


শান্তনু দত্তগুপ্ত: বড়ো হয়ে কী হতে চাও? স্কুলের গণ্ডির মধ্যে ঘোরাফেরা করা যে কোনো ছেলেমেয়েকে এই প্রশ্ন করলে দশজনের পাঁচজনই বলবে, ডাক্তার। কিছুটা জেনে, কিছুটা না বুঝে, আর বাকিটা বাবা-মায়ের চোখজুড়ে থাকা স্বপ্নে। সেইমতো শুরু হয় তাদের প্রস্তুতি। স্কুলের পড়া, কম্পিটিটিভ এক্সামের তোড়জোড়, নামজাদা কোচিং সেন্টারে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে ভরতি হওয়া, লাগাতার মক টেস্টের পাহাড় ডিঙানো এবং পরীক্ষা দিয়ে এসে শোনা, গোটা পর্বটাই বাতিল হয়ে গিয়েছে। কারণ, লিক হয়েছে প্রশ্নপত্র। দু’বছর টানা নাওয়া-খাওয়া ভুলে স্রেফ পড়া, পরিশ্রম, স্বপ্ন... সব এক মুহূর্তে চুরমার।
২২ লক্ষ। সংখ্যাটা কম নয়। আর তাদের সঙ্গে জড়িয়ে আরও ৪৪ লক্ষ বাবা-মা। ছেলেমেয়ে ডাক্তার হোক—খুব বেশি কিছু চেয়ে ফেলেছিলেন কি তাঁরা? সরকার এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত নিয়ামক সংস্থার ব্যর্থতার দায় তাঁরা কেন নেবেন? মেয়েকে সোনিপত থেকে দিল্লি পাঠিয়েছিলেন। কোচিংয়ের জন্য। ডাক্তারিতে ভরতির সর্বভারতীয় পরীক্ষায় বসবে সে। প্রতিদিন রাত দেড়টা পর্যন্ত পড়ত। তারপর আবার সকাল ছ’টা। তাঁরা ভেবেছিলেন, আমাদের পরিবারে এবার একজন ডাক্তার আসবে। ভেবেছিলেন বলা ভুল। বিশ্বাস করেছিলেন। ভেঙেছে সেই বিশ্বাস। পরিবারের। মেয়েরও। কারণ একবার নয়... দু’বার ধাক্কা খেয়েছে তার স্বপ্ন। দু’বছর আগে প্রশ্নপত্র লিক হয়েছিল। এবারও হল। তখন পরীক্ষা বাতিল হয়নি। কিন্তু অন্যায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তালিকায় তার আর জায়গা হয়নি। এবারও হল না। আরও একবার বসবে সে নিটে। আগামী ২১ জুন। রাষ্ট্র তাকে বসতে বাধ্য করছে। পরীক্ষা বাতিল করে আরও একবার নেওয়া হচ্ছে, এটাই যে অনেক দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কাছে! আর ছেলেমেয়েরা? কেন! ‘অ্যাডজাস্ট’ করবে! এটাই তাদের নিদান। তারা জানে না, একটা এমন কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দিতে নিজেদের নিঃশেষ করে ফেলে এই ছেলেমেয়েরা। বারবার সেটা সম্ভব হয় না। যে উদ্যম নিয়ে তারা ৩ মে পরীক্ষার হলে ছুটেছিল, তার ছিটেফোঁটাও ২১ জুন থাকবে না। বরং বিরক্তি, অবিশ্বাস, আতঙ্ক জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকবে তাদের বুকে। আর এনটিএ কী বলবে? ‘অ্যাডজাস্ট করো ভায়া। ডাক্তার হবে তোমরা। এটুকু চাপ তো নিতেই হবে।’ তারা ভুলে যাবে, সংখ্যাটা ২২ লক্ষ। খুব কম কি? তারা ভুলে যাবে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দায় এত ছেলেমেয়ের উপর চাপানো যায় না। তারা ভুলে যাবে, প্রশ্নপত্র ফাঁস না হওয়ার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা তারা নেয়নি। সরকার, রাষ্ট্র, এনটিএ—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তাদের কাছে এটাই স্বাভাবিক। এটাই নিউ নর্মাল। ফল ভুগবে কারা? ওই ২২ লক্ষ। দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা মনে রাখবেন, সংখ্যাটা কম নয়। কল্পনাও