সংবাদদাতা, উলুবেড়িয়া: আরে, কোথায় গেলি লক্ষ্মী, সখি, ভাগলপুরীরা। তাড়তাড়ি আয়। খেয়ে নে। আমাকে এবার একটু রেহাই দে...। যাদের উদ্দেশে এই আহ্বান, তারা কেউই মানুষ নয়। সকলেই পোষ্য। গোরু। বাগনানের পাতিনানা গ্রামের মমতাজ বেগম তাঁর ১৩টি গোরুকে এভাবেই নাম ধরে ডাকেন। তিনি তাদের নিজের পরিবারের সদস্য বলেই মনে করেন। শুধু গোরু নয়, তাঁর সংসারে রয়েছে ৫২টি মুরগি ও ২২টি হাঁস। দুই সন্তানকে নিয়ে মমতাজ বেগম নিত্যদিন পরিচর্যা করেন তাদের। সংসারের ঝক্কি সামলে এই দায়িত্ব পালন যে কতটা কঠিন, তা সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন এই মহিলা। এ যেন এক অন্য দুর্গা। দু’হাতেই সামলাচ্ছেন দশ হাতের কাজ।
মমতাজ বেগমের সংসার চলে এই পোষ্যদের ভরসায়। দুধ, ডিম বেচে মাসে গড়ে রোজগার ৫০ হাজার টাকা। শুধু ডিম বিক্রি করেই মেলে পাঁচ হাজার টাকা। দিনে হয় ২০ কেজি দুধ। দুই ছেলে বাইক নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ওই দুধ বিক্রি করেন। সঙ্গে একটি মুদি দোকানও রয়েছে তাঁদের। বাগনানের মাতলা স্বনির্ভর দলের সদস্যা মমতাজ বেগম আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে তাঁর এই লড়াই এতটা সহজ ছিল না। ছোট ছেলে যখন ক্লাস ওয়ানে এবং বড় ছেলে ক্লাস ফাইভে পড়ে, তখন তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। লোকের বাড়িতে ধান সিদ্ধ করে ও অন্যের জমিতে কাজ করে দুই ছেলেকে নিয়ে কোনওরকমে দিন কাটত তাঁর। ২০০৭ সালে তিনি যোগ দেন মাতলা স্বনির্ভর দলে। প্রথমে তিন হাজার, পরে পাঁচ হাজার এবং তারপর ১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তার ঋণের পরিমাণ ২ লক্ষ টাকা। কঠোর পরিশ্রম করে তিনি একদিকে যেমন উপার্জন করেছেন, তেমনই দুই ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। পাকা বাড়ির পাশাপাশি দোকানঘরও পাকা করেছেন। এভাবেই আজ ভরা সংসার মমতাজ বেগমের। আগামী দিনে গোরুর খামারকে বড় করার পরিকল্পনা আছে তাঁর। এক কথায়, অন্যান্য মহিলাদের কাছে মমতাজ বেগম এখন আইকন। -নিজস্ব চিত্র