মৃণালকান্তি দাস: আকাশপথে কলকাতা থেকে বালুচিস্তানের প্রধান শহর কোয়েট্টার দূরত্ব প্রায় ২২৮৬ কিলোমিটার। এই শহরে এখনও রয়েছে হাতেগোনা কিছু বাংলাভাষীর বাস। শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে রয়েছে হুদ্দা নামে একটি এলাকা। প্রদেশের সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তায় ঢাকা কারাগারটি এখানেই। যেখানে ২০০ ফুটের একটি সেলে বন্দি মাহরাং বালুচ। ওই কারাগারে তাঁর মতো বহু বালুচ তরুণ-তরুণী বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ রাজবন্দিদের রাখা হয় নির্জন সেলে। মাহরাংও সেই রকম এক সেলে বন্দি।
‘হুদ্দা’ পাকিস্তানের এক মহাসংকটের প্রতীক! এখানে রাজনৈতিক বন্দিরা যত বেশি দিন বন্দি থাকেন, বালুচ সমাজে তত বেশি তাঁরা ভালোবাসার পাত্র হয়ে ওঠেন। তাঁদের প্রতি ভক্তি-ভালোবাসায় আরও তরুণ-তরুণী তাঁদেরই পথে পা বাড়ায়। এভাবেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে এক প্রতিপক্ষ তৈরি করে ফেলেছে। তবে এটা শাসকগোষ্ঠীর টিকে থাকারও শর্ত। বছরের পর বছর ধরে তারা সামরিকায়নের মধ্যেই নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে চলেছে। কখনো অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য, কখনো নিজের জনগণের বিরুদ্ধে নামার জন্য। ইসলামাবাদ চায়, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বালুচিস্তানকে মাথানত করতে!
১৯৪৭–এর আগস্টের আগে পাকিস্তান বলে কোনো দেশ ছিল না। কিন্তু কালাত বলে বালুচদের একটা ভূখণ্ড ছিল। লর্ড লিটনের আমলে আগ্রাসনের পর ১৮৭৬ থেকে ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সীমিত স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত তারা। তখন নাম হয়েছিল ‘ব্রিটিশ বালুচিস্তান’। কিছু বালুচ জনপদের বিস্তার এর মধ্যে ইরান সীমান্তেও চলে আসে। যার নাম এখন সিস্তান-বালুচিস্তান।
দক্ষিণ এশিয়া থেকে ঔপনিবেশিক শক্তি বিদায়ের মুহূর্তে ‘সর্দারি সামন্ততন্ত্র’ থেকে মুক্তির প্রস্তুতিতে নেমেছিল বালুচরা। একটা সংবিধানও লিখে ফেলেছিল। ১৯৪৭–এর ১১ আগস্ট কালাত স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কয়েক দিন পরই জিন্নার গভর্নরশিপে কালাতের পাশে জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানের। ইতিমধ্যে কালাতের ছোটো ছোটো কিছু আদিবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে পাকিস্তান সরকার। তাদের পাকিস্তানভুক্তিতে রাজি করানো হয়। সেই সম্মতিকে সনদ হিসেবে দেখিয়ে ১৯৪৮–এর মার্চে পাকিস্তান আর্মি ঢুকে পড়ে কালাতে। জোর করে কালাত পাকিস্তানভুক্ত করা হয়। যা সাধারণ বালুচরা কখনো চায়নি। এরপর থেকেই বালুচ ভিন্নমতাবলম্বীদের জেলে ভরা শুরু। প্রথম দিকে বিদ্রোহ করেন স্বাধীনচেতা ‘সর্দার’রা। স্বাধিকার ফিরে পাওয়ার সেই সংগ্রাম নানা চড়াই–উতরাই পেরিয়ে এখন ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। লড়াইয়ের নেতৃত্ব এখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীরা।
বালুচিস্তানের মানবিক সম্ভ্রম এবং অর্থনৈতিক সম্পদ হারানোর বিস্তারিত বিবরণের বড়ো সূত্র বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠকদের অনেকে ইতিমধ্যে নিহত বা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন। মূলত নিখোঁজ-কাণ্ডের বিরোধিতা থেকে বালুচদের গণ–আন্দোলনের শুরু এবং সেটা এখন উপনিবেশ–বিরোধী সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। আগে বালুচ সমাজকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সর্দাররা। যাঁদের সাহসী অংশ ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন। আপসকামী অংশ গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। পাকিস্তানের অধীন প্রদেশ হিসেবে বালুচিস্তানে যখনই সুষ্ঠু কোনো নির্বাচন হয়েছে, তখনই সেখানে স্থানীয় দলগুলি জিতেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তাদের স্বচ্ছন্দে কাজ করতে দেয়নি। ফলে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি বালুচদের এখন আর কোনো আস্থা নেই।
কোয়েট্টায় সরিয়াব রোডে ইউনিভার্সিটি অব বালুচিস্তানের শিক্ষার্থীদের প্রিয় পাঠ্য মাও, হো চি মিন, চে, ফ্রানৎস ফানোঁ প্রমুখ। ফানোঁর দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ (উর্দু অনুবাদ: উফতাদগান-ই-খাক) অত্যন্ত জনপ্রিয়। মাহরাং সমাবেশগুলিতে ফানোঁর বই থেকে লাইন পড়ে শোনাতেন। তাঁরা অহিংস সংগ্রামের ধারা খোঁজার চেষ্টা চালিয়েছেন। যদিও এখন অহিংস সংগ্রামের সুযোগ কমছে প্রতিদিন। মাহরাংয়ের জেলজীবন তার বড়ো উদাহরণ। ফলে আন্দোলনের মূল ধারা হয়ে উঠছে সশস্ত্র। বালুচ তরুণদের ভাষায় ‘এটাই জীবনের দাবি’। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভয়ঙ্কর অপারেশনও তাঁদের দমাতে পারছে না। তবে বালুচদের যুদ্ধের ফ্রন্ট একটি নয়!
বালুচিস্তানের খনিজভাণ্ডার বিপুল। শুষ্ক চাগাই মরুভূমি অঞ্চলের সেইন্দাক ও রেকো ডিকে রয়েছে সোনা ও কপারের খনি। প্রায় ছয় বিলিয়ন টন আকরিকের মজুত নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো অনুত্তোলিত কপারের খনি আছে বালুচিস্তানের এই চাগাই জেলায়। এসব খনিজ উত্তোলনের জন্য যেসব কোম্পানি তৈরি হচ্ছে এবং যারা কাজ পাচ্ছে, তাতে অতি সামান্য হিস্সা রয়েছে বালুচদের। এখানে আমেরিকার যে বড়ো কোম্পানিটির নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, সেই ‘বাররিক মাইনিংয়ে’-র সদর দপ্তর কানাডায়। ২০২৪–এ বাররিকের ঘোষিত আয় ছিল তিন বিলিয়ন ডলার। চাগাই প্রকল্প থেকে তাদের প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার আয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে সোনা মিলবে ৫৪ বিলিয়ন ডলারের, বাকিটা কপার থেকে।
অথচ, চাগাই পাকিস্তানের গড় হিসাবে সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা। চাগাই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড়ো জেলা (১৭ হাজার বর্গমাইল) হলেও লোকসংখ্যায় ১৪৫টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম। এখানে মাত্র আড়াই লাখ মানুষের বাস। মানুষ কম হওয়ায় স্বভাবত সম্পদ হারানোর প্রতিরোধ ও প্রতিবাদও কম। ফলে এত কপার ও সোনা বালুচদের ভাগ্য বদল করতে পারেনি। কারণ, রাজনীতি, প্রশাসন কোথাও তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক মিত্ররা ও তাদের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলি এই নিয়ে মাথা ঘামায় না। এই কারণে বালুচরা কেবল ইসলামাবাদ নয়, একই সঙ্গে চীন-আমেরিকারও বিরোধী।
গত ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা চাগাইয়ের রেকো ডিকে ১৩০ কোটি ডলারের খনিজ প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছে। এই প্রকল্পের নাম দিয়েছে এফওআরজিই (ফোরাম অন রিসোর্স জিওস্ট্র্যাটেজিক এনগেজমেন্ট)। ‘এফওআরজিই’কে বলা হচ্ছে এই অঞ্চলে ট্রাম্পের কূটনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়। আমেরিকার এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান জন জোভানোভিক গত নভেম্বরে জানিয়েছিল, তাঁরা দুর্লভ কিছু খনি অঞ্চলে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চলেছেন। জোভানোভিকের এই ঘোষণার দুই মাস আগেই ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালস (ইউএসএসএম) এবং পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন বালুচিস্তানে ‘খনিজ বিষয়ে কৌশলগত সহযোগিতা’র নামে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে। এই মুহূর্তে ইউএসএসএম হল আমেরিকার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়া সংস্থা। পাকিস্তানে তারা একটা পলি-মেটালিক রিফাইনারি বানাবে বলে প্ল্যান করেছে। এসব কারণেই আমেরিকা সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামাতে আসরে নেমেছিল। আর ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বালুচিস্তানের খনিজ সম্পদের উপর ভিত্তি করেই পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। একই কারণে, জেলে বন্দি থাকতে হচ্ছে ইমরান খানকেও। তবে বালুচিস্তান নিয়ে চীনের আগ্রহ আরও পুরানো।
২০১৫ সালে চীন তার বিআরআই প্রকল্পের অংশ হিসেবে ইসলামাবাদের সঙ্গে মিলে বালুচিস্তানে অর্থনৈতিক করিডর গড়তে শুরু করে। ভূকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে চীনের একতরফা উপস্থিতি আমেরিকার পছন্দ ছিল না। ভারতও বিআরআই প্রকল্পে যোগ দেয়নি। বালুচরাও শুরু থেকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরে অসন্তুষ্ট। গদর বন্দর চীনের হাতে যাওয়া নিয়ে তারা ক্ষুব্ধ। তাদের বক্তব্য, এসবে স্থানীয়দের কোনো লাভ হচ্ছে না। পাকিস্তান ও চীন সরকারই কেবল এসবের সুবিধাভোগী। ইতিমধ্যে চীনের অনেক নাগরিক বালুচদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। মারাও গিয়েছে। আত্মঘাতী হামলাও ছিল একাধিক। কিছু হামলা হয়েছে সুদূর করাচিতেও। পাকিস্তানে চীনের প্রায় ২০ হাজার নাগরিক বিভিন্ন ধরনের কাজে যুক্ত রয়েছে। এত মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া পাকিস্তানের জন্য বড়ো সামরিক চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক করিডর রক্ষায় প্রচুর সেনা মোতায়েন রাখতে হয়। পাকিস্তান সরকার চীনের কর্মীদের রক্ষায় গত জানুয়ারিতে বিশেষ পুলিশ ইউনিটও তৈরি করেছে। এরপরও যদি হিংসা ঘটে, তখন তারা ভারতকে একতরফা দোষারোপ করা শুরু করে। এটাই ইসলামাবাদের পিঠ বাঁচানোর কৌশল!
পাকিস্তান কখনো স্বীকার করে না, ইসলামাবাদে গুরুত্বহীন হয়েই বালুচদের মিছিলের জন্য বেছে নিতে হয় কোয়েট্টা, চমন বা গদরের রাস্তা। সেখানে দাঁড়াতে দেওয়া না হলে চলে যায় পাহাড়ি অঞ্চলে বন্দুকের খোঁজে। রাজনীতি যেখানে শেষ, হিংসা সেখানেই শুরু। ২০২৬–এর প্রথম তিন মাসে হিংসায় বালুচিস্তানে মারা গিয়েছে ৪৪৩ জন। বহুমাত্রিক বঞ্চনার যোগফল আজকের বালুচিস্তানের এই পরিস্থিতি। যেখানে বালুচরা ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ চলে গিয়েছে। আর পালটা বালুচ পাড়াগুলিতেও প্রতিটি রাস্তায় পাক সেনাবাহিনীর চেকপোস্টের সংখ্যা কেবল বাড়ছে।
এই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আগামী ১১ আগস্ট বালুচিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করেছেন বালুচ লিবারেশন আর্মির নেতা মির ইয়ার বালোচ। বালোচ জনগণকে বিশেষ এই দিনটি উদযাপনের আর্জি জানানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, স্বাধীন বালুচিস্তানকে সমর্থনের আর্জি জানানো হয়েছে বিশ্বের কাছে।
তাহলে কি বাংলাদেশের পর দেশের বৃহত্তম অংশ খোয়াতে চলেছে পাকিস্তান?