করতে পারবেন না, এই পরীক্ষায় বসার জন্য কত স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে তাদের। কারও ভোর শুরু হয়েছে তিনটেয়, কারও পাঁচটায়। কেউ গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছে। কারও বাবা এক শহরের চাকরি ছেড়ে সন্তানের প্রস্তুতির জন্য চলে গিয়েছে অন্য শহরে। নিটের প্রস্তুতি কেবলমাত্র একটা পরীক্ষায় বসা নয়। বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা। যাবতীয় শখ বস্তাবন্দি করে নদীতে ফেলে দেওয়া। অ্যাডজাস্ট করো বলাটা সহজ, করাটা নয়। মানুষ প্রশ্ন করবে। ছেলেমেয়েরা প্রশ্ন করবে। আর আপনাদের উত্তরও দিতে হবে। নিয়োগ দুর্নীতির ইস্যু পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হয়েছিল। কারণ মানুষ প্রশ্ন করেছিল। পথে নেমেছিল। তাহলে আপনারা কেন উত্তর দেবেন না। লাগাতার প্রশ্ন ফাঁসের যে কর্মসূচি আপনারা লাগিয়ে রেখেছেন, তাকে এখনও দুর্নীতি বলব না? আপনাদের জন্য কি তাহলে দুর্নীতির সংজ্ঞা আলাদা? ২০২১ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁস হল। ভুয়ো পরীক্ষার্থীদের বিরাট চক্র ধরা পড়ল। রাজস্থান-উত্তরপ্রদেশ থেকে বেশ কিছু গ্রেপ্তারও হল। তারপরও নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হল না। প্যানেলও বাতিল হল না। কেন? ওটা দুর্নীতি ছিল না? অযোগ্যরা সুযোগ পায়নি? নাকি যোগ্যরা বাতিল হয়নি? উত্তর কেউ দেয়নি। প্রশ্নগুলোও ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের কেলেঙ্কারিতে প্রকাশ্যে এসেছিল, এক একটা প্রশ্নের সেটের দর ছিল ৩০-৫০ লাখ টাকা। গ্রেপ্তারও হয়েছিল কয়েকজন। সবাই প্রায় ঝাড়খণ্ড ও বিহারের। তারপর কী হল? কী শাস্তি হল তাদের? কোন পথে বেরিয়েছিল প্রশ্ন? ভিতরের যোগটা কোথায়? সরকারি সংস্থার অন্দরে ঘোঘের বাসা না থাকলে তো খাঁটি প্রশ্ন ফাঁস হবে না! তার খোঁজ পাওয়া গেল না। কিন্তু পরে জানা গেল, দেড় হাজারের উপর পরীক্ষার্থীকে ‘গ্রেস নম্বর’ দিয়েছে নিয়ামক সংস্থা। সে নিয়ে অবশ্য বিতর্ক হয়েছিল। গ্রেস পার্টিদের ফের পরীক্ষা দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু এই প্রশ্ন ফাঁসকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বলে মনে করেনি তারা। তাই কোন ফোকর দিয়ে প্রশ্ন বেরিয়েছিল, তার খোঁজও মেলেনি। অভিযোগ গত বছরও ছিল। বাছাই করা কয়েকটি কোচিং সেন্টারের পড়ুয়াদের ‘অস্বাভাবিক’ বেশি নম্বরের জন্য। কিছু ‘নামজাদা’ পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, এবারও কি তাহলে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে? উত্তর মেলেনি। ২০২৪ সালে যখন সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিষয়টা পৌঁছেছিল, তখন প্রতিষ্ঠানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালে কি তারপর থেকে কলঙ্কমুক্ত নিট হত? হয়তো। হয়তো না। কিন্তু সম্ভাবনা অবশ্যই প্রবল হত। কারণ, অপরাধী পার পেয়ে গেলে কনফিডেন্স বাড়ে। বারবার সেটাই হয়ে চলেছে। কোচিং সেন্টার, রাজনীতিবিদ, দালাল, সরকারি