Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

৩ পুরুষ ধরে জাতীয় পতাকা তৈরি করা পরিবারও ‘ডিলিটেড’, স্বাধীনতার সময় থেকে চলা দক্ষিণ হাওড়ার ফ্ল্যাগ কারখানায় আক্ষেপের সুর

দক্ষিণ হাওড়ার উনসানি বাদামতলার সরু গলির ভিতর ছোট্ট একটি কারখানা। বাইরে চড়া রোদ, ভিতরে যেন আরও গরম। তবু থেমে নেই হাতের কাজ।

৩ পুরুষ ধরে জাতীয় পতাকা তৈরি করা পরিবারও ‘ডিলিটেড’, স্বাধীনতার সময় থেকে চলা দক্ষিণ হাওড়ার ফ্ল্যাগ কারখানায় আক্ষেপের সুর
  • ৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: দক্ষিণ হাওড়ার উনসানি বাদামতলার সরু গলির ভিতর ছোট্ট একটি কারখানা। বাইরে চড়া রোদ, ভিতরে যেন আরও গরম। তবু থেমে নেই হাতের কাজ। খটাখট শব্দ তুলে ছুটে চলেছে সেলাই মেশিন। রঙিন কাপড়ের স্তূপের পাশে ঝুঁকে বসে সেলাই করছেন শেখ বাবলুদের মতো করিগররা। কারও কপালে ঘাম, কারও চোখে ক্লান্তি। কিন্তু হাত চলছে বিরামহীনভাবে। সামনে সাজানো তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস, আইএসএফ— প্রায় সব রাজনৈতিক দলের পতাকার ছিট কাপড়। ভোটের মরশুম মানেই এখানে ব্যস্ততা তুঙ্গে।

Advertisement

কারখানার এক কোণে বসে সব কিছু তদারকি করছেন রাজু হালদার। এলাকায় যিনি ‘রাজু ঝান্ডা’ নামেই পরিচিত। তিন পুরুষের এই ব্যবসা তাঁর রক্তে মিশে আছে। ব্রিটিশ আমল থেকেই পতাকা তৈরি শুধু পেশা নয়, ইতিহাসের ধারকও বটে। কথায় কথায় উঠে আসে গর্বের সুর, তাঁর ঠাকুরদা স্বাধীনতার সময় জাতীয় পতাকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই উত্তরাধিকার আজও বয়ে চলেছে এই পরিবার। বাড়ির মুসলিম সদস্যদের হাতেই তৈরি হয় রামনবমীর গেরুয়া পতাকা, আবার মহরমের কালো নিশান। এক ছাদের নীচে মিলেমিশে থাকে উৎসবের বহুরঙা চিত্র। এখন অবশ্য সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক পতাকার চাহিদা। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি থেকে শুরু করে সুদূর জলপাইগুড়ি, দুই দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ— রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে আসছে বরাত। প্রতিটি জেলায় আট থেকে দশ হাজার পতাকা পাঠানোর লক্ষ্যে দিনরাত এক করে কাজ করছেন ১৬ জন শ্রমিক। সকাল ৮টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলতে থাকে সেলাই, কাটিং, প্রিন্টিং। মেমারি, ক্যানিং, উলুবেড়িয়া, বাগনান— বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই শ্রমিকদের একটাই লক্ষ্য, সময়মতো কাজ শেষ করা। শেখ বাবলুর কথায়, ‘প্রতিদিন দু’-তিন হাজার পতাকা বানাতে হচ্ছে, এখন দম নেওয়ারও ফুরসত নেই।’
কাজের ফাঁকে রাজু হালদার হিসাব কষে বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও তৃণমূলের পতাকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে সিপিএমের বরাত বেড়েছে। সেই তুলনায় বিজেপির কিছুটা কম।’ তাঁর গলায় ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার নিশ্চয়তা, আবার কোথাও যেন সময়ের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তবু এই ব্যস্ততার আড়ালে জমাট বেঁধে রয়েছে এক গভীর অভিমান। যে পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জাতীয় পতাকা তৈরি করে আসছে, আজ সেই পরিবারের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে। সম্প্রতি প্রকাশিত ভোটার তালিকার সংশোধিত খসড়ায় রাজু হালদার সহ তাঁর পরিবারের তিনজনের নাম ‘ডিলিটেড’। শুধু তাঁদেরই নয়, একই বুথের প্রায় ২০০ জন এবং আশপাশের ১২টি বুথ মিলিয়ে হাজারেরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যান রাজু। চোখে ভেসে ওঠে অতীতের গর্ব আর বর্তমানের ক্ষত। বলেন, ‘আমার ঠাকুরদা এই দেশের স্বাধীনতা দেখেছেন, দেশের পতাকা তৈরি করেছেন। সেই পরিবারের সন্তান হয়েও আজ শুনতে হচ্ছে আমরা নাকি ভোটার নই! কাগজে নাম কেটে দিলেই কি মাটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক মুছে যাবে?’ কারখানার ভিতরে তখনও চলতে থাকে সেলাই মেশিনের নিরলস শব্দ— যেন ইতিহাস আর বর্তমানের মাঝে দাঁড়িয়ে সে এক অনবরত প্রশ্ন ছুঁড়ে যাচ্ছে সময়ের দিকে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