প্রশ্ন: অতিরিক্ত মাত্রায় আত্মবিশ্বাস হলে সেটা কি অহং-এর পর্যায়ে পড়ে? এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অহং-এর কি কোন যোগ আছে?
প্রশ্ন: অতিরিক্ত মাত্রায় আত্মবিশ্বাস হলে সেটা কি অহং-এর পর্যায়ে পড়ে? এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অহং-এর কি কোন যোগ আছে?
উত্তর: আত্মবিশ্বাসটা সাধারণভাবে দেখলে সেটা নিশ্চয়ই অহংকারের মতই দেখায় এবং এর সঙ্গে অহংকারের যে কোনও যোগ নেই তাও বলা যায় না। কারণ, আত্ম মানেই একটি অহং সত্তা। কাজেই ব্যাপক দৃষ্টিতে ব্যাপকভাবে বিচার করলে আত্মবিশ্বাস মানে নিজের প্রতি আস্থা অর্থাৎ অহং তত্ত্বের প্রতি আস্থা। অথচ দেখা যায়, জীবনে উন্নতি করতে হলে আত্মবিশ্বাসের একান্ত প্রয়োজন। সাধারণভাবে জাগতিক ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অহং-এর যোগ থাকলেও এ নিয়ে আত্মবিশ্বাসীর মনে কোনও প্রশ্ন জাগে না। সে অহংপ্রসূত আত্মবিশ্বাসের জোরে এগিয়ে চলে এবং সাফল্যমণ্ডিত হলে মনে করে প্রবল আত্মবিশ্বাসই তাকে সাফল্য এনে দিয়েছে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অহং-এর যোগসূত্র আছে কিনা, ও-প্রশ্নটা বিশেষ ভাবে ওঠে ধর্মপথের পথিকদের মনে। সে ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, আত্মবিশ্বাস নিশ্চয়ই প্রয়োজন কিন্তু সে আত্মবিশ্বাস আশ্রয় করবে ভগবৎতত্ত্বের অহংকে। তখনই এর সম্পূর্ণ রূপটা পালটে যাবে। তখন আমার আত্মবিশ্বাসটা—আমি ভগবানের আশ্রিত, আমি তাঁর সন্তান, আমি তাঁর দাস, এই ভাবের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
এ আত্মবিশ্বাসে একদিকে যেমন এগিয়ে যাবার প্রেরণা ও অটুট মনোবল থাকে তেমনি আর একটি দৃষ্টি থাকবে তাঁর ইচ্ছার, তাঁর ইঙ্গিতের দিকে, তাঁর চিন্তা জড়িয়ে থাকবে তাঁর প্রতি গভীর অনুরাগ ভরা বিশ্বাসের সঙ্গে। এতে শক্তিও আছে আনন্দও আছে। এই আত্মবিশ্বাস কখনও সাধককে নিরাশার অন্ধকারে ডুবে যেতে দেয় না। অনেকেই মনে করে এই অসাফল্য যেন ভগবানের দেওয়া ক্ষণিক বিরতির ইঙ্গিত। তবে একটা কথা, ভগবানের শরণাগত আত্মবিশ্বাসীর সংখ্যা খুবই কম বলা চলে। কারণ, দেখা যায় সাধনার পথে বা দিব্য কর্মপথে নানা বাধাবিপত্তির আক্রমণে ভক্ত বা সাধক মাঝে মাঝে বেশ হতাশ হয়ে পড়ে। মনে হয়, এই বুঝি ভগবান তার সামনে থেকে সরে গেছেন। সেই মুহূর্তে সে আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলে। একটি সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভক্তের আত্মবিশ্বাসের এইখানেই মস্ত বড় তফাৎ। কারণ, ভক্তের আত্মবিশ্বাস ভগবৎ-বিশ্বাসের আশ্রয়চ্যুত হওয়ার সম্ভাবনাতেই দারুণভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। তার তখন একমাত্র অবলম্বন আকুল প্রার্থনা। ভগবৎ-বিশ্বাসের প্রার্থনা, মনোবল ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা, সবই সে করে ঈশ্বরের দিকে দুহাত বাড়িয়ে। আত্মবিশ্বাসী ভক্তের আত্মবিশ্বাস একটি মাতৃক্রোড়াশ্রিত শিশুর বিশ্বাস। মাতৃক্রোড়ের স্পর্শটুকু যতক্ষণ অনুভব করতে পারে ততক্ষণ তার বিন্দুমাত্র শঙ্কা বা বিন্দুমাত্র ভয় থাকে না।
শ্রীঅর্চনাপুরী মায়ের বাণী ‘ছড়ানো মুক্তো’ থেকে