কর্মী... বিপুল এক চক্র ছড়ি ঘুরিয়ে চলেছে গোটা ব্যবস্থার উপর। পার পেয়ে চলেছে তারা। কোনো না কোনো খুঁটির জোরে। সিবিআই তদন্তে সরাসরি আঙুল তোলা হয়েছে জাতীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থার সুরক্ষা নেটওয়ার্কের উপর, প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ যোগসাজসেরও। গ্রেপ্তার করা হয়েছে কেমিস্ট্রির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক পি ভি কুলকার্নি এবং বটানির শিক্ষিকা মনীষা মান্ধারেকে। তাঁদের সঙ্গে এনটিএ’র প্রশ্ন তৈরির প্যানেলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। আর তা প্রমাণিত। তারপর? তার আর পর বলে কিছু নেই। ওখানেই সব শেষ। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এরপরও এনটিএ’র উপর আস্থাজ্ঞাপন করেছেন। বলেছেন, ছাত্রছাত্রীরাই আমাদের ‘প্রায়োরিটি’। সত্যিই কি তাই? পড়ুয়ারা ‘প্রায়োরিটি’ হলে নিয়ামক সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হত। সেটা কি হয়েছে? প্রভাবশালী যে বা যারা এত বড়ো কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত, তাদের নাম প্রকাশ্যে আনা হত। সেটাও হয়নি। এই কলঙ্কের দায় মাথায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতেন বা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অন্তত মুখরক্ষার খাতিরে এমন একটা কঠিন পদক্ষেপ নিতেন। করেননি। তিনি অবশ্য এখন তেল-গ্যাস কম খরচ এবং ওয়ার্ক ফ্রম হোমের পরামর্শ দিতে ব্যস্ত। সোনার ব্যবসায়ীদের পেটে টান ফেলে গয়না-টয়না কম কেনার আবেদন জানানোটা তাঁর কাছে বেশি দরকারি। নিট পরীক্ষা? ও তো ছেলেমেয়েরা ‘অ্যাডজাস্ট’ করে নেবে।
করছে তারা। অ্যাডজাস্ট। ১৩টি ভাষায় নিট দেওয়া যায়। কিন্তু দিল্লিতে বসে বাংলায় দেওয়া যায় না। অ্যাডজাস্ট করছে তারা। ভুলে ভরা থাকে অনুবাদ। প্রশ্নের মানে বোঝা যায় না এবং বহু ক্ষেত্রে বদলে যায়। এমনকি ইংরেজি-হিন্দিতে যে প্রশ্ন এসেছে, বাংলায় তা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। অ্যাডজাস্ট করছে তারা। আঞ্চলিক বোর্ড বা সিআইসিএসই প্ল্যাটফর্মে দ্বাদশ পেরনোর পর পড়ুয়ারা দেখছে, নিটের পুরো সিলেবাসটাই এনসিইআরটির উপর নির্ভরশীল। শুরু হচ্ছে নতুন শুরু। অ্যাডজাস্ট করছে তারা। ঋত্বিক মিশ্রাও অ্যাডজাস্ট করেছিল। তিন নম্বর অ্যাটেম্পট ছিল তার। বলেছিল, ‘দেখো বাবা, এবার আমি সুযোগ পাবই। খুব ভালো পরীক্ষা হয়েছে।’ লখিমপুরের ছেলে। পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর নিথর দেহটা উদ্ধার হয়েছে তার। আস্থা হারিয়েছে সে সিস্টেমের উপর। সরকারের উপর। পরীক্ষার উপর। আর হ্যাঁ, নিজের উপরও। কতবার পারা যায় শূন্য থেকে শুরুর লড়াইয়ে নামতে? কতবার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে স্রেফ ছোটো ভুল বলে মেনে নেওয়া যায়? কতবার নিজের... বাবা-মায়ের স্বপ্নটাকে ভাঙতে দেখা যায়? ঋত্বিক অ্যাডজাস্ট করতে পারেনি। সবাই পারে না। ২২ লক্ষ... সংখ্যাটা কিন্তু খুব কম নয়।