিয়ে সেই অবয়ব তৈরি করেছেন শিল্পী শিবাংশু ভট্টাচার্য। আরেকটু এগোলেই দর্শনার্থীরা ঢুকে পড়বেন মণ্ডপের মূল অন্দরমহলে। চারিদিক থেকে ঝুলছে কাচ, প্রতিটির প্রতিচ্ছবিতে ধরা পড়বে মূল মাতৃমূর্তি। যে মূর্তি বাহিরমহলে থাকা দুর্গা মুখাবয়বের রেপ্লিকার আদলে তৈরি। অভয়ারূপী দুর্গা শান্তির বাণী পৌঁছে দিতে প্রস্তুত দর্শনার্থীদের কাছে। প্রতিমার রূপ দিয়েছেন প্রশান্ত পাল। ভাবনা শিল্পী শিবাংশু জানিয়েছেন, থিমের মোড়কে খোঁজা হয়েছে পুরোনো দিনের সেই বনেদিবাড়ির দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য। মণ্ডপ ঢুকতে ঢুকতে দর্শক আচ্ছন্ন হবে ধ্রুপদি সংগীতের সুরে। সঙ্গে ঘুমুরের স্বর—যা দর্শককে পৌঁছে দেবে এক অলিখিত, হারিয়ে যাওয়া সময়ে। অন্যদিকে, পূর্ব পুঁটিয়ারি সর্বজনীন দুর্গোৎসবের এবারের থিম ‘দায়বদ্ধ’। উদ্যোক্তাদের দাবি, ‘দায়বদ্ধ’ মানে আমাদের দায়িত্ব, আমাদের প্রতিশ্রুতি। মায়ের এই আগমনে আমরা যেন প্রতিজ্ঞা করি ভেদাভেদ ভুলে, বিভাজন দূরে সরিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গড়ে তুলি ভালোবাসা আর সৌহার্দের এক পৃথিবী। থিম শিল্পী স্বরূপ নন্দী বলেন, এখানে নেই কোনও রাজনৈতিক রং, নেই কোনও বিভাজনের দেওয়াল। একতার আবহে আয়োজিত হয় মহামিলনের মহোৎসব।