কলহার মুখোপাধ্যায়: বাসে ওঠার পর ঝগড়া করতে হয়নি এমন কে আছেন হাত তুলুন। এই প্রশ্ন করলে একটা হাতও কি উঠবে? মনে তো হয় না।
কলহার মুখোপাধ্যায়: বাসে ওঠার পর ঝগড়া করতে হয়নি এমন কে আছেন হাত তুলুন। এই প্রশ্ন করলে একটা হাতও কি উঠবে? মনে তো হয় না।
যাঁদের বাসে রোজ যেতে আসতে হয় কোনো না কোনোদিন তাঁদের অশান্তি, কথা কাটাকাটি করতেই হয়েছে হয় কন্ডাক্টরের সঙ্গে, নয় ড্রাইভারের সঙ্গে, নয় সহযাত্রীর সঙ্গে।
অশান্তি প্রথমে বাধে বাস চলা নিয়ে। ধীর গতিতে চলছে বাস। যাত্রীরা সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন না আশঙ্কায় ঝগড়া শুরু করলেন। কন্ডাক্টর-ড্রাইভারের এসব বিষয় গা সওয়া। পাত্তাই দিলেন না। যাত্রীরা চেঁচামেচি করলে বললেন, ‘নেমে যান।’ এদিকে টিকিট আগেই কাটা হয়ে গিয়েছে বলে যাত্রীরা নামতে পারছেন না। দ্বিতীয় অশান্তি শুরু হল এরপর। বাস হঠাৎ দিল গতি বাড়িয়ে। চলল পাশের বাসের সঙ্গে ভয়ঙ্কর রকমের রেষারেষি। প্রাণ হাতে হ্যান্ডেল ধরে বসে দুই বাসের যাত্রীরাই। এবার আবার প্রতিবাদ। আবার কন্ডাক্টরের সঙ্গে ঝগড়া। কিন্তু কোনো ফল হল না। এরপর তৃতীয় অশান্তি। তা শুরু হল সহযাত্রীর সঙ্গে সিটে ঠিকঠাক বসতে পারা নিয়ে। জানলার ধারের যাত্রী বেশি জায়গা নিয়ে বসে রয়েছেন, অন্যজন ঠিকমতো বসতে পারছেন না। এই নিয়ে লাগল এবার ঝগড়া। সমস্যাটা কিন্তু এই দু’জনকে ঘিরে মোটেও নয়। সিট এমনভাবে বানানো যে, দু’জন কোনোভাবেই পাশাপাশি ঠিকঠাক বসতে পারবেন না। সিট ছোটো কারণ বাসের ভিতরে যাতে স্পেস বেশি থাকে, যাতে বেশি লোক দাঁড়াতে পারেন। সিট কোন মাপে বানাতে হবে সে সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশ আছে। কিন্তু সে নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেসরকারি বাসগুলি নিজেদের সুবিধামতো বসার আসন তৈরি করে নেয়। আর সমস্যা পোহাতে হয় যাত্রীদের। এবার চতুর্থ ঝগড়া শুরু টিকিট কাটা নিয়ে। কারও কাছে খুচরো টাকা নেই। কন্ডাক্টর যা না তাই শুনিয়ে দিলেন তাঁকে। পঞ্চমবার ঝগড়া শুরু হল নামার সময়। রেষারেষিতে জিততে স্টপেজে দাঁড় করাননি চালক। অনেকটা এগিয়ে দাঁড়িয়েছেন। এবার যাত্রীদের হেঁটে যেতে হবে। ষষ্ঠ ঝগড়াটা লাগে অত্যধিক ভিড়ের কারণে। দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত নেই, অথচ কন্ডাক্টর যাত্রী তুলেই চলেছেন। আর সমানে বলে যাচ্ছেন, ‘পিছনের দিকে এগিয়ে চলুন।’
মানুষ এগয় সামনের দিকে, পিছনে চলার অর্থ পিছিয়ে পড়া। অবনমন। অবনতি। বাসের অবস্থা এখন এমনই যে, পরিষেবার দিক থেকে ক্রমশ পিছিয়েই চলেছে সে। শহরের অন্যতম লাইফলাইনের চাকা এখন ক্রমশ অবনতির দিকেই গড়াচ্ছে। কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধানের কোনো চেষ্টা নেই কারও, না নীতি নির্ধারকদের, না বাস মালিকদের, না তাদের সংগঠনগুলির। সবমিলিয়ে বিড়ম্বনা, বিশৃঙ্খলা ও অনিরাপত্তার ছবি রাজ্যজুড়ে, সর্বত্র।
