


পি চিদম্বরম: “সবকিছু যেন একে একে এসে জমা হচ্ছে। শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখন বেশ নড়বড়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’-এর উন্মাদনার দৌড়ে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের এই সময়ে আমরা জ্বালানি তেলের অন্যতম প্রধান আমদানিকারক দেশ। আর এর উপর রয়েছে ‘এল নিনো’র প্রভাব মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের বিষয়টিকে সরকার যতটা গুরুত্ব ও আবেগ দিয়ে দেখে—ঠিক ততটাই গুরুত্ব দিয়ে তাদের ভাবা উচিত কীভাবে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ দেশে ফিরিয়ে আনা যায়—সম্ভবত কর ছাড়ের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে। বেসরকারি বিনিয়োগ এখন থমকে গিয়েছে। কারণ বিভিন্ন সরকারি বিধিবিধান এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলির কড়াকড়ির কারণে গ্রাউন্ড লেভেল ব্যবসার পরিবেশ এখনো বেশ প্রতিকূল। আশাবাদী এবং হতাশাবাদী—উভয় পক্ষকেই বারবার হতাশ করে চলেছে ভারত। বিশ্বের শেয়ার বাজারগুলির মধ্যে আমাদের বাজারটি এখনো দ্বিতীয় বা তৃতীয় সর্বোচ্চ দামি (এক্সপেনসিভ) রয়ে গিয়েছে। এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।” (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১২ মে, ২০২৬)
কথাগুলি আমার নয়। তাই যাঁরা আমাকে নিয়ে ট্রোল করেন, তাঁরা এবার নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। এটি রুচির শর্মার একটি বিবৃতি (তিনি ‘দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ নেশনস’, ‘হোয়াট ওয়েন্ট রং উইথ ক্যাপিটালিজম’ প্রভৃতি গ্রন্থের প্রণেতা)। এটি মূলত বিজেপি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এক কঠোর অভিযোগনামা। তবে স্বীকার করছি যে, আমিও ঠিক একই সুরে আমার মতামত প্রকাশ করে এসেছি—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, বিদেশি পুঁজি ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা, ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রতিকূলতা এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা—প্রভৃতি বিষয়ে। এই বিষয়গুলি সাধারণ মানুষের অগোচরেই রাখা হয়েছিল। সংসদীয় ক্ষেত্রে এবং জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিতর্কের সময় অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে সেগুলিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
কোণঠাসা অবস্থায়
চারটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ঠিক একসপ্তাহ পর—যখন সরকার কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল—তখনই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকারোক্তি করেন। সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা ও ভুলত্রুটির দায়ভার হিসেবে—জনগণের কাছে ‘ত্যাগ স্বীকার’ করার আহ্বান জানান মোদি।
বাস্তব পরিস্থিতি বা কঠোর সত্যগুলি হল:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের জোট বনাম ইরানের মধ্যকার যুদ্ধটির তিনমাস পূর্তি আগামী ৩১ মে। অথচ এই যুদ্ধ সমাপ্তির কোনো লক্ষণ এখনো স্পষ্ট নয়।
পশ্চিম এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ বা অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৭ মার্কিন ডলারের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে।
ভারতীয় মুদ্রা বা রুপির মান এখন সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯৫.৭০ টাকা!
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খুচরো মূল্য সূচক (সিপিআই) ভিত্তিক মুদ্রাস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৩.৫ শতাংশে এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির হার পৌঁছেছে ৪.৩ শতাংশে। ডোমেস্টিক বা গৃহস্থের ব্যবহার্য এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯১৩ টাকা এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ৩০৭১-৩২৩৭ টাকা। পাইকারি মূল্য সূচক (ডব্লুপিআই) ভিত্তিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৮.৩ শতাংশ।
এপ্রিল-ডিসেম্বর, ২০২৫ সময়কালে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল: প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)— সামান্য ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বৈদেশিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ/পোর্টফোলিয়ো বিনিয়োগ (এফআইআই/এফপিআই)—ঋণাত্মক ৪.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বেসরকারি মূলধন বিনিয়োগের প্রস্তাবিত বা অভিপ্রেত পরিমাণ ছিল মোট ৬.৬ থেকে ৬.৮ লক্ষ কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সোনা আমদানির আর্থিক মূল্য ছিল ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এমজিএনআরইজিএস (মনরেগা বা ১০০ দিনের কাজ) মারফত বছরে গড়ে ৫০ দিন কাজের সুযোগ পেতেন শ্রমিকরা। সেটি বাতিল হয়ে যাওয়ার পর গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য বর্তমানে মজুরি-ভিত্তিক কর্মসংস্থানের আর কোনো কর্মসূচি অবশিষ্ট নেই।
প্রধানমন্ত্রী একদম ঠিক
