লেক থুন আর লেক ব্রিন্স। সুইজারল্যান্ডের দুই বিখ্যাত যমজ হ্রদ। আর এই দুই হ্রদেরই যোগসূত্র আল্পস পর্বতমালার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সাজানো জনপদ ইন্টারলাকেন। একে কেন্দ্র করে ঘোরা যায় আশপাশের একগুচ্ছ পর্যটনকেন্দ্র। দিল্লি থেকে সরাসরি বিমান যাচ্ছে জুরিখ। সেখান থেকে রেল বা সড়কপথে ১১৮ কিলোমিটার পেরিয়ে পৌঁছবেন ইন্টারলাকেন। এই পথ গিয়েছে অপরূপ পাহাড়ি প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে। ইন্টারলাকেন পর্যটকপ্রিয় জনপদ। তাই মূলগঞ্জ ছাড়াও দুই হ্রদের ধারে গড়ে উঠেছে নানা মানের হোটেল রিসর্ট হোম স্টে। ইন্টারলাকেনের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে সবুজ ঘাসে ঢাকা বিস্তৃত ময়দান। মাঠ পেরলেই পাহাড়ের সারি। তার ফাঁক গলে উঁকি দেয় ইয়ুংফ্রাউ হিমশৃঙ্গ। মাঠের গায়েই সাজানো জনপদ। সাজানো পথের দু’ধারে সুইস চকোলেট, স্যুভেনির, সুইস ঘড়ি, জামাকাপড়ের সারিবদ্ধ দোকান। হাঁটতে হাঁটতেই দেখে নিন চার্চ, ওল্ডটাউন, কুরসাল পার্ক, ক্যাসিনো হাউস, ইয়ুংফ্রাউ পার্ক। জনপদের গা দিয়ে বইছে অ্যারে নদী। গাছগাছালি আর ফুলবাগানে সাজানো নদীর তীর। অ্যারে নদী দুই হ্রদকে একত্রে জুড়েছে। অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের জন্যে ইন্টারলাকেন বিখ্যাত।
লেক থুন আর ব্রিন্স এই দুই হ্রদেই বোটিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। হ্রদের ধারে রয়েছে অসাধারণ সব পাহাড়ি গ্রাম। গ্রামের অচেনা পথে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ঘুরে বেড়ান নিজের মতো করে। লঞ্চে চেপেও হ্রদ দু’টির নানা প্রান্তে যাওয়া যায়। গ্রামগুলোর মধ্যে সৌন্দর্যের নিরিখে এসেলওয়ার্ল্ডের কথা আলাদাভাবে বলতেই হবে। এই গ্রাম যেন ছবির বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে। শান্ত প্রকৃতি। কাঠের ছোট ছোট বাড়ির বারান্দায় ঝুলছে ফুলে ভরা টব। উঠোনগুলোও ফুলের বাগান দিয়ে সাজানো। গ্রামের ভিতর দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ গিয়েছে হ্রদের ধারে। বিশাল হ্রদ। হ্রদের ধার দিয়ে পাহাড়ের সারি। পাহাড়ের গয়ে লেপ্টে রয়েছে আল্পাইন অরণ্য। পাদদেশে কয়েক ঘর বসতি নিয়ে গ্রাম্য দুনিয়া। হ্রদের জলে বোটিং হয়। ক্রুজও চলেছে পর্যটক বোঝাই করে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এই গ্রামে থাকার জন্যে হোটেল রয়েছে। হ্রদের ধারে রয়েছে কয়েকটি কাফে। ইন্টারলাকেন থেকে বাস যোগাযোগ রয়েছে ইজেলওয়ার্ল্ড যাতায়াতের জন্য।
ইন্টারলাকেন থেকে মাউন্টেন রেলে চেপে দেখে নিন পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত দুই ভিউপয়েন্ট সিনিগ প্ল্যান্ট আর হার্ডার কাল্ম। ইন্টারলাকেন থেকে আরেকদিন চলুন গ্লেসিয়ার ভিলেজ গ্রিনডেলওয়াল্ড দেখতে। পাহাড় ঘুরে ট্রেন যায় এই পথে। বাসও যাচ্ছে। দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার। ১০৩৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পাহাড়ি জনপদ যেন সৌন্দর্যের খনি। গ্রীষ্মে সবুজ পাহাড়ি উপত্যকায় ফুটে ওঠে রংবেরঙের মরশুমি ফুল। শীতে এই গ্রামে সেজে ওঠে বরফের সাজে। পাহাড়ের ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে গ্রামের ঘরবাড়ি। পাহাড়কে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আলপাইন ফরেস্ট। এখান থেকে দেখা যায় ইগার পর্বতশৃঙ্গ। গ্রিনডেলওয়াল্ডও রাত কাটানোর ভালো ব্যবস্থা রয়েছে।