স্বপন দাসের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আটবছর আগে। তাঁর বাবা একটি চায়ের দোকান চালান সল্টলেকের সংযোজিত অঞ্চল নয়াপট্টিতে। ফ্যামিলিটি দরিদ্র। স্বপন খুব মেধাবী ছাত্র। ভালো রেজাল্ট করেন। একটি বহুজাতিক সংস্থার লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেন। ইন্টারভিউ দিতে করুণাময়ী থেকে বাসে যাচ্ছিলেন এসপ্ল্যানেড। বাসটি ঝাড়া আধ ঘণ্টা দেরি করে। দেরিতে পৌছনোর কারণে ইন্টারভিউ দিতে পারেননি। চাকরিটাও পাননি স্বপন। বলেছিলেন, ‘পকেটে তেমন টাকা ছিল না যে, ট্যাক্সিতে বা অটো চেঞ্জ করে করে যেতে পারতাম।’
অন্যদিকে অভিযোগ, অধিকাংশ বাসের হাল খারাপ। উদ্বেগজনক অবস্থা। পুরানো গাড়ি, খারাপ ব্রেক, অন্দরমহলের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর, কালো ধোঁয়া ইত্যাদি। সবমিলিয়ে যাত্রীরা প্রতিদিন
ঝুঁকি নিয়েই বাসে উঠতে বাধ্য হন। গরমকালে অনেক বাসে পর্যাপ্ত বাতাস পর্যন্ত চলাচল করতে পারে না। প্রতিবন্ধী বা প্রবীণদের জন্য পরিকাঠামো প্রায় নেই। সিট ছেঁড়া। দরজার সামনে ধরবার জন্য কোনো রড পর্যন্ত নেই। ফলে যে কেউ যখন তখন নামতে বা উঠতে গিয়ে বাস থেকে পড়ে যেতে পারেন। এমনকি দরজা দিয়ে রাস্তায় গিয়েও আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। এ নিয়ে এক কন্ডাক্টর দিয়েছিলেন ভয়ঙ্কর তথ্য। সামনের দিকে রড লাগান না তাঁরা কারণ যাত্রীরা সেখানে দাঁড়িয়ে গেট জ্যাম করে দেন। দেখে মনে হয় ভিড় আছে। ফলে বাসে ওঠেন না স্টপেজে থাকা লোকজন। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিন্তু এতে তো দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষ মারাও যেতে পারেন! কন্ডাক্টর বলেছিলেন, ‘রাস্তায় বেরলে তো দুর্ঘটনা হবেই। এতসব ভাবলে বাসের ব্যবসা তুলে দিতে হয়।’
এটা শুধুমাত্র একজন কন্ডাক্টরের বাক্য বা
দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র নয়। এটা রাজ্যের বাস পরিচালন ব্যবস্থার খুনি দিকটিই তুলে ধরে। যে ব্যবস্থা মানুষের মৃত্যুর পরোয়া পর্যন্ত করে না। মুনাফার জন্য নিরীহ মানুষকে দুর্ঘটনার মুখোমুখি করতে এমনকি মেরে ফেলতেও বিন্দুমাত্র ভাবে না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে।
বাস সংগঠনগুলি সরকারের সঙ্গে মাঝে মধ্যে আলোচনায় বসে। সামনের কোনো বৈঠকে হয়তো তেলের দাম বৃদ্ধিজনিত মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দেবে সংগঠনগুলি। অন্যান্য অনেক বিষয়ই আলোচনায় উঠবে। কিন্তু যাত্রীদের সুযোগ সুবিধার দিকটি ঢাকাই পড়ে থাকবে যেমন প্রতিবার হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের কত তো দাবিদাওয়া থাকে! সব কি পূরণ সম্ভব? এই বলে তা উড়িয়ে দেওয়ার রীতি আছে আমাদের দেশে। পরিবহণ ব্যবস্থাও এর বাইরে নয়। কিন্তু এই উড়িয়ে দেওয়ার পরিণতি মারাত্মক। কারণ রাস্তায় বাস চলাচলের সঙ্গে জড়িয়ে মানুষের জীবন। দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়।
২০২৪ সালে শুধু বাস-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন ২৭৭ জন মানুষ। মৃত্যু ছ’জনের।
২০২২ সালে বাস-সম্পর্কিত দুর্ঘটনায় মোট ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ৩৩০। ২০২৩ সালে তা কিছুটা কমে ২৯৯ হয়। ২০২৪ সালে সে সংখ্যা আবার বেড়ে হয় ৩৬৫।
অতিরিক্ত যাত্রী তুলতে গিয়ে রেষারেষি, বেশি টাকা মুনাফা লোটার এই ফিকিরের সঙ্গে জড়িয়ে মানুষের জীবনহানি। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর একটি পরিবার প্রায় পথে বসে। তার দায় কে নেবে? বাসচালক কি নেবেন? যাঁর পায়ের উপর বাসের চাকা তুলে দিয়ে পঙ্গু করে দিয়েছিলেন চালক, তাঁর সংসার চালানোর দায়িত্ব বাসমালিক নেবেন? না, নেন না। নেবেনও না। তাহলে শুধুমাত্র মুনাফার জন্য দিনের পর দিন যাত্রী বা পথচারীদের ক্ষতিসাধন করে কী করে পার পেয়ে যান একশ্রেণির চালক-কন্ডাক্টর? কোনো দুর্ঘটনার পর এ প্রশ্ন কি ওঠে? ওঠে না। সামান্য বিক্ষোভ ইত্যাদি হয়। তারপর আবার তা চাপা পড়ে যায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে। বাস পিছনের দিকেই এগিয়ে চলে।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হল, বেসরকারি বাস ব্যবস্থার ট্রিপ কালচার। অর্থাৎ যত বেশি ট্রিপ দেওয়া যাবে তত বেশি আয়। শহরের বহু বড়ো দুর্ঘটনা এই রেষারেষির কারণেই ঘটে।
তবু এই কঠিন-করুণ বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ বাসে না উঠে পারে না। কারণ বাস এখনও অন্যতম সস্তা ও সহজলভ্য গণ পরিবহণ। শহরের শ্রমজীবী, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং ছাত্র-ছাত্রীরা বাসের উপরই নির্ভরশীল। তাই এই ব্যবস্থার উন্নতি শুধুমাত্র পরিবহণের প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিক ন্যায়েরও প্রশ্ন। পাশাপাশি নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নও বটে। খুচরো না থাকার কারণে কন্ডাক্টরের কাছে অপমানিত হচ্ছেন একজন শিক্ষক! এই প্রবণতা মোটেও কাম্য হতে পারে না। তা হলে ধরে নিতে হবে এটি একটি সামাজিক অব্যবস্থার কলঙ্কময় উদাহরণ হিসাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
সবমিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, বিশৃঙ্খল ও ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে বাস ব্যবস্থা। সরকারি বাস মহিলাদের জন্য ভাড়ামুক্ত হয়েছে। এবার বাস সংগঠনগুলির সঙ্গে সরকারের বৈঠকের পর যাত্রীদের সমস্যাগুলির সমাধান হোক। রাস্তায় বাসের সংখ্যা অস্বাভাবিক ভাবে কমে গিয়েছে। অনেক রুট বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
বহু রুটে বাস কমে চলছে সেই করোনার সময়কাল থেকে। সরকারিভাবে ভাড়া বৃদ্ধির কথা ঘোষণা
হয়নি বলে অনেকসময় যথেচ্ছ ভাড়া নিচ্ছেন কন্ডাক্টররা। সবমিলিয়ে সসেমিরা অবস্থা সাধারণ মানুষের, নীতি নির্ধারকদেরও। যে মানুষগুলি ভোট দিয়ে নয়া সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে তাঁদের স্বার্থে এবার বাস নিয়ে কড়া সিদ্ধান্ত নিক প্রশাসন। এই দাবি সাধারণ মানুষের অধিকারের মধ্যে পড়ে। তা উড়িয়ে দিলে একদিন না একদিন পস্তাতে হবে সকলকেই। এখন যেমন মানুষের দাবি উড়িয়ে দেওয়ার ফলে অনেকে পস্তাচ্ছেন।