


যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত পশ্চিম এশিয়া। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা। বিশ্বের দুই মহাশক্তির নেতারা যখন বেজিংয়ে বৈঠকে বসেন, তখন সবাই ধারণা করেছিলেন, এই সংবেদনশীল বিষয়গুলি নিয়েই তাঁদের মধ্যে আলোচনা হবে। কিন্তু সেটা না করে চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং তাঁদের আলোচনায় প্রাচীন গ্রিসের পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১-এ এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে এই যুদ্ধ কয়েক দশক ধরে চলেছিল। আধিপত্য বিস্তারের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ইঙ্গিত করে জিনপিং বলেন, বিশ্ব আবারও এক নতুন সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। চীন ও আমেরিকা ‘থুসিডাইডিসের ফাঁদ’ এড়িয়ে সম্পর্কের একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারবে? ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ তত্ত্বের মূল কথা হল, যখন কোনো উদীয়মান শক্তি কোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে হটিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, তখন প্রায়ই তার পরিণতি হয় যুদ্ধ। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস তাঁর ‘হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপনেশিয়ান ওয়ার’ বইয়ে লিখেছিলেন, ‘এথেন্সের উত্থান এবং এর ফলে স্পার্টার মনে জেঁকে বসা ভয়ই যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।’ এথেন্স যেভাবে একসময় স্পার্টার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিল, জিনপিংয়েরও ইঙ্গিতটি একই রকম— চীনের উত্থান আমেরিকার মনে উদ্বেগ তৈরি করছে এবং দেশটির সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ট্রাম্পের সফরকালে এই ধ্রুপদি তত্ত্বের অবতারণা করার উদ্দেশ্য হতে পারে তাইওয়ান প্রশ্নে জিনপিংয়ের অবস্থান আগেভাগেই জানান দেওয়া। চীন স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পকে সতর্ক করে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, তাইওয়ান নিয়ে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ তাঁদের দু’টি দেশকে ‘সংঘাতের’ দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে চীনের প্রেসিডেন্ট অবশ্য কিছুটা নরম সুরে বলেন, ‘আমেরিকা ও চীন আপাত–অনিবার্য এই মতবিরোধ সামাল দিতে সক্ষম। চীনা জাতির গৌরবময় পুনরুত্থান এবং আমেরিকাকে আবারও মহান করে তোলা— এই দু’টি বিষয় পুরোপুরি একসঙ্গে চলতে পারে এবং তা গোটা বিশ্বের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।’ এর প্রতিক্রিয়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্প বলেন, জিনপিং ‘খুব মার্জিতভাবে আমেরিকাকে সম্ভবত একটি ক্ষয়িষ্ণু বা পতনের দিকে যাওয়া রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দু’বছর আগে, আমরা প্রকৃতপক্ষে একটি ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্র ছিলাম। বর্তমানে আমেরিকা পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের চেয়ে সবচেয়ে চাঙ্গা একটি রাষ্ট্র।’ চীনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করার বিরুদ্ধে তাইওয়ানকে সতর্ক করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে বলেছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট সেখানে যুদ্ধ কিংবা আন্দোলন— কোনোটাই দেখতে চান না। ‘আমি চাই না কেউ (তাইওয়ান) স্বাধীন হোক।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আপনি জানেন, যুদ্ধ করতে হলে আমাদের প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মাইল (১৫ হাজার ২৮৯ কিলোমিটার) দূরে যেতে হবে। আমি সেটা চাই না। আমি চাই, পরিস্থিতি শান্ত হোক। চীনও শান্ত হোক।’
মার্কিন বিদেশ দফতরের সঙ্গে যুক্ত এক সূত্রের দাবি, হরমুজ প্রণালী এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করার বিষয়টি নিয়ে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের আলোচনা হয়। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক এবং হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে যাক, এই বিষয়টিতে সম্মত হয়েছেন জিনপিং। শুধু তা-ই নয়, এই দুই বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। আর এ ক্ষেত্রে জিনপিংয়ের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন ট্রাম্প। ওই সূত্রের দাবি, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য সমর্থন করলেও নির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি চীনের প্রেসিডেন্ট। ফলে তাইওয়ান, ইরান নিয়ে মতপার্থক্য নিয়েই দেশে ফিরতে হল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। তবে এটাও ঠিক, আমেরিকা এবং চীন দুই দেশই চাইছে নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক মসৃণ করতে। প্রাথমিক কথাবার্তায় তেমনই আভাস দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং। দু’দেশ যাতে একে অন্যকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভাবে, ট্রাম্পের উদ্দেশে সেই বার্তাই দিয়েছেন জিনপিং। তিনি চাইছেন, দু’দেশ একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করুক। চীনা প্রেসিডেন্টকে নিজের ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেছেন ট্রাম্পও। জানিয়েছেন, জিনপিংয়ের বন্ধু হতে পেরে তিনি সম্মানিত। যা থেকে স্পষ্ট, সম্পর্কের শৈত্য কাটাতে আগ্রহী বেজিং-ওয়াশিংটন।