Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

সাড়ে তিনশো বছর আগে দুই বিগ্রহের বিবাহেই সূচনা হয় শান্তিপুরের রাসের

প্রাচীন ঐতিহ্য, পৌরাণিক বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতায় আবারও মুখরিত হতে চলেছে শান্তিপুর।

সাড়ে তিনশো বছর আগে দুই বিগ্রহের বিবাহেই সূচনা হয় শান্তিপুরের রাসের
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: প্রাচীন ঐতিহ্য, পৌরাণিক বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতায় আবারও মুখরিত হতে চলেছে শান্তিপুর। উৎসব মরশুমের শেষ সুর এখন বাঁধা হবে শান্তিপুরের ঐতিহাসিক রাস উৎসবের মঙ্গলতানে। ইতিমধ্যেই শহরজুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে জোরকদমে প্রস্তুতি। কয়েকশো বছরের ঐতিহ্য, দেবভক্তির দীপশিখা আর লোকসমাগমের মহা উৎসবে ফের আলোকিত হবে নদীয়ার এই প্রাচীন জনপদ। আর শান্তিপুরের রাস মানে, অদ্বৈত প্রভুর পরিবার, বড় গোস্বামী বাড়ির রাস উৎসবের প্রসঙ্গ আসে সবার আগে। 

Advertisement

শান্তিপুরের রাস উৎসবের ইতিহাস কমপক্ষে পাঁচ শতাব্দীর পুরনো। তবে তার খ্যাতির বিস্তার প্রায় দেড়শো বছর আগের। ইতিহাস বলে, বড় গোস্বামী পরিবারের পূজিত বিগ্রহ রাধারমণের সঙ্গে শ্রীমতি বিগ্রহের বিবাহের পরই শান্তিপুরে রাস উৎসবের প্রকৃত সূচনা। প্রায় ৩৫০ বছর আগে রাসপূর্ণিমা তিথিতে হয় সেই দেবদম্পতির বিবাহ। বিবাহের তৃতীয় দিনে ‘বউভাত’-এ নববধূর দর্শন করাতে নগর পরিক্রমার প্রথা চালু হয়। তাতেই সকল নগরবাসী শ্রীমতি দর্শনের সুযোগ পান। পরে সেই নগর পরিক্রমা শোভাযাত্রার রূপ নেয়। ক্রমে বিগ্রহ বাড়ির সংখ্যা বাড়ে এবং বারোয়ারি রাসের আয়োজনে শান্তিপুরে ব্যাপকতা লাভ করে এই শোভাযাত্রা। বড় গোস্বামীর পরিবারের শিষ্যকুল শান্তিপুরের খাঁ চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগে শুরু হওয়া সেই ঐতিহ্য আজও অমলিন। বড় গোস্বামী পরিবারের বর্তমান সদস্য সত্যনারায়ণ গোস্বামী বলেন, আগে শ্রীমতি পূজিত হতেন না। সেই প্রচলন শুরু হয়ে পরে।    এদিকে, বর্তমানে শান্তিপুরে প্রায় ৩০টি বিগ্রহবাড়িতে পালিত হয় রাস উৎসব, যার মধ্যে কমপক্ষে ১৫টি বিশেষভাবে দর্শনীয়। অধিকাংশই অদ্বৈত আচার্যের বংশধরদের আয়োজিত রাস। ভাঙা রাসেই শুধু ১২টির কাছাকাছি শোভাযাত্রার আয়োজন হয়। বড় গোস্বামী, মেজো গোস্বামী, ছোট গোস্বামী, মদন গোস্বামী, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী— এমন অসংখ্য প্রাচীন বিগ্রহবাড়ি আজও বহন করে ঐতিহ্যের ধারা। কাঁচের ফানুস, মখমলের পর্দা, পৌরাণিক চরিত্রের সাজ— সব মিলিয়ে এখানকার শোভাযাত্রা আজও চোখ ধাঁধানো।
পুরাণ মতে, দ্বাপর যুগে বৃন্দাবনে গোপিনীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা দেখার বাসনা করেছিলেন মহাদেব। কিন্তু পুরুষরূপে প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় নারী বেশে বৃন্দাবনে প্রবেশ করলেও, শ্রীকৃষ্ণ তা বুঝে ফেলেন এবং সেই লীলা অপূর্ণই রয়ে যায়। তখনই মহাদেব সংকল্প নেন— কলিযুগে বিশ্ববাসীকে তিনি সেই লীলার সাক্ষী করবেন। শাস্ত্র মতে, সেই সংকল্প রূপ পেল অদ্বৈত আচার্যের মাধ্যমে, যিনি নারায়ণরূপে এই কলিযুগে শান্তিপুরে রাসযাত্রার সূত্রপাত করেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বারোয়ারিগুলিতেও এসেছে থিমের আধুনিক ছোঁয়া। তবুও শান্তিপুরের রাস শুধু উৎসব নয়— এ এক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার, ধর্মের মহোৎসব এবং ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়, আলোর রোশনাই, ঢাক-ঢোলের নিনাদ ও মঙ্গলগানের সুরে ফের জীবন্ত হয়ে উঠবে শান্তিপুর। পুরাণ, ইতিহাস এবং লোকবিশ্বাসের অনবদ্য সমন্বয়ে শান্তিপুরের রাস আজ আন্তর্জাতিক খ্যাতিপ্রাপ্ত। আর সেই আবেগের স্পর্শ আবারও ছড়িয়ে পড়তে চলেছে গঙ্গাপাড়ের এই ধর্মনগরীতে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