


যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীন ভারতে গণতন্ত্রের অনুশীলন চলে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত। তাই এদেশে প্রত্যক্ষ নির্বাচন কেবল লোকসভা এবং বিধানসভায় সীমাবদ্ধ নয়, ভোট নেওয়া হয় স্থানীয় সরকার গঠনের জন্যও। স্থানীয় সরকার তৈরি হয় শহরাঞ্চলে পুর ভোট এবং গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েত ভোট গ্রহণের মাধ্যমে। গ্রামোন্নয়নের জন্য তিন স্তরে বোর্ড গঠন করা হয়—গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদ। বাম জমানায় ‘সায়েন্টিফিক’ রিগিংয়ের বিস্তর অভিযোগ ছিল ঠিকই—কিন্তু জ্যোতি বসু এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার পঞ্চায়েত এবং পুরসভা নির্বাচনে কখনো অনীহা দেখায়নি। এই নির্বাচনগুলি অনুষ্ঠিত হত নির্দিষ্ট সময়েই। ‘পরিবর্তন’-এর জমানা নির্বাচন নিয়ে মানুষকে যার পর নাই হতাশ করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায়, বিশেষ করে পঞ্চায়েত এবং পুর নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে অশান্তির ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। সবচেয়ে নিন্দা জুটেছিল বেনজির রক্তক্ষয় এবং প্রাণহানির জন্য। একাধিক মামলায় উচ্চ আদালতও ভর্ৎসনা করেছিল নবান্নকে। নির্বাচন-পরবর্তী হিংসা বারবার আতঙ্কের কারণ হয়েছে রাজ্যে। ২০১৬ ও ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত বিধানসভা এবং এই সময়কালে গৃহীত লোকসভা নির্বাচনেও বড়ো গন্ডগোল ঘটেছিল রাজ্যের নানা স্থানে। প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল বিধানসভা এবং সংসদে।
তবে এই আইনি বিবাদের বাইরের একটি ঘটনা মানুষকে মারাত্মক সমস্যায় ফেলেছে। এর দুটি দিক—একদিকে স্থানীয় সরকার তৈরির জন্য নির্বাচনের নামে ‘প্রহসন’ কিংবা বছরের পর বছর নির্বাচন স্থগিত রেখে দেওয়া। বহু ত্রিস্তর পঞ্চায়েত এবং পুরসভার শত শত আসন তৃণমূল কংগ্রেস বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘জয়লাভ’ করত। বিজেপিসহ বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, বহু আসনে তাদের প্রার্থী দিতেই দেওয়া হত না কিংবা মেরেধরে প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হত। এমনকি, ঘোড়া কেনাবেচার রাজনীতি আমদানি করে বিরোধীদের জেতা একাধিক পঞ্চায়েত এবং পুরসভা দখলের কুৎসিত দৃষ্টান্তও রেখেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। আর এই রাজনীতির বলি হয়ে প্রাণও দিয়েছেন বিরোধী দলের অনেক নেতা-কর্মী! আবার কিছু ক্ষেত্রে ভোট রুখে দেওয়া হয়েছে বছরের পর বছর। তার জন্য যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ দেখাতে পারেনি রাজ্যের তৎকালীন শাসক দল এবং সরকার। ফেলে আসা জমানার পাপের বোঝা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে রাজ্যের অনেকগুলি পুরসভা। তবে সম্প্রতি রাজ্যে সংঘটিত ‘আসল পরিবর্তন’-এর পর সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা নতুন আশায় বুধ বাঁধছেন। ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার ১৫টি পুরসভার ভোট নেবে শীঘ্রই। তাঁদের আশা, দীর্ঘদিন আটকে থাকা পুরভোট এবার নিশ্চয় হবে; শীঘ্রই ঘোষিত হবে পুরভোটের নির্ঘণ্ট। সূত্রের খবর, তাঁদের সেই আশা পূরণ হতে চলেছে।
১২টি জেলার ১৫টি পুরসভায় বছরের পর বছর নির্বাচিত পুরবোর্ড নেই। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হাওড়া পুর কর্পোরেশন। সেখানে নির্বাচন হয়নি ১৩ বছর! কাউন্সিলার না-থাকায় মানুষকে বিস্তর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, এই পুরসভাগুলিতে নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো নির্দিষ্ট হয়নি। তবে ভোটগ্রহণের ব্যাপারে ইতিমধ্যেই উদ্যোগী হয়েছে নতুন রাজ্য সরকার। এই ব্যাপারে শীঘ্রই সিদ্ধান্ত নেবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিভাগীয় মন্ত্রীর সঙ্গে তিনি বৈঠকে বসবেন। এই ১৫টি পুরসভায় ভোটগ্রহণের জোরলো দাবি অনেকদিনের। কিন্তু পূর্বতন তৃণমূল সরকার তাতে কর্ণপাতই করেনি। পুরভোট করানোর দায়িত্ব রাজ্য নির্বাচন কমিশনের। কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলার প্রেক্ষিতে ওই সংস্থা জানিয়ে দিয়েছিল, পুরসভাগুলির ভোটগ্রহণে তারা প্রস্তুত। কিন্তু তাতে সবুজ সংকেত দেয়নি তৎকালীন রাজ্য সরকার! উলটে রাজীব সিনহার পর গত সেপ্টেম্বর থেকে ফাঁকাই পড়ে রয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ। নীলাঞ্জন শাণ্ডিল্যের পর কমিশনের সচিবের পদেও কাউকে দেওয়া হয়নি। নেই যুগ্ম সচিবও। সোজা কথায়, কর্মিবলের অভাবে পূর্ণোদ্যমে কাজ করার পরিস্থিতিতে নেই রাজ্য নির্বাচন কমিশন। বিজেপি পরিচালিত সরকার এসেই কমিশনের এই শূন্যপদগুলি পূরণে আন্তরিকভাবেই উদ্যোগী হয়েছে। সব মিলিয়ে দ্রুত পুরভোট গ্রহণের ব্যাপারে আশার আলোই দেখছে স্থানীয় গণতন্ত্রপ্রিয় নাগরিক সমাজ। নির্বাচিত পুরবোর্ড নেই দুর্গাপুরেও। ডোমকল, রায়গঞ্জ, বুনিয়াদপুর, পুজালি, কার্শিয়াং, মিরিক, কালিম্পং, পাঁশকুড়া, হলদিয়া, কুপার্স ক্যাম্প, নলহাটি, বালি এবং ধূপগুড়ি পুরসভারও হাল একই। এগুলিতে শেষবার পুরভোট নেওয়া হয়েছে ২০১৫ কিংবা ২০১৭ সালে। আপাতত কাজ চলছে প্রশাসক বসিয়ে। সরকারি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বা প্রশাসক বসিয়ে এত বছর যাবৎ এতগুলি পুরসভা পরিচালনার দৃষ্টান্ত অন্তত এই বঙ্গে নজিরবিহীন। এছাড়া চলতি বছরে বিধানসভা ভোটের মাসকয়েক আগে ভেঙে দেওয়া হয়েছে গয়েশপুর, কৃষ্ণনগর, চাকদহ, জঙ্গিপুর প্রভৃতি সাতটি পুরসভার নির্বাচিত পুরবোর্ড। এই ‘নয়া ঐতিহ্য’ হঠিয়ে অবিলম্বে তৃণমূল স্তরে গণতন্ত্র ফেরানো গেলে নতুন সরকার মানুষের প্রশংসা ও আশীর্বাদ পাবে।