রাকেশ শর্মার উত্তরসূরি হিসেবে নজির গড়লেন শুভাংশু শুক্লা। মিশন সফল হলে ভারতীয় বায়ুসেনার এই গ্রুপ ক্যাপ্টেনই হবেন আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন সফরকারী প্রথম ভারতীয়। ৪১ বছর পর মহাকাশে ফের এক ভারতীয়। সেবার ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন (পৃথিবীর মানচিত্রে যে দেশটির আজ আর কোনও অস্তিত্ব নেই), এবার আমেরিকা! সে ১৯৮৪ সালের কথা। কাজাখস্তানে এক হিমশীতল ভোরে এমনই এক মহাকাশযানে পা রাখেন ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের তরুণ স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মা। সয়ুজ টি-১১ মহাকাশযানে বসে সিটের নীচে দুলুনি প্রথমবার টের পেয়েছিলেন তিনি। মিনিটে কয়েকের মধ্যে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ পেরিয়ে যানটি তাঁকে নিয়ে চলে গিয়েছিল মহাশূন্যে। ৪১ বছর পর আবার সেই রোমাঞ্চকর অনুভব। এবার এক ভারতীয় বায়ুসেনা ক্যাপ্টেনের। লখনউয়ের ছেলে শুভাংশুর জন্ম রাকেশদের অভিযানের ঠিক পরের বছর, ১৯৮৫-তে। ফ্লোরিডার ঘড়িতে তখন মঙ্গলবার রাত প্রায় ৯টা। অর্থাৎ সূর্যাস্ত হয়েছে খানিক আগেই। নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারের ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ের বাইরে দাঁড়ানো দুটি টেসলার মডেল এক্স এসইউভিতে উঠলেন চার মহাকাশচারী। চালকবিহীন গাড়ি এগিয়ে চলল। গন্তব্য লঞ্চপ্যাড। রাত পৌনে ১টা। কোয়ারেন্টাইন ভেঙে ‘ড্রাগন ক্যাপসুলে’র দিকে এগলেন চার মহাকাশচারী। পরনে দুধসাদা পোশাক-হেলমেট। কাউন্টডাউন চলছে ... টি মাইনাস ৪৫ মিনিট। স্পেসএক্স অ্যাক্সিয়ম-৪ মিশন অপারেটররা সঙ্কেত দিলেন, ‘গো’।
শুরু হল ফ্যালকন ৯ রকেটে কেরোসিন-লিকুইড অক্সিজেন প্রপেল্যান্ট ভরার কাজ। ‘ড্রাগন ক্যাপসুলে’র ভিতরে নির্দিষ্ট আসনে বসে স্ট্র্যাপ আটকে নিলেন চারজন। বন্ধ হয়ে গেল ড্রাগনের হ্যাচ। দমবন্ধ করে তখন অপেক্ষা করছে ভারতসহ সারা বিশ্ব। কাউন্টডাউন শূন্যে পৌঁছনোর আগেই চালু হয়ে গেল ফ্যালকন ৯-এর ন’টি মেরিন ইঞ্জিন। মূহূর্তে আগুনের গোলা হয়ে ফ্লোরিডার তারাভরা আকাশ চিরে ছুটে গেল ‘ড্রাগন’। ৪১ বছর পর মহাকাশে ফের এক ভারতীয়...। উৎক্ষেপণের মিনিটদশেকের মধ্যেই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করে শুভাংশুর মহাকাশযানটি। ২০০ কিমি উচ্চতায় ঘূর্ণায়মান ড্রাগন স্পেসক্র্যাফট থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে হিন্দিতে বার্তা দিলেন ভারতীয় মহাকাশচারী—‘সকল দেশবাসীকে নমস্কার। আমরা ৪১ বছর পর মহাকাশে পৌঁছলাম। এটা কেবল আমার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাত্রা নয়, মহাকাশে ভারতের গগনযান মিশনেরও শুরু। জয় হিন্দ! জয় ভারত!’ ভারতের গগনযান মিশনেও মহাকাশে যাবেন শুভাংশু। যাত্রা শুরুর আনুমানিক ২৮ ঘণ্টা পর গন্তব্যে পৌঁছনোর কথা ‘ড্রাগন’-এর। বৃহস্পতিবার যথাসময়েই স্পেস স্টেশনে ডক করেছে সেটি। শুভাংশু ছাড়াও এই মহাকাশযানে রয়েছেন নাসার মিশন কমান্ডার পেগি হুইটসন, পোল্যান্ডের স্লাওস উজানানস্কি ও হাঙ্গেরির টিবর কাপু। আর ১৩ দিন মহাকাশে থাকবেন শুভাংশুরা। ৬০ ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাবেন তাঁরা। মহাকাশযাত্রায় শুভাংশুর সঙ্গী হয়েছে ভারতীয় খাবারও। লখনউ থেকেই উৎক্ষেপণ পর্বে নজর রেখেছিলেন তাঁর মা। এমনকী অভিযান শুরুর আগে রীতি মেনে ছেলেকে ভার্চুয়ালি ‘দই চিনি’ও খাইয়েছেন তিনি। ভিডিও কলে মাকে আশ্বস্ত করে শুভাংশু বলেন, ‘আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।’
আমরা সবাই অপেক্ষা করে থাকব সেই শুভক্ষণের জন্য। সমস্ত বাধাবিঘ্ন এড়িয়ে তাঁদের এই যাত্রাপথ যেন সুগম হয়। আমাদের মনে আছে, এর আগে অন্তত সাতবার পিছিয়ে গিয়েছে শুভাংশুদের মহাকাশ অভিযান। অবশেষে সফল উৎক্ষেপণে খুশি গোটা দেশ। শুভাংশুকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর মহাকাশযাত্রায় উচ্ছ্বসিত ভারতীয় বায়ুসেনাও। সর্বোপরি তাঁদের সঙ্গী হয়েছে সমস্ত ভারতবাসীর প্রাণভরা ভালোবাসা এবং অফুরান শুভেচ্ছা। এই জয় আর শুভাংশুর একার হবে না, আজকের প্রজন্মেরও। আজকের দিনের শিক্ষার্থীরা এই মহাকাশ অভিযান থেকে প্রেরণা খুঁজছে। গোটা অভিযানের উপর নজর রেখে অনেকেই দেখছে মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন। শিক্ষকদের কাছে তারা প্রশ্ন রাখছে, আগামী দিনে আমরা কীভাবে মহাকাশে পা রাখতে পারি? মার্কিন এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা—নাসা এবং ইসরোর যৌথ উদ্যোগে মহাকাশে গেলেন শুভাংশু। আগামী দিনে আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন স্বদেশি যানে চড়েই মহাকাশ বিজয় করতে পারে, স্বপ্ন তাদের সাকার হোক এইমতোই।