মৃণালকান্তি দাস: আমি জেফকে ১৫ বছর ধরে চিনি। দারুণ লোক। আমার মতো সে-ও সুন্দরী মহিলাসঙ্গ পছন্দ করে। —২০০২ সালে নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনে জেফ্রি এডওয়ার্ড এপস্টেইনকে নিয়ে এই ভাষাতেই প্রশংসা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মৃণালকান্তি দাস: আমি জেফকে ১৫ বছর ধরে চিনি। দারুণ লোক। আমার মতো সে-ও সুন্দরী মহিলাসঙ্গ পছন্দ করে। —২০০২ সালে নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনে জেফ্রি এডওয়ার্ড এপস্টেইনকে নিয়ে এই ভাষাতেই প্রশংসা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রশংসা শুনলে মনে হবে, এপস্টেইন নিশ্চয়ই বড় মাপের কোনও বুদ্ধিজীবী। না! মার্কিন ধনকুবের জেফ্রি আসলে কুখ্যাত যৌন অপরাধী। যাঁর বিরুদ্ধে কম করে ৪০ জন মহিলা যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনেছিলেন। প্রত্যেকেই জানিয়েছিলেন, তাঁরা এপস্টেইনের ইন্দ্রিয়াসক্তির শিকার হয়েছিলেন। কেউই তখনও ১৮ উত্তীর্ণ হননি। কখনও ইচ্ছের বিরুদ্ধে, কখনও ভয় দেখিয়ে সহবাস করেছেন তাঁদের সঙ্গে। সেই অত্যাচারের বিবরণও নানা ভাবে সামনে এসেছে বহু বার। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই জেল হয়েছিল জেফ্রির। ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট তাঁকে ম্যানহাটনের একটি জেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মৃতদেহ পরীক্ষা করে জানা যায় তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে খানিকটা স্বস্তিই পেয়েছিলেন বিশ্বের একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তারকা। কিন্তু কে জানত, মৃত্যুর ছ’বছর পরও জেফ্রি এপস্টেইনের ভূত তাঁদের তাড়া করে বেড়াবে!
জেফ্রি এপস্টেইনের কুৎসিত যৌনাচারের গল্প এত দিন মুখবন্ধ খামে বন্দি ছিল। এপস্টেইন ফাইলস্। আমেরিকার বহু চর্চিত, বিতর্কিত কেচ্ছা কেলেঙ্কারির গোপন নথি। সম্প্রতি মার্কিন আদালতের নির্দেশে খামের মুখ খোলা হতেই কাঁপুনি ধরে গিয়েছে আমেরিকার ‘উচ্চ মহলে’। জেফ্রি এপস্টেইনের নথি প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে আমেরিকার তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্বের চরিত্রের নিকষ কালো দিক। তালিকায় কার নাম নেই! আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন থেকে স্টিফেন হকিং, মাইকেল জ্যাকসন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ল্যারি পেজ থেকে ইমরান খান— কে নেই সেই নথিতে! ভয়ঙ্কর সেই নথি অনুযায়ী, এঁরা প্রত্যেকেই তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় যৌনাচারে যুক্ত ছিলেন। যৌন নিগ্রহের শিকার ভার্জিনিয়া জিউফ্রে এপস্টেইনের প্রেমিকা তথা ব্রিটিশ সমাজকর্মী গিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। সেই মামলার সূত্র ধরেই একে একে প্রকাশ্যে আসছে বিখ্যাত সব নাম।
অভিযোগ, কমবয়সি মেয়েদের জন্য ফাঁদ পাততেন প্রেমিকা গিসলাইন ম্যাক্সওয়েল-ই। নিজের বাড়িতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবিতে ঘরের দেওয়াল ভরিয়ে রেখেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। একাধিক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর ছবি। যা দেখে মনে হবে, তিনি নিজেও খুব প্রভাবশালী এক মহিলা। এটাই ছিল যেকোনও মেয়ের বিশ্বাস অর্জনের প্রাথমিক পর্ব। প্রথমে সামনে আসতেন না এপস্টেইন। প্রথম পর্বে যা করার, তা ম্যাক্সওয়েলই করতেন। শেষ মূহূর্তে ‘ক্লাইম্যাক্সে’ এপস্টেইনের আবির্ভাব হতো। নগ্ন অথবা তোয়ালে জড়িয়ে...
কিন্তু কে এই যৌন অপরাধী?
১৯৫৩ সালে জন্ম ও কনি আইল্যান্ডে বড় হওয়া এপস্টেইন পড়াশোনা লাফিয়াত হাইস্কুলে। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কুপার ইউনিয়নে পদার্থ বিজ্ঞান পড়েছেন। ১৯৭১ সালে কুপার ইউনিয়ন ছেড়ে দেন এবং নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির কউরেন্ট ইন্সটিটিউটে ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিওলজি অব হার্ট বিষয়ে ভর্তি হন। কিন্তু সেখান থেকেও কোনও ডিগ্রি ছাড়াই পড়াশুনার পাঠ চুকিয়েছিলেন।
১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালে ডালটন স্কুলে ক্যালকুলাস ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকতা করেছিলেন। সেখানে তাঁর প্রতি মুগ্ধ হয়ে এক ছাত্রের অভিভাবক এপস্টেইনকে বলেছিলেন, ‘আপনি ডালটনে বসে অঙ্ক শিখিয়ে কী করছেন? আপনার উচিত ওয়ালস্ট্রিটে যাওয়া। আমার বন্ধু এইস গ্রিনবার্গের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’ গ্রিনবার্গ ছিলেন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক বিয়ার স্টিয়ার্নসের একজন সিনিয়র অংশীদার। তিনি ধনী হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকা ব্যক্তিদের স্টিয়ার্নসে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। এপস্টেইন ছিলেন তাঁর কাঙ্ক্ষিতদের একজন। ১৯৭৬ সালে তিনি ডালটনে শিক্ষকতা ছেড়ে দেন এবং স্টিয়ার্নসের আমেরিকান স্টক এক্সচেঞ্জে একজন ফ্লোর ট্রেডারের জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
১৯৮২ সালে নিজেই কোম্পানি খোলেন জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোং নামে। এখানে তাঁর সার্ভিস নিতে হলে ক্লায়েন্টদের এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক হতে হতো। তিনি তাঁদের বিনিয়োগের পরামর্শ দিতেন। নিজেকে দেখতেন বিলিয়নিয়ারদের অর্থ ব্যবস্থাপনা বিষয়ের স্থপতি হিসেবে। তিনি শুধু বিনিয়োগের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ থাকতেন না, তাঁদের সমাজসেবা ও কর সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়েও আশ্বস্ত করতেন। এভাবেই ক্ষমতাধরদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হতে থাকে।
১৯৯২ সালে তিনি ম্যানহাটনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বাড়ির মালিক হন। কর সংক্রান্ত কারণে ১৯৯৬ সাল থেকে তাঁর ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন সেন্ট টমাস দ্বীপ থেকে। ওই দ্বীপের কাছে লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপটি কিনে ফেলেন এপস্টেইন। এই দ্বীপ থেকে তিনি তাঁর ফাউন্ডেশনের কাজও করতেন, যার নাম ছিল ‘জেফ্রি এপস্টেইন সিক্স ফাউন্ডেশন’। তাঁর ফাউন্ডেশনটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬.৫ মিলিয়ন ডলার ডোনেশন দিয়েছিল।
এই দশকের শুরুর দিকে বিল ক্লিনটনের সঙ্গে পরিচয় তাঁকে তারকা খ্যাতি এনে দেয়। বিল ক্লিনটনের ফাউন্ডেশনের আফ্রিকা সফরের এইডস প্রতিরোধ প্রজেক্টে তাঁর ব্যক্তিগত ৭২৭ বিমান ব্যবহার করতে দেন। ২০০২ ও ২০০৩ সালের মধ্যে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে ক্লিনটন একাধিকবার ভ্রমণ করেন। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে এপস্টেইনের নথিতে সম্বোধন করা হয়েছে ‘ডো ৩৬’ নামে। এখনও পর্যন্ত মোট ৫০ বার তাঁর নাম ঘুরেফিরে এসেছে সদ্য মুখখোলা নথিতে। এ ছাড়াও রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম।
কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইনের জন্মদিনে চিঠি লিখে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। এমনই দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’। সম্প্রতি এই সংবাদমাধ্যমেরই একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০০৩ সালে ৫০তম জন্মদিনে এপস্টেইনকে নগ্ন মহিলার ছবি এঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। টাইপরাইটারের মাধ্যমে লেখা শুভেচ্ছা বার্তায় বলা হয়েছিল, ‘শুভ জন্মদিন। তোমার প্রতিটা দিন যেন ভিন্ন অথচ দুর্দান্ত ভাবে গোপন হয়ে ওঠে।’ নীচে কেবল ডোনাল্ড শব্দটি লিখে স্বাক্ষর করেছিলেন। ট্রাম্প অবশ্য এই দাবি উড়িয়ে দেন। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর কর্ণধার ডো জোনস এবং রুপার্ট মার্ডকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও করেছেন ট্রাম্প। অথচ, ২০০২ সালে নিউ ইয়র্ক সাময়িকীকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি জেফকে ১৫ বছর ধরে চিনি। দারুণ লোক। তাঁর সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে।
আমার মতো তাঁরও সুন্দরী নারীর প্রতি দুর্বলতা আছে। সন্দেহ নেই, তাঁদের অনেকেই তরুণী। জেফ্রি তাঁর সামাজিক জীবন উপভোগ করেন।’ আর এখন বলছেন, ‘এপস্টেইন নিয়ে এই ভাঁওতাবাজি ডেমোক্র্যাটদের ষড়যন্ত্র।’
অভিযোগ, আমেরিকান ধনকুবের এপস্টেইনের গোপন সাম্রাজ্য ছিল পিডো আইল্যান্ডে। ব্যক্তিগত বিমানে পৃথিবীবিখ্যাত অতিথিদের উড়িয়ে আনা হতো দ্বীপের বুকে, বিলাসবহুল প্রাসাদে। বিমানের নাম ছিল ‘লোলিতা এক্সপ্রেস’। নাবালিকা আর শিশুদের দিয়ে ওই প্রাসাদে যৌনচক্র চালাত এপস্টেইন। অতিথিদের ‘বিশেষ মালিশ’ করে দিলে ২০০ ডলার করে দেওয়া হতো প্রত্যেককে। নতুন মেয়ে জোগাড় করে আনতে পারলে মিলত আরও ইনাম। এ ছাড়া এপস্টেইনের ফ্লোরিডার পাম বিচের বাড়িতেও চলত নাবালিকাদের যৌনচক্র। সমাজে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থাকলেও এর আড়ালে ছিল অন্ধকার জীবন। তাঁর নারীসঙ্গের ব্যাপারটা গোপন ছিল না। একটা ‘সেক্সুয়াল পিরামিড স্কিম’ তৈরি করে ফেলেছিলেন। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমসে’র এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টেইনের ফ্লোরিডার পাম বিচের প্রাসাদে অনেক বার ট্রাম্পকে দেখা গিয়েছে। শুধু তাই-ই নয়, ১৯৯৩ সালে মারলা ম্যাপলস এবং ট্রাম্পের বিয়েতে গিয়েছিলেন এপস্টেইন। সেই ছবিও এখন ঘুরছে দুনিয়াজুড়ে! ট্রাম্পের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়ানোর দক্ষতা এবার এপস্টেইন-সংক্রান্ত নাটক থামাতে কোনও কাজে আসছে না। সংবাদসংস্থা সিএনএন বলছে, এই
বিতর্কে ট্রাম্প হতাশ হয়ে পড়ছেন। ট্রাম্প দেশ–বিদেশে হোয়াইট হাউসের যেসব সাফল্য দেখাতে চান, এপস্টেইন বিতর্ক তার সবকিছুকে ছাপিয়ে
যেতে পারে!
শুধু রাজনীতিকরাই নন, এপস্টেইন নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্বদের সঙ্গেও সু-সম্পর্ক রাখতেন। তাঁদের মোটা অঙ্কের ফান্ড দিতেন। এভাবে নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বলয়ে নিয়ে আসেন। এটা তাঁকে পরবর্তীতে আজীবন সাজা পাওয়ার মতো অপরাধেও লঘু দণ্ড পেতে সাহায্য করেছিল। কেউ অভিযোগ করতে চাইলে প্রভাবশালী আইনজীবী কিংবা গোয়েন্দাদের দিয়ে তাঁদের মুখ বন্ধ করাতেন। এপস্টেইনের নাম যৌন অপরাধীদের তালিকায় উঠলেও তাঁকে কোনও ফেডারেল বা স্টেট প্রিজনে থাকতে হয়নি। বরং পাম কাউন্টি জেলের প্রাইভেট এক উইংয়ে ছিলেন। তাঁর সাজা কম পাওয়া কিংবা প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় অনেকে মনে করেন, এপস্টেইন তাদেরও মহিলা সরবরাহ করতেন। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্স থেকে ভ্রমণ শেষে ফেরার সময় নিউ জার্সি বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিউ ইয়র্কের ফেডারেল কোর্টে নারী পাচারের মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়। মামলা প্রমাণিত হলে তাঁর ম্যানহাটনের বাড়ি বাজেয়াপ্ত হওয়াসহ ৪৫ বছরের জেল হতে পারত। হয়নি। মামলা চলাকালীনই জেলে আত্মহত্যা করে এপস্টেইন। সেদিন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সামনে এনে রিপাবলিকানদের অনেকে বলেছিলেন, আত্মহত্যা নয়, খুন হয়ে থাকতে পারেন এপস্টেইন। এই ঘটনা বিশ্বকে আরও একবার প্রমাণ করে দিয়েছিল ক্ষমতাবানরা কীভাবে শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে!
তবে আমেরিকাজুড়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, এপস্টেইন–ঝড়ে এবার কি সত্যিই বিপদে পড়তে চলেছেন ট্রাম্প? এপস্টেইন–কাণ্ড ঘিরে অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি, এফবিআই ডিরেক্টর ক্যাশ প্যাটেল এবং তাঁর ডেপুটি ড্যান বনজিনোর মধ্যে উত্তেজনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই বিশৃঙ্খলা, যা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল!