নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বিধবা বিবাহ শুরুর জন্য জাতি যদি কারও কাছে ঋণী থাকে তাহলে সে নামটি অবশ্যই বিদ্যাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। অখণ্ড বঙ্গ বা স্বাধীনতা পূর্ব ভারতের প্রথম বিধবা বিবাহের আসর কোথায় বসেছিল? এর উত্তর অনেকে জানেন। আবার অনেকেরই অজানা। কলকাতার বুকেই রয়েছে সেই বাড়ি। যেখানে বিদ্যাসাগরের উপস্থিতিতে বিধবা এক মহিলার বিবাহ হয়। আশ্চর্যের বিষয়, সেই বাড়িটির নাম সরকারি হেরিটেজের খাতায় নেই। কলকাতা পুরসভার কাছে ২০২২ সালের সর্বশেষ সংশোধিত যে হেরিটেজের তালিকা রয়েছে তাতে কলকাতার ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের কৈলাস বোস স্ট্রিটের সেই বাড়িটির কোনও উল্লেখ নেই।
কলেজ স্ট্রিট থেকে ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি হয়ে বিধান সরণি ধরে সিমলার দিকে কিছুটা এগলে ডান হাতে প্রসিদ্ধ এক মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। তার ঠিক পাশে ডান দিক বরাবর ঢুকে গিয়েছে কৈলাস বোস স্ট্রিট। উত্তর কলকাতার আর পাঁচটা সাবেকি রাস্তার মতোই সেটির চেহারা। কিছু দূর এগলে ডান হাতের ফুটপাতে হলদে রঙের দোতলা বাড়ি। ঠিকানা, ৪৮ এ কৈলাস বোস স্ট্রিট। বহু বছরের পুরনো বাড়ি। একাধিকবার সংস্কার হয়েছে। বাড়ির বাইরের অংশে মেরামতির ছাপ স্পষ্ট। তবে ভিতরের সাবেক অন্দরসজ্জা একই রয়েছে। জানা যায়, বিদ্যাসাগরের উপস্থিতিতে এই বাড়িতে স্বাধীনতা পূর্ব ভারতের প্রথম বিধবা বিবাহ হয়েছিল। বাড়ির মালিক রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কন্যা পক্ষের তরফে। বিদ্যাসাগর ছিলেন পাত্রপক্ষের তরফে। বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রমুখ।
১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন পাশ হয়। যা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনের অধীনে ভারতের সমস্ত বিচার ব্যবস্থায় বিধবাদের পুনর্বিবাহকে বৈধ করে। তারপর ১৮৫৬ সালের সাত ডিসেম্বর প্রথম বিধবা বিবাহের আসর বসে এই বাড়িতে, আজ থেকে ১৬৯ বছর আগে। পাত্র গোবরডাঙার খাটুয়া গ্রামের বাসিন্দা সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক এবং বিদ্যাসাগরের সহযোগী শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। পাত্রী বর্ধমানের বাল্য বিধবা কালীমতি। ভারতের সেই গৌরবময় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী বহন করে চলেছে বাড়িটি। বর্তমানে বাড়ির মালিকরা এখানে থাকেন না। এক নিরাপত্তা কর্মী রয়েছেন। তাঁর নাম হাসিবুর রহমান। তিনি বাড়িটি আগলে রেখেছেন। রয়েছেন এক ব্রাহ্মণ। তিনি নিয়মিত বাড়ির মন্দিরে পুজো দেন। এমন ঐতিহাসিক একটি ভবন কলকাতা পুরসভার হেরিটেজ বিল্ডিংয়ের তালিকায় নেই কেন? কেন হেরিটেজ তকমা মেলেনি? বহু মানুষ এ প্রশ্ন তুলছেন।
পুরসভার পরিবেশ ও হেরিটেজ বিভাগের মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার বলেন, ‘আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। প্রথম বিধবা বিবাহের মতো ঐতিহাসিক ঘটনা যদি ওই বাড়িতে হয়ে থাকে তাহলে খোঁজখবর নেব। নথিপত্র দেখতে হবে। সঠিক প্রমাণ হলে রাজ্যের হেরিটেজ কনজারভেশন কমিটির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে। যাতে বাড়িটিকে হেরিটেজ তালিকাভুক্ত করা যায়।’ বিভাগীয় আধিকারিকরা জানান, সঠিক নথিপত্র পাওয়া খুব জরুরি। সম্প্রতি খিদিরপুরে মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি বিজড়িত একটি বাড়ির হেরিটেজ তকমা নিয়ে আদালতে মামলা হয়। তাতে হেরে যায় পুরসভা। ইতিহাসবিদদের এবং অন্যান্য নথিপত্রে ওই বাড়িতে যে মধুসূদন দত্ত থাকতেন তার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তবুও আদালত বইয়ে থাকা তথ্যের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে পুরসভা উচ্চ আদালতে মামলা করছে। তাই কৈলাস বোস স্ট্রিটের এই বাড়ির মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। প্রামাণ্য নথিপত্র খতিয়ে দেখে হেরিটেজ তকমার বিষয়টি নিয়ে এগনো হবে।