গ্রিনডেলওয়াল্ডের আশপাশের মুখ্য দ্রষ্টব্য ফার্স্ট গিরিসিরি কেবল কার। এতে চেপে ফার্স্ট অ্যাঙ্কালিক পৌঁছে সেখান থেকে ২ ঘণ্টা (যাতায়াত মিলিয়ে) হেঁটে দেখে নিতে পারেন পাহাড়ের কোলে অপরূপ বাকালপ্সি লেক। এখানকার আর এক আকর্ষণ শতবর্ষ প্রাচীন ইয়ুংফ্রাউবান রেলপথের অনবদ্য পাহাড়ি রেলযাত্রা। এই রেলযাত্রায় প্রথমে গ্রিনডেলওয়াল্ড থেকে চলুন ১৮ কিমি দূরে ক্লেইন সেইডেক। মনমাতানো প্রকৃতির মধ্য দিয়ে এই রেলযাত্রা। ২০৬১ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এক পাহাড়ি গ্রাম ক্লেইন সেইডেককে ঘিরে আছে তুষারাবৃত আল্পস পর্বতমালা। এখান থেকে ট্রেন বদলাতে হবে ৯ কিলোমিটার দূরের ৩,৪৫৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ইয়ুংফ্রাউইয়ক যেতে। শেষপর্যায়ের এই পাহাড়ি রেলযাত্রা বেশ রোমাঞ্চকর। ইউরোপের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন ইয়ুংফ্রাউইয়ক গড়ে উঠেছে নয়নাভিরাম তুষার সাম্রাজ্যের কোলে। এখানে দেখবেন ভিউপয়েন্ট, প্যানোরমা শো, গ্লেসিয়ার কেভ, হিমবাহ আর খুব কাছ থেকে দৃশ্যমান ইগার, মানচ, ইয়ুংফ্রাউ হিমশৃঙ্গ।
ক্লেইন সেইডেক এক অনবদ্য পাহাড়ি গ্রাম। চারপাশে ঘিরে আছে আল্পস পর্বতমালার মায়াবী প্রকৃতি। শীতের মরশুমে তুষার সাগরে ডুব দেয় এই গ্রাম। তখন শুরু হয় স্নো ফেস্টিভ্যাল। বরফের সান্নিধ্যে বেড়ানোর আনন্দে মেতে ওঠে দেশ বিদেশের পর্যটকরা। বরফ পড়লেও চালু থাকে এই রেলপথ। গ্রীষ্মের মরশুমে বরফ গলে গেলে পাহাড়ের গায়ে, উপত্যকার বুকে ফুটে ওঠে নানা রঙের আল্পাইন ফুল। সে দৃশ্যও দেখার মতো। ক্লেইন সেইডেক থেকে ইগার শৃঙ্গকে যেন হাতের মুঠোয় ধরা যায়। এত কাছে তার অবস্থান। রেলস্টেশনের গায়েই দারুণ একটা হেরিটেজ
হোটেল রয়েছে। দেখলেই এখানে একটি রাত কাটাতে মন চাইবে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কাফের রঙিন ছাতার নীচে বসে হিমশৃঙ্গ দেখতে দেখতে স্থানীয় খাবারে মজে থাকাও এক বাড়তি পাওনা। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা এখান থেকে ‘ইগার ওয়াক’ ট্রেকিংয়ের যায়। সেই পথও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সাজানো।
ক্লেইন সেইডেক থেকে ইয়ুংফ্রাউইয়ক রেলপথে চলে বিদ্যুৎচালিত কগহুইল মাউন্টেন রেল। রেলপথের বেশিরভাগটাই গিয়েছে পাহাড়ি সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে। ১৯১২ সালে চালু হওয়া এই রেলপথ ও তার সংলগ্ন অঞ্চল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা পেয়েছে। দুলকি চালে ট্রেন উঠে আসবে পাহাড়ের অধিক উচ্চতায়। মাঝপথে দু’বার থামবে ভিউ পয়েন্ট গ্যালারি থেকে হিমবাহের দৃশ্য দেখানোর জন্যে। ইয়ুংফ্রাউইয়ক স্টেশনে নেমে প্রথমেই দেখে নিন প্যানোরামা শো। বিশাল পর্দায় দেখানো হবে ইয়ুংফ্রাউ নিয়ে অসাধারণ এক ত্রিমাত্রিক তথ্যচিত্র। ওপরে ভয়ঙ্কর ঠান্ডা। চারপাশে বরফে বরফ। হাতের নাগালে হিমশৃঙ্গ, হিমবাহ। এক অবর্ণনীয় প্রাকৃতিক শোভা চারপাশে। এরপর লিফটে চেপে উঠে আসুন পাহাড়ের আরও উপরে স্কিংস ভিউপয়েন্টে। লাগোয়া আল্পাইন রিসার্চ সেন্টার। এখান
থেকে দৃশ্যমান আল্পসের বৃহত্তম হিমবাহ উপত্যকা এলিটেস। এই বরফের মাঠের কিছুটা অংশে পর্যটকদের নামতে দেওয়া হয়। বরফে হুটোপাটি করে মজা করার পরে প্রবেশ করুন গ্লেসিয়াল কেভ-এ। ভিতরে রয়েছে বরফের তৈরি নানা ভাস্কর্য। সবশেষে আলপাইন সেনসেশন টানেলের ভিতরে সাজানো রূপকথার রঙিন ছবি মনে থাকবে বহু দিন।