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি বেশকিছু আরজি রেখেছেন। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী খেয়াল করেননি যে তাঁর মন্ত্রীরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে চরম উদাসীন ছিলেন। তাই জনগণের কাছে সরাসরি আবেদন জানানো ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। সোনা আমদানি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিতে হবে কৃচ্ছ্রসাধন বা মিতব্যয়িতার পথ। জ্বালানি, রান্নার তেল এবং সারের ব্যবহারে অবশ্যই সংযম দেখাতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি ছাড়তে হবে—প্রভৃতি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আসলে যা করা দরকার ছিল, তা হল তাঁর সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ।
জ্বালানি খরচের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সবচেয়ে বেশি অমিতব্যয়ী: বিভিন্ন উদ্বোধন অনুষ্ঠান এবং এমনকি নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতেও তিনি কার্যত প্রতিদিনই দিল্লি থেকে বিমানে চেপে বাইরে যান (এবং দিল্লি ফিরে আসেন)। তাঁর গাড়িবহর বা কনভয়টিই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ। অবশ্য সেটির আকার এখন কিছুটা কমিয়ে এনেছেন তিনি। হালফিল নড়বড়ে আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর অর্থমন্ত্রী একবারও মুখ খোলেননি (অথচ তিনি এই ভেবে উল্লসিত হন যে, ইউপিএ আমলের
কোনো একসময়ে একটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ভারতকে আরো চারটি দেশের সঙ্গে একই শ্রেণিতে ফেলে ‘দুর্বল অর্থনীতি’ আখ্যা দিয়েছিল)। তিনি এই সত্যটি স্বীকার করতে চান না যে, ২০১৩-১৪ সালে ‘টেপার ট্যানট্রাম’ বিশ্বজুড়ে একটি আর্থিক সংকটের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল কিংবা ইউপিএ সরকার সেই সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ করেছিল (যা নিয়ে বিজেপি তখন উপহাস করেছিল)। অথচ তারই ফলে পরিস্থিতি সামলে নেওয়া গিয়েছিল শেষমেশ। সেই পদক্ষেপগুলির কার্যকারিতার
অকাট্য প্রমাণ হল নিম্নোক্ত ফলাফলগুলি—বিশেষ করে জিডিপি বৃদ্ধির হার:
২০১২-১৩ ২০১৩-১৪
রাজস্ব ঘাটতি ৩.৬% ৩.২%
রাজকোষ ঘাটতি ৪.৯ ৪.৫
সিএ ঘাটতি* ১.৭
জিডিপি ৫.৫ ৬.৪
বৃদ্ধির হার
বৈদেশিক মুদ্রা ২৯২ বিলিয়ন ৩০৪ বিলিয়ন
ভাণ্ডার (ডলার) (২৭৫ বিলিয়ন ডলার
নীচে নামার পরে)
বর্ষশেষে রুপি/ ৫৪.৩৯ রুপি ৬০.১০ রুপি
ডলার রেট (৬৮.৮৫ রুপির
নীচে নামার পর)
সূত্র: জিওআই, এমওএসপিআই, আরবিআই ও সিজিএ। *কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট
বাণিজ্যমন্ত্রী যেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের এক মহোৎসবে মেতে উঠেছেন। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচবছরে তিনি ৯টি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু ঠিক তখনই প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার (সিইএ) পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা এল: বাণিজ্য চুক্তিগুলিতে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং দেশের নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো বা বিধিবিধানগুলি বাস্তবে যা অনুমোদন করে—এই দুইয়ের মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান থেকে যায়।
করণীয় তালিকা
এটি স্পষ্ট যে, প্রধানমন্ত্রী কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট (সিএডি) কমিয়ে আনতে, বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে এবং বিনিময় হারকে স্থিতিশীল করতে আগ্রহী। তাঁর এই ভাবনা সম্পূর্ণ সঠিক।সুতরাং, আবারও ফিরে আসা যাক রুচির শর্মার প্রসঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর কাঁধে এখন কাজের পাহাড় জমে আছে। তাঁকে অবশ্যই দেশের নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো বা বিধিবিধানগুলি (যার মধ্যে রয়েছে আরবিআই, সেবি, সিবিডিটি, সিবিআইটি, বাণিজ্য মন্ত্রক, কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক এবং অন্যান্য সংস্থা) নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে। উদারীকরণের পূর্ববর্তী যুগের মতোই দমনমূলক এবং নিয়ন্ত্রণসর্বস্ব হয়ে উঠেছে যে শাসনব্যবস্থা, তাকে এবার প্রত্যাহার বা রদ করতে হবে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে এবং সেগুলিকে পরোক্ষ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে সবরকমে। স্থিতিশীল করতে হবে বিনিময় হারকে। এছাড়া করের হার কমিয়ে আনতে হবে। একবার এই কাজগুলি সম্পন্ন হয়ে গেলে, বিদেশি পুঁজি আবারও ভারতে ফিরে আসবে। বর্তমান মন্ত্রীদের (যাঁদের অধিকাংশই মুক্ত বাজারের ব্যাপারে সন্দিহান) নিয়ে তিনি এই কাজগুলি সম্পন্ন করতে পারবেন না। তাঁকে অবশ্যই উপযুক্ত হিতৈষী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির সহায়তা নিতে হবে।
আমার পরামর্শ হল, প্রধানমন্ত্রী যেন একজন মার্কেট-ফ্রেন্ডলি এক্সপার্টকে এই উদ্যোগের নেতা হিসেবে নিয়োগ করেন এবং তাঁর টিমের বাকি সদস্যদের বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতাও যেন দেওয়া হয় তাঁকে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলি যেন জরুরি ভিত্তিতে ১৫ দিনের মধ্যেই করা হয়, সেই নির্দেশও দিতে হবে।
লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত