পি চিদম্বরম: ভূত এখানেই আছে। আসলে, এটি কখনোই বিদায় হয়নি। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) একটি হিন্দু রাষ্ট্র (হিন্দু নেশন) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অটল। হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণাটি পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য (৮০০-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ) অথবা খিলাফত (৬৩২-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) থেকে ধার করা। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুসারে একটি জাতিকে পরিচালনা করার পরামর্শ এখানে দেওয়া হয়েছে। কখনও কখনও, আরএসএস পিছু হটছে বলে মনে হতে পারে কিন্তু তারা ইতস্তত করবে না কিংবা লক্ষ্যচ্যুত হবে না। আঘাত হানার ব্যাপারে একটি মোক্ষম মুহূর্তের জন্য তারা অপেক্ষা করবে। হিন্দু রাষ্ট্রের কিছু ‘সাব-গোলস’ বা ‘উপ-লক্ষ্য’ রয়েছে। যেমন সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা, অযোধ্যায় একটি বিশাল রামমন্দির নির্মাণ করা, বারাণসী এবং মথুরার মতো পবিত্র স্থানগুলির উপর একচেটিয়া দাবি প্রতিষ্ঠা করা এবং বাবাসাহেব আম্বেদকর প্রণীত সংবিধানের পরিবর্তে মনুস্মৃতিভিত্তিক একটি সংবিধান প্রণয়ন করা।
আরএসএস-ভাবনার উৎসমূল
আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র সিটিজেনশিপ বা নাগরিকত্বের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। একটি হিন্দু নেশনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হবে হিন্দু ধর্ম। এম এস গোলওয়ালকর (১৯৪০-১৯৭৩) ছিলেন আরএসএসের
দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক। সঙ্ঘের অনুগামীরা তাঁকে ‘গুরুজি’ বলে ডাকেন। ‘উই, অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড’ বইয়ে গোলওয়ালকর লিখেছেন, ‘হিন্দুস্থানে বসবাসকারী বিদেশি জাতিগুলিকে হয় হিন্দু সংস্কৃতি এবং ভাষা গ্রহণ করতে হবে, হিন্দু ধর্মকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা করতে শিখতে হবে, হিন্দু জাতি (রেস) এবং সংস্কৃতির মহিমা, অর্থাৎ হিন্দু নেশনের মহিমাকীর্তন ছাড়া অন্যকোনও ধারণা তারা
পোষণ করবে না এবং হিন্দু জাতির (রেস) সঙ্গে
মিশে যাওয়ার জন্য তাদের পৃথক অস্তিত্ব হারাতে হবে, অথবা তারা হিন্দু নেশনের সম্পূর্ণ অধীনস্থ হয়ে
দেশে থাকতে পারে, তারা কিছুই দাবি করবে না, কোনও প্রিভিলেজ বা সুযোগ-সুবিধা লাভের
যোগ্য বিবেচিত হবে না, কোনও প্রেফারেন্সিয়াল ট্রিটমেন্ট বা অগ্রাধিকারমূলক আচরণ, এমনকী, সিটিজেনস রাইটস বা নাগরিক অধিকারও দাবি করবে না তারা।’
গোলওয়ালকর আরএসএসের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র এবং তিনি আরএসএস-ভাবনার উৎস হিসেবে রয়ে গিয়েছেন। ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ সম্পর্কে, আরএসএস তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি। বিপরীতে, আরএসএস জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইনকে (সিএএ) স্পষ্টভাবে সমর্থন করেছে। আরএসএসও ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের, বিশেষ করে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের, বহিষ্কার বা বিতাড়িত করার সরকারি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। (সরকার এনআরসি ঠিক তখনই ‘স্থগিত’ করেছে যখন তাদের মালুম হল যে এই আইন ‘বাস্তবায়নের’ ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই হাজার হাজার হিন্দু নরনারী ‘নন-সিটিজেন’ চিহ্নিত হয়ে গিয়েছে বা তারা নাগরিকত্ব হরোতে বসেছে!)
২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় সরকার গঠনের পরপরই, তিনি জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের উপর আঘাত হানেন। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার জন্য ৩৭০(১)(ডি) এবং (৩) অনুচ্ছেদ ব্যবহার করা হয়। ব্যাপারাটি উদ্ভট তো বটেই, সংবিধানের দৃষ্টিতেও সন্দেহজনক। দেশের শীর্ষ আদালত বলেছে যে, ৩৬৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পদ্ধতি এড়িয়ে সংবিধানের ওই ‘সংশোধন’ ছিল অসাংবিধানিক। তবুও, সুপ্রিম কোর্ট সরকারের জন্য সামলে দিয়ে বলেছে যে, ৩৭০(১)(ডি) অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগ, সংবিধানের সমস্ত বিধান জম্মু ও কাশ্মীরের উপর প্রয়োগ, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মতোই প্রভাব ফেলেছে। যাই হোক, আদালত কিন্তু বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। তার ফলে বাতিলের আইনি ইস্যুতে হেরে গিয়েও সরকার বড়াই করার অধিকার লাভ করেছে।
৪০০ পারের ব্যর্থতা
তাঁর ১০ বছরের শাসন অমৃত কালের
(স্বর্ণযুগ) সূচনা করেছে। এমন বিশ্বাসে আহ্লাদিত
হয়ে ২০২৪ সালের এপ্রিলে নরেন্দ্র মোদি লোকসভা নির্বাচনে ৪০০ আসন জয়ের লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছিলেন। আইএনডিআইএ বা ‘ইন্ডিয়া’
জোটের দলগুলি ‘সংবিধান রক্ষা করো’ স্লোগান দিয়ে জোরদার লড়াই চালিয়ে ছিল। এই স্লোগানটি বহু মানুষের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। কেন্দ্রে বিজেপির নেতৃত্বে আরও একটি সরকার গড়ার পক্ষে ভোট দিয়েও ভারতবাসী কিন্তু একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। তারা বিজেপিকে জিতিয়েছিল মাত্র ২৪০টি আসনে। আমরা জানি, সংখ্যাটি লোকসভায় ‘সিম্পল মেজরিটি’ বা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীচেই। নরেন্দ্র মোদির সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতাকে এই নিয়ন্ত্রণই এখনও পর্যন্ত ঠেকিয়ে রেখেছে।
বেপরোয়া আরএসএস কাজটি শুরু করে দিয়েছে:
• প্রথম তিরটি ছিল ‘এক দেশ, এক নির্বাচন (ওএনওই)’ নামক একটি সিউডো-ডেমোক্রেটিক বা ছদ্ম-গণতান্ত্রিক ধারণা। একটি পূর্ব-পরিকল্পিত রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছে এবং ‘মতামত’ সংগ্রহের জন্য একটি যৌথ সংসদীয় কমিটিকে সারা দেশে মানুষের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব চলবে যতক্ষণ না ‘এক দেশ, এক নির্বাচন (ওএনওই)’ সংক্রান্ত বিলগুলি পাস করার মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয়।
• পরের তিরটি ছুড়েছেন আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দদুটি জুড়ে দেওয়ার বিষয়কে তিনি ‘অসাংবিধানিক’ বলে অভিহিত করেছেন। এসব ‘অবাঞ্ছিত’ শব্দ সংবিধান থেকে হটানোরও দাবি জানিয়েছেন তিনি। কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলি হোসাবলের এই দাবির নিন্দা করেছে। হোসাবলের মন্তব্যে গুরুত্ব আরোপসহ ভারতের উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকরের পর্যবেক্ষণ ছিল, ওই দুটি শব্দ একটি ‘দগদগে ক্ষত’। হোসাবলের দাবি রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত করেছে এবং ওই বিতর্কে জগদীপ ধনকরের মতো ব্যক্তিত্ব প্রবেশ করায় আমাদের ভ্রু কুঁচকে উঠেছে বইকি।
সাম্প্রদায়িক আগুন জ্বালাতে
‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি হিন্দু রাষ্ট্রের সমর্থকদের কাছে ঘৃণ্য বা অশালীন হতে পারে, কিন্তু বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির বা বৈচিত্র্যে ভরা একটি বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক দেশ ধর্মনিরপেক্ষ ছাড়া আর কিছু হতে পারে কি? আমি ফরাসিদের প্রশংসা করি। তারা মুখ্যত ক্যাথলিক হয়েও ভীষণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। ‘সোশ্যালিস্ট’ বা ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দটির কোনও নির্দিষ্ট অর্থ নেই। একটি রাষ্ট্রকে কল্যাণকামী হিসেবে বোঝাতে ‘সোশ্যালিস্ট’ শব্দটি হামেশা ব্যবহার করা হয়। ভারত যে একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র, বিজেপি নিজেও তা অস্বীকার করতে পারে না। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দদুটির সংযোজন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন করেনি। প্রকৃতপক্ষে, সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৩ সালে রায় দিয়েছিল যে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সংবিধানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। আর ১৯৮০ সালে তারা আরও বলেছিল যে, ‘সমাজতন্ত্র’ রাষ্ট্রীয় নীতির ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপল বা নির্দেশিকার (ধারা ৩৬ থেকে ৫১) অন্তর্ভুক্ত। হোসাবলের দাবিটি কোনও সাংবিধানিক নীতি বা সামাজিক প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং সাম্প্রদায়িক শক্তি আগুন জ্বালানোর যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে কেবল তাতে ধুনো দেওয়ার জন্যই এটি উত্থাপিত হয়েছে।
যদি তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি), জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ), অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাঝাগম (এআইএডিএমকে), লোক জনশক্তি পার্টি (এলজেপি), জনতা দল সেকুলার (জেডিএস), ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি
(এনসিপি) এবং অন্যান্যরা আরএসএস/বিজেপিকে সমর্থন করে তবে তা হবে তাদেরই মূল নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দলগুলিকে এমন একটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে যাতে তারা অবশ্যই জিতবে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত