‘তোলাবাজি’—এই একটি শব্দই পশ্চিমবঙ্গে হয়ে উঠেছিল বিজেপির সবচেয়ে বড়ো নির্বাচনি স্লোগান। প্রতিটি জনসভায়, প্রতিটি সাংবাদিক বৈঠকে, প্রতিটি নির্বাচনি প্রচারে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিজেপির আক্রমণের অভিমুখ ছিল একটাই, ‘বাংলাকে তোলাবাজদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে।’ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভোটের আগে রাজ্যে এসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তোলাবাজির খেলা শেষ হবে। তোলাবাজদের উলটো করে ঝোলানোর নিদান দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও। দেখে শুনে মনে হচ্ছিল, ক্ষমতার পালাবদল হলেই যেন অভিধান থেকে মুছে যাবে তোলাবাজি শব্দটিই। কিন্তু বাস্তবে কী হল? বিজেপি সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই পরিবর্তনের বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, পতাকা বদলেছে ঠিকই, তোলাবাজির সংস্কৃতিতে বদল আসবে কবে?
দক্ষিণ কলকাতার বিজয়গড়ের একটি রিকশ স্ট্যান্ডে ভাড়ার বোর্ডে টাঙানো একটি পোস্টার সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে। বোর্ডে মাসিক ১০০ টাকা চাঁদা, তা তিনমাস বকেয়া থাকলে ৫০০ টাকা জরিমানা, পুরানো চালকদের ফের লাইনে নামতে ২,০০০ টাকা দেওয়ার মতো নানা নিদান লেখা রয়েছে। ওই বোর্ডে বিজেপির নির্বাচনি প্রতীক পদ্মফুলও ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয় রিকশচালকদের একাংশের অভিযোগ, নতুন কমিটি এই নিয়ম কার্যকর করছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠন বা বিজেপির বক্তব্য অবশ্য সামনে আসেনি। স্থানীয় গেরুয়া বিধায়ক অন্যান্য বহু বিষয় নিয়ে মুখর হলেও, এব্যাপারে অদ্ভুতভাবে নীরব। তবে ‘বর্তমান’-এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর পোস্টারটি আর রিকশ স্ট্যান্ডে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ঘটনাটি এমন একটি প্রশ্ন তুলেছে, যা এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়। আজ রাস্তাঘাটে, বাজার-দোকানে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, এলাকায় তোলাবাজ হিসাবে পরিচিত নেতা কীভাবে, কত কোটি টাকা দিয়ে বিজেপির শীর্ষ নেতা কিংবা এমএলএ-র কাছ থেকে ভালো তৃণমূল তকমা কিনে নিচ্ছেন সেই কাহিনি। হয়তো সেসব গল্প পুরোপুরি সত্য নয়, কিন্তু যা রটে, তার কিছুটা তো ঘটে! বাঙালির সমাজজীবনে রাজনৈতিক প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস নতুন নয়। একসময় সিপিএমের লোকাল কমিটি ছিল এলাকার অঘোষিত প্রশাসন। কে দোকান করবে, কে ব্যবসা করবে, কোথায় কী চলবে—এসব নিয়ে লোকাল কমিটির বিরুদ্ধে বহুবার দাদাগিরির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বাড়ির শরিকি ঝামেলাতেও লাল পার্টির সালিশিই ছিল নিয়ম। মানুষ সেই সংস্কৃতি মেনে নেয়নি। ভোটে জবাবও দিয়েছে। তারপর এল তৃণমূল। দিদি জমানায় প্রথম প্রথম সব ঠিক থাকলেও, অচিরে লোকাল কমিটির জায়গা নেয় তথাকথিত ‘দাদা কালচার’। স্থানীয় প্রতিটি আর্থিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডে দলীয় প্রভাব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, কাটমানি, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজির মতো শব্দগুলি বাংলার রাজনৈতিক অভিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। সেই ক্ষোভের উপর দাঁড়িয়েই নিজের রাজনৈতিক জমি তৈরি করেছে বিজেপি। তাই আজ যদি তাদের নামে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে মানুষের হতাশ হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ মানুষ শুধু দল বা পতাকার বদল তো চাননি। তাঁরা এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল চেয়েছিলেন।
দেশে হোক কি পশ্চিমবঙ্গে, রাজনৈতিক দলগুলি সর্বত্রই সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তুলছে। আইন আছে, আদালত আছে, সরকার আছে, পুলিশ আছে—কিন্তু জীবন-জীবিকার প্রশ্নে শেষ কথা বলছে শাসকদলের স্থানীয় কমিটিই। একজন রিকশচালক, হকার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে প্রশাসনের চেয়ে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সরকারের বিরুদ্ধে কেউ বেচাল কথা বললেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দরজায় পৌঁছে যাচ্ছেন ‘গেরুয়া নামধারী’ কিছু পাহারাদার। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব গত কয়েকদিন ধরে দলের নেতা-কর্মীদের তোলাবাজির বিরুদ্ধে সরব। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য থেকে পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংরা প্রায় প্রতিদিন কড়া ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। কিন্তু বক্তব্য আর কাজের মধ্যে ফারাক আকাশপাতাল। বিজয়গড়ের ঘটনায় যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে প্রকাশ্যে তা খণ্ডন করা হোক। আর যদি অভিযোগে সত্যতা থাকে, তাহলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। নীরবতা তো সম্মতির লক্ষণ! তোলাবাজি-গুন্ডাগিরির অভিযোগে সাসপেন্ড হওয়া অনেক বিজেপি কর্মীই দলের ‘ক্লিনচিট’ পেয়ে যাচ্ছেন একমাসের মধ্যে। আর পার্টির পাঠানো সেই দোষ খণ্ডনের চিঠি তাঁরা বুক ফুলিয়ে পোস্ট করছেন সমাজমাধ্যমে। হতাশা বাড়ছে সাধারণ মানুষের। লাল, সবুজ, গেরুয়া— বঙ্গবাসী সব পতাকাই দেখে ফেলা হয়ে গিয়েছে। প্রতিবারই বদলের স্লোগান ভোটের পর চলে গিয়েছে আস্তাকুঁড়ে। আজ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আর কোনো ‘নতুন লোকাল কমিটি’ কিংবা নতুন ‘দাদা’ চান না। তাঁরা চান এমন এক রাজনীতি, যেখানে জীবিকা নির্বাহের জন্য কোনো দলীয় অনুমতি লাগবে না। কোনো রেট চার্টের সামনে কাউকে মাথা নত করতে হবে না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কি সেকথা শুনতে পাচ্ছেন?